Thursday, January 13, 2022

বিদ্যাসাগরের গৃহে শ্রীরামকৃষ্ণ

৫ই অগাস্ট ১৮৮২ সাল, শনিবার ছিল। সেদিন বিকেল ৪টের সময় শ্রীরামকৃষ্ণদেব নিজে যেচে এসেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্রের সাথে দেখা করতে তাঁর বাদুড়বাগানের বাড়িতে, ছিলেন রাত ৯টা পর্য্যন্ত। পাঁচ ঘণ্টা বড় কম সময় নয়, নিশ্চয় অনেক কথাবার্তা হয়েছিল। দশ বারো পাতায় সেই সাক্ষাৎকারের নির্যাসটুকু প্রত্যক্ষদর্শী শ্রীম ধরে রেখেছেন কথামৃতে। এই বিদ্যাসাগরের religiosity কেমন? প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে শ্রীম বর্ণনা করছেন, 'ধর্ম-বিষয়ে বিদ্যাসাগর কাহাকেও শিক্ষা দিতেন না। তিনি দর্শনাদি গ্রন্থ পড়িয়াছিলেন। মাস্টার একদিন জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, “আপনার হিন্দুদর্শন কিরূপ লাগে?” তিনি বলিয়াছিলেন, “আমার তো বোধ হয়, ওরা যা বুঝতে গেছে, বুঝাতে পারে নাই।” ঈশ্বর সম্পর্কে বিদ্যাসাগরের ধারণা কেমন ছিল তাও উনি শ্রীমর কাছে ব্যক্ত করেছিলেন। শ্রীম জিজ্ঞেস করেছিলেন, "ঈশ্বর সম্বন্ধে কিরূপ ভাবেন"। বিদ্যাসাগর বলিয়াছিলেন, “তাঁকে তো জানবার জো নাই! এখন কর্তব্য কি? আমার মতে কর্তব্য, আমাদের নিজের এরূপ হওয়া উচিত যে, সকলে যদি সেরূপ হয়, পৃথিবী স্বর্গ হয়ে পড়বে।" এই সেই বিদ্যাসাগর যিনি একসময় পাঠ্যক্রমে ভারতীয় দর্শনের অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করে সাহেবদের বলেছিলেন, "That samkhya and vedanta are false statement of philosophy is no more in dispute. There is nothing substantial in them"।


দেখছি এই মানুষটাকে ঠাকুর যেন হাত ধরে ধীরে ধীরে confusion থেকে resolution-এর দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। রাস্তা দেখাচ্ছেন। বলছেন, “তাঁকে কি বিচার করে জানা যায়? তাঁর দাস হয়ে, তাঁর শরণাগত হয়ে তাঁকে ডাক।

(বিদ্যাসাগরের প্রতি সহাস্যে) — “আচ্ছা, তোমার কি ভাব?”

বিদ্যাসাগর মৃদু মৃদু হাসিতেছেন। বলিতেছেন, “আচ্ছা সে কথা আপনাকে একলা-একলা একদিন বলব।” (সকলের হাস্য)

শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্য) — তাঁকে পাণ্ডিত্য দ্বারা বিচার করে জানা যায় না। 

খানিকক্ষণ পর দেখছি কর্মযোগী ঈশ্বরচন্দ্রের ভেতরের ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার সহজ উপায় বাতলে দিচ্ছেন,

"তুমি যে-সব কর্ম করছ এতে তোমার নিজের উপকার। নিষ্কামভাবে কর্ম করতে পারলে চিত্তশুদ্ধি হবে, ঈশ্বরের উপর তোমার ভালবাসা আসবে। ভালবাসা এলেই তাঁকে লাভ করতে পারবে। জগতের উপকার মানুষ করে না, তিনিই করছেন, যিনি চন্দ্র-সূর্য করেছেন, যিনি মা-বাপের স্নেহ, যিনি মহতের ভিতর দয়া, যিনি সাধু-ভক্তের ভিতর ভক্তি দিয়েছেন। যে-লোক কামনাশূন্য হয়ে কর্ম করবে সে নিজেরই মঙ্গল করবে।


“অন্তরে সোনা আছে, এখনও খবর পাও নাই। একটু মাটি চাপা আছে। যদি একবার সন্ধান পাও, অন্য কাজ কমে যাবে। গৃহস্থের বউ-এর ছেলে হলে ছেলেটিকেই নিয়ে থাকে; ওইটিকে নিয়েই নাড়াচাড়া; আর সংসারের কাজ শাশুড়ী করতে দেয় না। (সকলের হাস্য)


“আরও এগিয়ে যাও। কাঠুরে কাঠ কাটতে গিছিল; — ব্রহ্মচারী বললে, এগিয়ে যাও। এগিয়ে গিয়ে দেখে চন্দনগাছ। আবার কিছুদিন পরে ভাবলে, তিনি এগিয়ে যেতে বলেছিলেন, চন্দনগাছ পর্যন্ত তো যেতে বলেন নাই। এগিয়ে গিয়ে দেখে রূপার খনি। আবার কিছুদিন পরে এগিয়ে গিয়ে দেখে, সোনার খনি। তারপর কেবল হীরা, মাণিক। এই সব লয়ে একেবারে আণ্ডিল হয়ে গেল।


“নিষ্কামকর্ম করতে পারলে ঈশ্বরে ভালবাসা হয়; ক্রমে তাঁর কৃপায় তাঁকে পাওয়া যায়। ঈশ্বরকে দেখা যায়, তাঁর সঙ্গে কথা কওয়া যায়, যেমন আমি তোমার সঙ্গে কথা কচ্ছি!” (সকলে নিঃশব্দ)


কথায় কথায় রাত ৯টা বেজে গেছে, ঠাকুর যখন উঠবো উঠবো করছেন, তখনও বিদ্যাসাগর ওঁকে ছাড়তে চাইছেন না। ঠাকুর যখন দক্ষিণেশ্বর যাওয়ার নিমন্ত্রণে নিজেকে সরিয়ে রেখে রাসমণির বাগান দেখতে যাওয়ার উদ্দেশ্যকেই তুলে ধরছেন তখন বিদ্যাসাগর জিজ্ঞেস করছেন, "সে কি! এমন কথা বললেন কেন? আমায় বুঝিয়ে দিন।" এর থেকেই বোঝা যায় যে নিজের থেকে বয়সে ১৬/১৭ বছরের ছোট প্রায় নিরক্ষর এক গ্রাম্য পুরোহিতের সাথে ওই একটি সাক্ষাৎকারেই অত বড় একজন ভারতবিখ্যাত মানী মহাপন্ডিতের মনের মধ্যে কি ঝড় উঠেছিল। সেদিন যে শ্রীরামকৃষ্ণই কথক আর বাকিরা মূলত শ্রোতা সেটি সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষে বিদ্যাসাগরের বাড়ির একতলার বাগানে অপেক্ষমান বলরাম বসুর কথাতেই স্পষ্ট। শ্রীম লিখছেন, 'ঠাকুর বলিলেন, “বলরাম! তুমি? এত রাত্রে?”

বলরাম (সহাস্যে) — আমি অনেক্ষণ এসেছি, এখানে দাঁড়িয়েছিলাম।

শ্রীরামকৃষ্ণ — ভিতরে কেন যাও নাই?

বলরাম — আজ্ঞা, সকলে আপনার কথাবার্তা শুনছেন, মাঝে গিয়ে বিরক্ত করা।


শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সাথে বিদ্যাসাগরমশাইয়ের কথোপকথন অথবা সেদিনের ঘটনাক্রমকে শ্রীম মোট ৭টি পরিচ্ছেদে, বিশটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন:

১. শ্রীরামকৃষ্ণকে বিদ্যাসাগরের পূজা ও সম্ভাষণ

২. বিদ্যাসাগরের সাত্ত্বিক কর্ম — “তুমিও সিদ্ধপুরুষ”

৩. ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ — জ্ঞানযোগ বা বেদান্ত বিচার

৪. Problem of Evil — ব্রহ্ম নির্লিপ্ত — জীবেরই সম্বন্ধে দুঃখাদি

৫. ব্রহ্ম অনির্বচনীয় অব্যপদেশ্যম্‌ — The Unknown and Unknowable

৬. ব্রহ্ম সচ্চিদানন্দস্বরূপ — নির্বিকল্পসমাধি ও ব্রহ্মজ্ঞান 

৭. জ্ঞান ও বিজ্ঞান, অদ্বৈতবাদ, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ ও দ্বৈতবাদ — এই তিনের সমন্বয় — Reconciliation of Non-Dualism, Qualified Non-Dualism and Dualism.

৮. বিভুরূপে এক — কিন্তু শক্তিবিশেষ

৯. শুধু পান্ডিত্য, পুঁথিগত বিদ্যা অসার — ভক্তিই সার

১০. ভক্তিযোগের রহস্য — The Secret of Dualism

১১. বিদ্যাসাগরকে শিক্ষা — “আমি ও আমার” অজ্ঞান

১২. উপায় — বিশ্বাস ও ভক্তি

১৩. ঈশ্বর অগম্য ও অপার

১৪. বিশ্বাসের জোর — ঈশ্বরে বিশ্বাস ও মহাপাতক ]

১৫. ঈশ্বরকে ভালবাসা জীবনের উদ্দেশ্য — The End of life

১৬. ঠাকুর সমাধি মন্দিরে

১৭. উপায় — আগে বিশ্বাস — তারপর ভক্তি

১৮. নিষ্কামকর্ম বা কর্মযোগ ও জগতের উপকার — Sri Ramakrishna and the European ideal of work

১৯. নিষ্কামকর্মের উদ্দেশ্য — ঈশ্বরদর্শন

২০. ঠাকুর অহেতুক কৃপাসিন্ধু

শ্রীম শেষ করছেন এইভাবে, 'বিদ্যাসাগর ও অন্যান্য সকলে ঠাকুরকে প্রণাম করিলেন। গাড়ি উত্তরাভিমুখে হাঁকাইয়া দিল। গাড়ি দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে যাইবে। এখনও সকলে গাড়ির দিকে তাকাইয়া দাঁড়াইয়া আছেন। বুঝি ভাবিতেছেন, এ মহাপুরুষ কে? যিনি ঈশ্বরকে ভালবাসেন, আর যিনি জীবের ঘরে ঘরে ফিরছেন, আর বলছেন, ঈশ্বরকে ভালবাসাই জীবনের উদ্দেশ্য।'


এই কুড়িটি ভাগ এবং ঘটনাকে যদি আমরা পরপর দেখি তাহলে এটি জ্ঞান, ভক্তি, কর্ম, ধ্যান, বস্তুত গোটা হিন্দু ধর্মসংস্কৃতি, যোগদর্শন এবং ব্রহ্মসূত্রের মাস্টারক্লাস - ঈশ্বর স্বয়ং একজন rationalist-কে বেদান্তের বিজ্ঞান বোঝাচ্ছেন। এরই মধ্যে তাঁর ভাব হচ্ছে, গান গাইছেন, গল্প বলছেন, সমাধিস্থ হচ্ছেন, মস্করা করছেন, মানীকে মান দিচ্ছেন আবার একজন শাস্ত্রজ্ঞ আত্মবিশ্বাসী কর্মযোগীকে আত্মবোধ এবং মুক্তির পথও দেখাচ্ছেন। এই সাক্ষাৎকারটি একটি অদ্ভুত সর্বাঙ্গসুন্দর complete-in-itself আত্মপলব্ধির রাস্তা খুঁজে পাওয়ার উপদেশ, যেখানে যিনি দিচ্ছেন তিনি আধার জেনেই অমৃত বর্ষণ করছেন আর যিনি সে সুধা পান করছেন তিনিও জানেন কি সারবস্তু তিনি পাচ্ছেন, যদিও আজন্মলালিত সংস্কার ত্যাগ করা তাঁর পক্ষে কঠিন। বিদ্যাসাগর জানেন না এমন কোনো কথাই কিন্তু ঠাকুর বলছেন না, খালি sequence অনুযায়ী সাজিয়ে দিয়ে একটা logical conclusion-এ পৌঁছে দিচ্ছেন। শ্রীমর মনে হচ্ছে  'সকলে অবাক ও নিস্তব্ধ হইয়া এই সকল কথা শুনিতেছেন। যেমন সাক্ষাৎ বাগ্বাদিনী শ্রীরামকৃষ্ণের জিহ্বাতে অবতীর্ণ হইয়া বিদ্যাসাগরকে উপলক্ষ করিয়া জীবের মঙ্গলের জন্য কথা বলিতেছেন।' ওঠবার সময় শ্রীরামকৃষ্ণ (বিদ্যাসাগরের প্রতি সহাস্যে) বলছেন — এ-যা বললুম, বলা বাহুল্য আপনি সব জানেন — তবে খপর নাই। (সকলের হাস্য) বরুণের ভাণ্ডারে কত কি রত্ন আছে! বরুণ রাজার খপর নাই! বিদ্যাসাগর (সহাস্যে) জবাব দিচ্ছেন — "তা আপনি বলতে পারেন।" এটাই আসল কথা - ভেতরে কি আছে তার খবর নেই, অবতারপুরুষ এসে প্রদীপটি তুলে ধরেন, তখন ভেতরটা স্পষ্ট দেখা যায়, যদি দেখার ইচ্ছা থাকে। সেদিন ঠাকুর যে গানটি গাইতে গাইতে সমাধিস্থ হয়েছিলেন, সেটি আসলে তাঁর সেদিনের উপদেশের সারাৎসার:


মন কি তত্ত্ব কর তাঁরে, যেন উন্মত্ত আঁধার ঘরে ।

সে যে ভাবের বিষয় ভাব ব্যতীত, অভাবে কি ধরতে পারে ৷৷

অগ্রে শশী বশীভূত কর তব শক্তি-সারে ।

ওরে কোঠার ভিতর চোর-কুঠরি, ভোর হলে সে লুকাবে রে ৷৷

ষড় দর্শনে না পায় দরশন, আগম-নিগম তন্ত্রসারে ।

সে যে ভক্তিরসের রসিক, সদানন্দে বিরাজ করে পুরে ৷৷

সে ভাব লাগি পরম যোগী, যোগ করে যুগ-যুগান্তরে ।

হলে ভাবের উদয় লয় সে যেমন, লোহাকে চুম্বকে ধরে ৷৷

প্রসাদ বলে মাতৃভাবে আমি তত্ত্ব করি যাঁরে ।

সেটা চাতরে কি ভাঙব হাঁড়ি, বোঝ না রে মন ঠারে ঠোরে ৷৷


এরপরেও কিন্তু বিদ্যাসাগর দক্ষিণেশ্বরে যাননি কারণ তিনি কোনো ধর্মস্থানে যাওয়া উচিত মনে করতেন না। ঠাকুর বুঝতে পেরেই রাসমণির বাগানে যাওয়ার কথা বলেছিলেন, মায়ের মন্দিরে নয়। বিদ্যাসাগর কথা দিয়েও কথা রাখেননি বলে ঠাকুরের মনে খেদ ছিল। শ্রীমকে পরে বলেছিলেন,‘‘বিদ্যাসাগর সত্য কয় না কেন? … সেদিন বললে, এখানে আসবে৷ কিন্তু এল না৷’’ বিদ্যাসাগরের মনে ধর্ম নিয়ে যে দ্বন্ধ ছিল তা নানা সময়ে নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। একজায়গায় বলেছেন, ‘‘ধর্ম যে কী, তাহা মনুষ্যের বর্তমান অবস্থায় জ্ঞানের অতীত এবং ইহা জানিবারও কোনও প্রয়োজন নাই৷ … আমার বোধ হয় যে, পৃথিবীর প্রারম্ভ হইতে এরূপ তর্ক চলিতেছে ও যাবৎ কাল পৃথিবী থাকিবে, তাবৎ এ তর্ক থাকিবে, কস্মিনকালেও ইহার মীমাংসা হইবে না৷’’ (শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন, বিদ্যাসাগরের জীবনচরিত ও ভ্রমনিরাশ, পৃ. ২৩১–২৩২)৷ ঠাকুর সব জেনেও সেধে ওঁকে পথ দেখাতে গিয়েছিলেন, এটাই আসল কথা। শ্রীকৃষ্ণ প্রত্যাখ্যাত হবেন জেনেই মাত্র পাঁচটি গ্রাম চাইতে গিয়েছিলেন। অবতারের মর্তলীলা বোঝা দায়।


বন্দে জগৎগুরু শ্রীরামকৃষ্ণ, বন্দে জগজ্জননী মহামায়ী।

Thursday, January 6, 2022

কর্মফল ও মুক্তি

 প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব কর্মফল থেকে প্রারব্ধ তৈরি হয় আর সেই প্রারব্ধ তাকে ভুগতেই হবে। আব্রাহামিক মতসমূহে যাই বলা হয়ে থাকুক না কেন, প্রারব্ধকে এড়াবার কোনো উপায় নেই। তবে হ্যাঁ, ঈশ্বরের কৃপা হলে ভোগান্তি খানিকটা কমতে পারে, অনেকটা ওই ভালো ব্যবহারের জন্য বাকি সাজা মকুব হয়ে যাওয়ার মতন, এটুকুই। আর কর্মফলকে এড়াবার যেমন উপায় নেই, তেমনি সৎ কর্মের মাধ্যমেই বিষে বিষে বিষক্ষয় হয়। শ্রীশ্রীমা বলতেন, “সব সয়ে যেতে হবে কারণ কর্মানুসারে সৎ যোগাযোগ হয়, আবার কর্মের দ্বারা কর্মের খন্ডন হয়”। 


মা তো খুব practical ছিলেন, মানুষের জীবনের ওঠা-পড়া যে তাকে নাজেহাল করে দেয়, ভালো সময়ের পর পরই খারাপ সময়ের ঘূর্ণিঝড়ে পড়লে সে যে অস্থির হয়ে ওঠে, তার মন বিক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, সে desperate হয়ে আরো বেশি বেশি করে ভুল করতে শুরু করে, এটা একজন মায়ের চেয়ে ভালো আর কেই বা বুঝবেন? তাই মা বলতেন, “সংসারে কেমন করে থাকতে হয় জানো? যখন যেমন তখন তেমন, যাকে যেমন তাকে তেমন, যেখানে যেমন সেখানে তেমন”; বলতেন, “যে অল্পেতে তুষ্ট থাকে, তার কাছে এই পৃথিবীর সব কষ্ট সহজ হয়ে যায়”। 


সাধারণত নিজেদেরই কর্মফলের জের যখন নিজেদের জীবনকেই ঝাঁকিয়ে দেয় তখন আমরা নিজেদের ছাড়া দুনিয়ার বাকি সবাইকে দোষ দিতে শুরু করি - তাতে যেন বুকের বোঝাটা সাময়িকভাবে একটু হাল্কা হয়। এটা চরম নিষ্ফলা একটা regressive ব্যাপার। তাই মা বলতেন সবসময় নিজের দিকে তাকাবে, নিজের কৃতকর্মের analysis করবে আর নিজেকে শুধরাতে চেষ্টা করবে, নিজের বাইরে দোষ খুঁজে বেড়াবে না। মায়ের একেবারে specific নির্দেশ ছিল, “যদি শান্তি চাও মা, কারাে দোষ দেখােনা, দোষ দেখবে নিজের। জগৎকে আপনার করে নিতে শেখ। কেউ পর নয় মা, জগৎ তােমার”। 


ওই সময় আমাদের খুব মনে হয় 'অমুকের জন্য আমার আজ এই দুর্দশা, ওর ক্ষতি হলে আমি খুব সুখী হই' - এটা আরো বড় ভুল, আরো কুকর্মফল জড়ো করা। মা সাবধান করে দিয়ে বলতেন, “কাউকেও হিংসা করাে না, ভগবানকেও বিচার করতে বলাে না। বরং যাতে অত্যাচারীর ভাল হয় তার সম্বন্ধে প্রার্থনা করাে। ভগবানের বিচার নিক্তি ধরা, একচুল এদিক-ওদিক হবার জো নেই। ...কিন্তু তাঁর দয়ারও আবার শেষ নেই”। খারাপ সময় যখন আসে তখন আমরা কি করবো কি না করবো কিছুই যেন ঠাওর করে উঠতে পারিনা। আসলে ওটা যে সত্যিকারের ভালো সময়, ওই সময় যে আমরা বেশি বেশি করে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, উঠতে বসতে তাঁকে স্মরণ করি, এটার impact আমরা ঠিক তখনই হয়তো বুঝতে পারিনা। মা বলছেন, “যখন জীবনে সুসময় আসে, তখন ধ্যান চিন্তা আসে”। তাতে কি হবে? না, “ধ্যান, জপ ও ঈশ্বর চিন্তায় পাপ কাটে”। 


প্রারব্ধ ভোগাক আর নাই ভোগাক, মা বলতেন সারা জীবন ধরে “বিশ্বাস আর নিষ্ঠাই মূল, এই দুটো থাকলেই হলো” আর এই মনোভাবে যাতে কখনো ভাটা না পড়ে, সুখের সময় যেন আমরা ঈশ্বরকে ভুলে গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে না দিই, তাই তাঁর নির্দেশ ছিল, “সৎসঙ্গে মেশো, ভালো হতে চেষ্টা করো। ক্রমে সব হবে”।  মা খুব দৃঢ়তার সাথে বলতেন, “জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ঠাকুরকে স্মরণ রেখাে। তাহলে কোনও কষ্টকে আর কষ্ট বলে মনে হবে না। জীবনে দুঃখ-কষ্ট কার বা নেই? ওসব তাে থাকবেই; তার নাম নিলে, তাকে আশ্রয় করলে তিনি শক্তি দেবেন। দুঃখ ও কষ্ট তখন আর তােমার ওপর ছাপ ফেলতে পারবে না।” 


প্রারব্ধ যে কেবলমাত্র শারীরিক বা আর্থিক বা সামাজিক বা পারিবারিক গন্ডির মধ্যেই সীমিত, তা তো নয়, তা মনের ওপরেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলে, কখনো মনকে এত দুর্বল করে দেয় যে depression থেকে suicidal tendency পর্য্যন্ত সৃষ্টি হয়। ওটা মূলত আসে অহঙ্কার থেকে - 'আমার সাথে এমন হলো?' - যেন আমি God's gift to earth, how dare such bad times have descended upon me! তাই মানসিক দুর্বলতাকে একদম প্রশ্রয় দিতে নেই। এ বিষয়ে অন্য একটি context-এ মন বিচলিত হওয়ার ক্ষেত্রে মায়ের নির্দেশ ছিল, “ওদিকে নজর দিও না, কার মনে দুর্বলতা না আসে এক ঠাকুর ছাড়া? আজ পর্যন্ত এমন কোনও মহাপুরুষ জন্মেছেন কি, যার মনে কখনাে কোনও দুর্বলতা ওঠে নি? যদি শুধরােবার চেষ্টা থাকে, যদি মানুষ বুঝতে পারে যে, আমার মনে দুর্বলতা উঠেছে - তাহলে ঐ জিনিষটাই একটা মস্ত শিক্ষা, মহামায়া খুশি হয়ে তখন তাকে পথ ছেড়ে দেন। মানুষ কিছুদিন ভাল থাকলেই মনে করে আমার সব হয়ে গেছে, আরও উঁচুতে ওঠবার চেষ্টা ছেড়ে দেয়। কিন্তু বিবেকীর মনেও মাঝে মাঝে দুর্বলতা দিয়েই ঠাকুর স্মরণ করিয়ে দেন যে, এখনাে সাধনা শেষ হয়নি, ভূত-প্রেত সব ওত পেতে ' চারপাশে বসে আছে, সুবিধে পেলেই ঘাড়ে চেপে বসবে। এতে হয়কি অহঙ্কার নষ্ট হয়। যতদিন বাঁচবে সাবধানে ঠাকুরের শরণাগত হয়ে থাকবে, অহঙ্কার হলেই ঐ সব হিজিবিজি মনে উপস্থিত হবে। শেষ পর্যন্ত শরণাগতির ভাব নিয়ে থাকতে হয়”। 


মনটাই তো সব, ওখানেই তো স্বর্গ নরক, ওখানেই তো শান্তি আর ভোগান্তি, তাই নিজের মনকে নিজে নিজেই কিভাবে train করতে হয়, তাও মা বুঝিয়ে দিয়েছেন, “দেখ, মনটাকে দুভাগ করতে হয়, একটা যেন বিবেকী, আর একটা যেন অবিবেকী—ছেলেমানুষের মতাে। বিবেকী মনটা বাপ-মার মতাে সর্বদা অবিবেকী মনটার পিছনে লেগে থাকবে। একটা কিছু আবোল তাবোল করলেই তাকে শাসন করবে, গালমন্দ করবে, দেখনি বাপ-মা যেমন দুষ্টু ছেলেটাকে বকে ঝকে। দেখবে, এইরকম কিছুদিন অভ্যাস করলেই মনটা শায়েস্তা হয়ে আসবে। কিন্তু অবিবেকী মনে যদি একটা বিষয়ে বহুদিনের অভ্যাসের ফলে দৃঢ় সংস্কার জন্মে যায়, তাহলে শত তিরস্কারেও সেটা যেতে চায়না। তখন ঐ দুর্বল মনের জন্য ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করবে, নইলে আর কোনও উপায় নেই। তিনি ঈশ্বর—সব করতে পারেন। ঠাকুরের ইচ্ছের কাছে দেখেছি মানুষের মনগুলাে যেন কাঁচা মাটির তালের মতাে হয়ে যেতাে; আর তিনি যাকে যেমন ইচ্ছে তাকে তেমনি করে গড়ে তুলতেন।” 


আসল প্রারব্ধের effect তো মানুষের মনে। মায়ের কৃপা হলে প্রারব্ধ কেটে যায় অর্থাৎ দুঃখবোধ কেটে যায় আর যে কোনো পরিস্থিতিতে মন আনন্দময় থাকে - সেই জন্যই রোজ ইষ্টকে স্মরণ মনন করা প্রয়োজন, তাঁর কাছে কৃপা প্রার্থনা করা প্রয়োজন। ভুগতে তো হবেই, কিন্তু ভোগাটা যেন internalised না হয়ে যায়, বাইরে বাইরেই থাকে। মা বলেছিলেন, “শোন মা, যত বড় মহাপুরুষই হোক, দেহধারণ ক'রে এলে দেহের ভোগটি সবই নিতে হয়। তবে তফাৎ এই, সাধারণ লোক যায় কাঁদতে কাঁদতে, আর ওঁরা যান হেসে হেসে - মৃত্যুটা যেন খেলা”। কৃপাময়ীর কৃপার স্রোত নিরন্তর বইছে, একবার ডুব দিলেই ইহকাল পরকাল সব তরে যাবে, কোথাকার কর্মফল আর কোথাকার কি? তাই সবশেষে সবার জন্য মায়ের সেই চিরন্তন দৈবী আশ্বাসবাণী, “জানবে কেউ না থাক, তোমার একজন মা আছেন। আমি মা থাকতে ভয় কি?”

Friday, December 31, 2021

কল্পতরু উৎসব

তিনটি মাত্র শব্দ উচ্চারিত হলো, "তোমাদের চৈতন্য হোক", আর গোটা দুনিয়ার আত্মঅন্বেষী অনন্বেষী সকলের ভবিষ্যৎটি চিরকালের জন্য নির্ধারিত হয়ে গেল, আধাত্ম পথে না এগোনোর উপায়ন্তরটিই আর রইলো না। আপাতদৃষ্টিতে এটি একজন কর্কট রোগাক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রী কপর্দকশূন্য মানবদেহী গুরুর শেষ আশীর্বচন, কিন্তু সত্যিই কি তাই? যদি তাই হতো তাহলে আকন্ঠ জ্ঞানতৃষ্ণা নিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের স্মৃতিবিজড়িত প্রতিটি স্থানে আজ লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নামতো কি? কিসের আশায় তাঁরা কত দূর দূর থেকে কত কষ্ট করে দলে দলে আসেন, কেন বছরের পর বছর পয়লা জানুয়ারিতে কাশিপুরে, দক্ষিণেশ্বরে, বেলুড়ে, কামারপুকুরে, বলরাম বাটিতে, সারা বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের মন্দিরে তাঁরা ঘন্টার পর ঘন্টা লাইন দেন - for nothing? এটি আসলে এক ঈশ্বরকল্প পুরুষের পরম আশ্বাসবচন, an ultimate declaration - 'কেন তুমি বোধ বুদ্ধি বিবেকযুক্ত মানবশরীর পেয়েছ, সেটা কোনো না কোনো জন্মে ঠিকই বুঝতে পারবে আর তারপর তোমার final destination-ও তুমি ঠিক খুঁজে পাবে, আমি আশীর্বাদ করছি'। 


তিনটি শব্দের প্রথম শব্দটি "তোমাদের"। লক্ষণীয় যে এটি বহুবচন এবং direct। যখন 'তোমাদের' বলছেন তখন কি কেবল সেদিন কাশিপুরের বাগানে ওঁর চোখের সামনে যাঁরা আছেন, তাঁদের কথা বলছেন? যিনি সারা পৃথিবীর মানুষকে নতুন করে সনাতন ধর্মের পথ দেখাতে এসেছেন (যার নিদর্শন এখন আমরা সারা বিশ্ব জুড়ে নানা ভাষাভাষী, নানা বর্ণের, নানা পন্থের মানুষের তাঁর এবং বেদান্তের প্রতি যথাক্রমে অনুরাগ এবং অনুসন্ধিৎসা থেকে দেখতে পাই), তিনি কেবল গুটিকতক ভক্তকে address করবেন, এও কি সম্ভব? ভুলে গেলে চলবে না যে যে ঠাকুর একদিন সমাধিভঙ্গ হওয়ার পর বলেছিলেন যে তিনি দেখলেন অনেক দূরের দেশে কিছু সাদা সাদা মানুষ তাঁর ছবিকে পুজো করছে, সেই তিনি কি নিজেকে কেবল একটি বাগানেই আবদ্ধ রাখবেন? হয় কখনো? এই প্রসঙ্গে দ্বিতীয় বিষয় হলো কাল অর্থাৎ সময়। শ্রীরামকৃষ্ণ দেশ কালের অতীত, তিনি ত্রিগুনাতীত, অনন্তের messenger, জগৎগুরু। তিনি সমস্ত মানুষকে আলো দেখাতে এসেছেন, ফলে তাঁর কথাগুলো কখনোই একটি বিশেষ কালখণ্ডে সীমিত নয়। তাই ওনার মুখে 'তোমাদের' শুধুমাত্র বর্তমানে restricted নয়, তা ভবিষ্যতের সমস্ত প্রজন্মকেও address করে। মোদ্দা কথা, এই 'তোমাদের' মানে সারা পৃথিবীর সমস্ত মানুষ এবং তাঁর সময়ের সমস্ত বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বটে, যার মধ্যে আমি আপনি সবাই পড়ি।


দ্বিতীয় শব্দটি হলো "চৈতন্য"। এই শব্দটি বেশ মজার। সাধারণত এর তিন রকমের মানে হয়, ১ হুঁশ, সংজ্ঞা, বাহ্যজ্ঞান (আঘাত পেয়ে চৈতন্য হারাল); ২ বোধ, চেতনা, অনুভূতি (কবে আর তোমার চৈতন্য হবে?); ৩ টিকি। কিন্তু হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর iconic বঙ্গীয় শব্দকোষে চৈতন্যের অর্থ করেছেন, ১ চেতনভাব, চেতনা, জ্ঞান, বুদ্ধি; ২ (বেদান্তে) চিৎস্বরূপ পরমাত্মা; ৩ (ন্যায়ে) আত্মরূপ চেতনা; ৪ প্রকৃতি। এই প্রত্যেকটি মানে যদি আমরা contextually ভাবি, তাহলে ন্যায়শাস্ত্রের মানেটিই বোধহয় এখানে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী, 'চৈতন্য' অর্থাৎ সেই জ্ঞান বা 'আত্মরূপ চেতনা'র উন্মেষ ঘটায়, যাকে শঙ্কর বলেছিলেন 'আত্মবোধ'। কি সম্পর্কে চেতনা? না প্রত্যেক মানুষের অন্তরে সচ্চিদানন্দ ব্রহ্ম বাস করেন এবং সেই বোধ জাগলে সে তার আত্মপরিচয় উপলব্ধি করে, যাকে বেদান্তশাস্ত্রে মহাবাক্য হিসেবে 'অহম ব্রহ্মাস্মি' (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌, যজুর্বেদ, ১.৪.১০) বা 'অয়ং আত্মা ব্রহ্ম' (মাণ্ডুক্য উপনিষদ্‌, অথর্ববেদ, ১।২), 'আমিই ব্রহ্ম' বলা হয়েছে।


এরপর আসি শেষ শব্দটিতে, "হোক"। 'হবে' নয় কিন্তু, 'হোক'। অর্থাৎ ভবিষ্যৎবাণী নয়, ইচ্ছার প্রকাশ বা আশীর্বাদ। উনি ওই জায়গায় একবার 'হবে' বললেই কেল্লাফতে হয়ে যেত। কাউকে আলাদা করে আর কোনো চেষ্টাই করতে হতো না, আত্মবোধ জাগরণের ভার উনি ওঁর নিজের ওপরই নিয়ে নিতেন, কিছু না করলেও সবাই তরে যেতো, তা সে জন্ম জন্ম ধরে যত খারাপ কর্মফলই জড়ো করে থাকুক না কেন - মুড়ি মিছড়ি সব একদর হয়ে যেত। তাই সেটা কিন্তু বললেন না, বললেন 'হোক' - মানে 'চেষ্টাটি তোমাকেই করতে হবে, কিন্তু করলে যে নিশ্চিত ফল পাবে, সেই আশীর্বাদ আমি তোমায় করলাম'। একটি কথা কম নয়, একটি কথাও বেশি নয়, - একেবারে precise, to the point, unambiguous, সোজাসাপ্টা। এবারে প্রশ্ন উঠতেই পারে, যদি আমি চেষ্টা না করি তাহলে কি আমার চৈতন্য হবেনা? এখানেই আসল catch। যেহেতু এটি একজন অবতার পুরুষের আশীর্বাদ, পুরুষ-প্রকৃতি যতই মায়ার খেলা খেলুন না কেন, কারো সাধ্য নেই যে তা বিফলে যায়। ফলে this is a statement of fact, not just of hope - আত্মোপলব্ধির চেষ্টা করিয়েই ছাড়বে। প্রারব্ধ আর কর্মফলের ওপর নির্ভর করে হয়তো কারো কয়েকটি বেশি জন্ম লাগবে, কারো হয়তো কিছু কম, কিন্তু প্রত্যেক মানুষের ভেতর একদিন না একদিন সেই পরমাত্মার আলোর উন্মেষ ঘটবেই, কল্পতরুরূপী গরিব বামুনের কথা কখনো মিথ্যা হতে পারেনা।

Thursday, December 30, 2021

মায়া ও মন

 মায়ার আক্ষরিক অর্থ বিভ্রম বা যাদু। ব্রহ্ম মায়া সৃষ্টি করেছেন নির্গুণ থেকে সগুন হয়ে সৃষ্টির মজা উপভোগ করার উদ্দেশ্যে। তারপর মায়া এই মহাজাগতিক বিভ্রম সৃষ্টি করেছেন - যেন বিশ্বব্রহ্মান্ড সব সত্যিকারের অর্থাৎ নিত্য, indestructible - তবে খেলুড়েরা কেউ এই মায়ার জগৎকে অনুধাবনই না করতে পারলে ব্রহ্মের আর মজা করা হলো কই? সেইসূত্রেই মানুষের মন তৈরি করেছেন তিনি। মন মায়ার এক অনন্য এবং অনবদ্য সৃষ্টি যা apparent বাস্তবের ভেতরেও আরো আরো apparent বাস্তব তৈরি করে একেবারে ভড়কে দিতে পারে - সেটা কখনো ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে, কখনো বা জাগ্রত অবস্থায় কল্পনায়।


মানুষের মনের কি অসীম ক্ষমতা ভাবুন, একবার ঘুমালেই হলো, চোখের নিমেষে একটা গোটা virtual world তৈরি করে ফেলে তাতে একেবারে বাস্তবের মতন সব অনুভূতি, সব অভিজ্ঞতাকে নিখুঁতভাবে recreate করে দেয় - এত যে মানুষের বোধ, বুদ্ধি, বিচার - সেইসময় সব ফেল! আবার এই মনই মনে মনে নানারকম তথ্য proccess করে প্রতিটি ক্ষেত্রে আপনার চেতনায় plan A plan B plan C ইত্যাদির প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে আর বুদ্ধি আর বিবেকের সাথে মিটিং করে স্থির করে দেয় কোন পরিস্থিতিতে কখন ঠিক কোন কাজটা করণীয়। সামনে দেখছি কাঠের টেবিল, সেটা আলো হয়ে চোখ দিয়ে ঢুকে তড়িৎ তরঙ্গ হয়ে ব্রেনে গিয়ে টোকা মারছে আর তারপর সেই তথ্যকে process করে মন বলছে এর ওপর পা তুলে দিয়ে আরাম করে বোস আবার বুদ্ধি মনকে বলছে না, এর ওপর বই আছে, মা সরস্বতী, ওখানে পা দেওয়া উচিত নয় - তখন মন সেই উপদেশ মেনে নিয়ে নিজের আগের command withdraw করছে। 


শরীর কিন্তু তাই তাই করে চলেছে যা মন তাকে বলছে - একবার পা দুটি এগিয়ে দিয়েই মাঝপথে গুটিয়ে নিচ্ছে - কি মজা, তাই না? তাহলে মোদ্দা কথা কি দাঁড়ালো? আমাদের এই 'বাস্তব' দৈহিক অস্তিত্বের একটি মূল বিন্দু হলো শরীরের boss-রূপী মন। আর মনের boss বুদ্ধি, তার ওপর বুদ্ধির boss - 'আমি'। সত্যিকারের আমি। হয় মন বুদ্ধি - এরা আমায় control করবে অথবা আমি এদের control করবো - তার ওপরে নির্ভর করছে how I shall be able to utilise this human lifetime. কিছু মানুষ আছেন যাঁরা সংসার চালানার জন্য domestic help এর ওপর নির্ভরশীল আর কিছু মানুষ আছেন যাঁরা সত্যিকারের কর্তা - সংসার তাঁদের পরিচালনার ওপর নির্ভরশীল, including all subordinates. 


তাই এই 'আমি'টা যে ঠিক কে, সে কেমন, এটা define করা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। Clearly, 'আমি' কারো subservient নই নাহলে আমার শরীর, আমার মন, আমার বুদ্ধি ইত্যাদি বলা হতো না, উল্টে আমি তাদের, এমনটা বলা হতো। প্রতিদিন যেহেতু বাস্তবে দেখছি শরীর মনের instruction-এর ওপর নির্ভরশীল আর মন তার নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বোধ বুদ্ধি বিবেক ইত্যাদির রায়ের ওপর নির্ভরশীল, আর ওগুলি আবার আমার ভাবের ওপর নির্ভরশীল, সেহেতু আমিই হলাম আসল প্রভু। তাহলে বুদ্ধি কেমনভাবে চলবে - না আমি যেভাবে চালাবো - কুবুদ্ধি হলে জগতের ক্ষতি হবে আর সুবুদ্ধি হলে উপকার হবে। জগৎ মানে কি, না বিভিন্ন আধারে মায়ার বিভিন্ন illusory প্রকাশ। যেমন বিভিন্ন পুকুর থেকে শুরু করে প্রতিটি নদী নালা খাল বিল ডোবায় প্রতিদিন সেই একই সূর্য্যের প্রতিবিম্ব দেখি, যেগুলোর যে কোনোটাতে জল শুকিয়ে গেলেই সূর্য্যদেব ভোজবাজির মতন সেটি থেকে গায়েব হয়ে যান।


এ কোন মায়া? যে মায়ার প্রভাবে আমি যেন আসল আমি নই - জীবরূপী। এই 'না-আমি'র এক নিজস্ব অহঙ্কার তৈরি হয় আর প্রভু হওয়া স্বত্তেও কখনো নিজেকে বুদ্ধি ভেবে ভ্রমিত হই, কখনো মন ভেবে, আবার কখনো বা শরীর। আমি তাহলে আসলে কি? আমি সেই অনন্ত অসীম অনাদি আনন্দময় অবর্ণনীয় সত্যস্বত্তা - purety personified - pure existence, pure consciousness, pure bliss - সৎ চিৎ আনন্দ - সচ্চিদানন্দ - ব্রহ্ম। এই পুরো মায়ার জগৎটাই যেহেতু আমার existential আনন্দ দিয়ে আমারই আনন্দবর্ধনের জন্য তৈরি, আমি যেহেতু আমারই প্রকাশের বুদ্ধিকে অহঙ্কার দিয়ে ভ্রমিত করে তার মনকে নিয়ে ছেলেখেলা করা দেখে আনন্দ পাই, আবার সেই মন যখন আমারই দ্বারা প্রেরিত অবতার এবং সদগুরুর tutorial-এ তালিম পেয়ে আমার লুকোচুরি খেলাটা ধরে ফেলে সমস্ত proccessed information বুদ্ধির সামনে তুলে ধরে তাকে চমকে দেয় আর বুদ্ধি দৌড়ে এসে আমাকে ছুঁয়ে বলে 'আব্বুলিশ', তখনও আমারই খেলা জেতার ultimate আনন্দ হয়। 


তাই প্রতিটি জীবের আনন্দময় কোষের ভেতর আমার বাস, তাদের সূক্ষ্ম শরীর আর কারণ শরীরের সমস্ত লম্ফঝম্ফের আমি দ্রষ্টা, অলক্ষ্যে থেকে identity গুলিয়ে দিয়ে মজা আমিই দেখি আর স্বরূপ ধরা পড়ে গেলে আমিই চরম উপভোগ করি। আমি তো ধরা দিতেই চাই - ওটাই তো খেলার ultimate objective, কিন্তু আত্মবোধের খেলাটা খেলতে চাইতে হবে তো! 


আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে

দেখতে আমি পাই নি,

তোমায় দেখতে আমি পাই নি।

বাহির-পানে চোখ মেলেছি,     

আমার হৃদয়-পানে চাই নি ॥

আমার সকল ভালোবাসায়    

সকল আঘাত সকল আশায়

তুমি ছিলে আমার কাছে, আমি তোমার কাছে যাই নি ॥

তুমি মোর আনন্দ হয়ে ছিলে আমার খেলায়--

আনন্দে তাই ভুলেছিলেম, কেটেছে দিন হেলায়।

গোপন রহি গভীর প্রাণে         

আমার দুঃখসুখের গানে সুর দিয়েছ তুমি, 

আমি তোমার গান তো গাই নি ॥

Wednesday, November 10, 2021

ব্রাহ্মমুহূর্তে জপধ্যান

 আজ পাড়ায় সূর্যউপাসক পুণ্যার্থীরা ব্রাহ্মমুহূর্তে বিকট জোরে পটকা ফাটিয়ে ফাটিয়ে এত বিরক্ত করলো যে বলবার নয়। আসলে দোষ এদের নয়, দোষ শিক্ষার। ব্রাহ্মমূহুর্ত বা সূর্যোদয়ের আগে রাত্রির শেষ এক চতুর্থাংশ সময়ে "ব্রহ্মন" বা সৃষ্টিকর্তার নিজস্ব সময়। ওই সময়ে সাধনা করলে নিজেকে তাঁর ইচ্ছে মতো গড়ে তোলা সম্ভব হয়। তাই প্রতিদিন রাত ৩.৩০-৫.৩০ পর্যন্ত জপ-ধ্যানের সবচেয়ে উপযুক্ত কালখন্ড বলে ঋষিরা জানিয়েছেন। অষ্টপ্রহরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এই বিশেষ সময়ে অবশ্যই মন সবচেয়ে বেশি শান্ত থাকে আর একাগ্র হয়ে ধ্যান করলে কুলকুন্ডলিনীদেবীর জাগরণ বোধহয় কিছুটা সহজতর হয়।  


শ্রীরামকৃষ্ণদেব নিজে নহবতে শ্রীশ্রীমা ও ভাইঝি লক্ষ্মীমণিদেবীসহ দক্ষিনেশ্বরে রাত্রিবাসরত তাঁর শিষ্যদের প্রতিদিন ব্রাহ্মমুহূর্তে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিতেন। লক্ষ্মীদেবী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, 'ঠাকুরের  তো রাত্তিরে বেশি ঘুমই হতো না। প্রায় রাত তিনটেয় তিনি ঝাউতলায় শৌচে যেতেন। যাবার সময় নহবতের পাশে এসে আমায় ডাকতেন : "ও লক্ষ্মী, ওঠরে ওঠ। তোর খুড়িকে তোলরে। আর কতো ঘুমুবি? রাত পোহাতে চললো। গঙ্গাজল মুখে দিয়ে মার নাম কর, ধ্যান-জপ আরম্ভ করে দে।"... সাড়া না পেলে বা আমরা উঠিনি মনে হলে তিনি দরজার নিচে দিয়ে জল ঢেলে দিতেন। সব ভিজে যাওয়ার ভয়ে তাড়াতাড়ি আমাদের উঠে পড়তে হতো।' 


ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় যে প্রথম প্রথম এলার্মের সাহায্য লাগলেও পরে বডিক্লক নিজেই এই প্রাত্যহিক রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, ঠিক সময় আপনাআপনিই ঘুম ভেঙে যায়, আর আলাদা করে ভোরে ওঠার চেষ্টা করতে হয়না। এই সময়টা কিন্তু exclusively আমার সময়, একান্তই আমার। এই সময় বাহ্যিক কোনো কিছুর সাথে আমি সম্পূর্ণরূপে সম্পর্কহীন। বাহ্যিক অর্থে ভৌতিক। অবশ্যই ধ্যানে আমার ইষ্টদেব তাঁর মর্তলীলার রূপ ধরেই আসবেন, কিন্তু সেটা বাহ্যিক নয়। আসলে এই সময় যেহেতু মন স্বভাবতই অন্তর্মুখী থাকে, তাই সাধারণত দেহের চাহিদাগুলোকে অপ্রয়োজনীয় বোধ হয় - ফলে ধ্যান ভালো জমে। আবার বাসনাকে ঈশ্বরের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যেও প্রতিদিন ব্রাহ্মমুহূর্তে নিজের মনকে গুটিয়ে একজায়গায় করে ফেলার অভ্যেসটি খুব দরকার। অবশ্য এসব কথা তাঁদের জন্য যাঁরা আত্মবোধের পথযাত্রী, সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।


কথামৃতে দেখছি ২৪শে অগস্ট ১৮৮২ সালে ঠাকুর মাষ্টারমশাইকে বলছেন :

শ্রীরামকৃষ্ণদেব — অন্তরে কি আছে জানবার জন্য একটু সাধন চাই।

মাস্টারমশাই — সাধন কি বরাবর করতে হয়?

শ্রীরামকৃষ্ণদেব — না, প্রথমটা একটু উঠে পড়ে লাগতে হয়। তারপর আর বেশি পরিশ্রম করতে হবে না। যতক্ষণ ঢেউ, ঝড়, তুফান আর বাঁকের কাছ দিয়ে যেতে হয়, ততক্ষণ মাঝির দাঁড়িয়ে হাল ধরতে হয়, — সেইটুকু পার হয়ে গেলে আর না। যদি বাঁক পার হল আর অনুকুল হাওয়া বইল, তখন মাঝি আরাম করে বসে, হালে হাতটা ঠেকিয়ে রাখে, — তারপর পাল টাঙাবার বন্দোবস্ত করে তামাক সাজতে বসে। কামিনী-কাঞ্চনের ঝড় তুফানগুলো কাটিয়ে গেলে তখন শান্তি।


আসলে সবটাই অভ্যেসের ব্যাপার, নিজের চেষ্টার সত্যিই কোনো alternative নেই। পরম পূজনীয় রাজা মহারাজ বলছেন, "প্রত্যহ কিছু-কিছু ধ্যান করবে। কোন দিন বাদ দেবে না। মন বালকের ন্যায় চঞ্চল, ক্রমাগত ছুটাছুটি করে। উহাকে বারবার টেনে এনে ইষ্টের ধ্যানে মগ্ন করবে। এইরূপ দুই-তিন বৎসর করলেই দেখবে যে,  প্রাণে অনির্বচনীয় আনন্দ আসছে, মনও স্থির হচ্ছে"। তবে সব শেষে মায়ের কৃপা ছাড়া কিছুই পাওয়ার নয়, ঐখানেই ঝুঁটিটি ধরা আছে - যেমন চাইবেন তেমন হবে। প্রতিদিন জপের আগে আর ফল অর্পণের পর তাই মহামায়ীর কৃপা প্রার্থনা ভীষণ ভীষণ জরুরি।


ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় যে কয়েকটি অভ্যেস করলে মন একাগ্র করতে সুবিধা হয়।

১. প্রতিদিন নিয়ম করে সকাল এবং সন্ধ্যায় ভজন বা ঈশ্বরীয় কথা শোনা। এখন ইউটিউবের দৌলতে এসব খুবই সহজলভ্য। কেবল কিছুক্ষন সবার কাছ থেকে সরে গিয়ে ঘরের একটা কোনে me time আর একটা হেডফোন - ব্যাস।

২. প্রতিদিন তেরো ঘন্টার উপবাস - সন্ধ্যে ৭.০০ থেকে পরদিন সকাল ৮.০০ পর্য্যন্ত। নির্জলা নয় কিন্তু।

৩. প্রতিদিন সন্ধ্যে ৭.০০টার মধ্যে একটু মুড়ি-বাদাম বা দুটো কলা বা শুকনো চিঁড়েভাজা আর সঙ্গে আধ লিটার গরুর দুধ - এটাই রাতের খাবার - এতে শরীর ঝরঝরে থাকে আর জপ-ধ্যানে সুবিধে হয়।

৪. কোনো বিবাদে না জড়ানো, কারো সঙ্গে তর্ক না করা, কোনকিছু পছন্দ না হলে সেখান থেকে চুপচাপ সরে আসা - মোদ্দা কথা মন যাতে agitated হবে এবং পরে ধ্যানে মন বসাতে কষ্ট হবে, সেসব করে সময় নষ্ট না করা। 

৫. জাগতিক বিষয়ে যতদূর সম্ভব নির্লিপ্ত থাকা, সামাজিকতার ব্যাপারে involved না হওয়া - তাতে কে কি ভাববেন বলে মাথা না ঘামিয়ে কি কি করলে মায়ের কৃপালাভ হবে - গোটা মনের orientationটা সংসারের যাঁতাকলে থেকে প্রতিদিন একটু একটু করে সেইদিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া।

৬. বিষয়ী লোকের সঙ্গ যতদূর সম্ভব পরিহার করে চলা এবং যে যে সঙ্গে বা পরিবেশে মন নিচে নেমে যায়, পার্থিব বাসনা জেগে ওঠে, সেসব থেকে যতদূর সম্ভব দূরে থাকা। 

৭. There is nothing to be apologetic about being a seeker. If others don't understand that goal, no sweat. Sometimes ignoring them is alright.

৮. নিয়মিত দেবদর্শন, তীর্থভ্রমণ, সন্ন্যাসীর সঙ্গ, ধর্মালোচনা, সাত্ত্বিক আহার, সাত্ত্বিক জীবন, gradual withdrawal from worldly wants and engagements আর শুদ্ধচিন্তা - একটা বয়সের পর এটাই routine হওয়া দরকার।


বাকি, মায়ের ইচ্ছা। আমরা যন্ত্র, তিনি যন্ত্রী।

Sunday, October 31, 2021

হিন্দুর কেন শত্রুবোধ থাকবে?

আজকাল প্রযুক্তির যুগে যা শুনতে চাইনা, তাও কিভাবে যেন ঠিক কানে চুঁইয়ে পড়ে। এরই মধ্যে কবে যেন শোনা গেল একজন বিদগ্ধজন একটি চমৎকার বক্তৃতার শেষে বলছেন যে আজকে হিন্দুদের 'শত্রুবোধ' থাকা উচিত। ভদ্রলোক কি অর্থে এই কথাটি বলেছেন আমি তার মধ্যে ঢুকছি না কিন্তু কাকে আমরা শত্রু বলছি, সবার আগে বোধহয় সেই বোধটা থাকা দরকার - তারপর প্রয়োজনীয়তা বা অপ্রয়োজনীয়তার প্রশ্ন আসে। ইংরেজিতে কয়েকটি উৎকৃষ্ট শব্দ আছে, যার মধ্যে কোনটা যে ঠিক ঠিক শত্রুত্বকে ব্যাখ্যা করে, স্পষ্ট করে বুঝতে পারলে বড় সুবিধা হতো। Enemy, Opponent, Adversary, Foe না Antagonist - কে আসল শত্রু কারণ সবই তো কেবল ভিন্ন ভিন্ন স্তরের অ-মিত্রতা? 

বাংলা অভিধানেও শত্রুর অর্থ হিসেবে দুটি আলাদা পর্যায়ের অ-মিত্রতার ব্যাখ্যা আছে - ১. মনে মনে বা প্রকাশ্যে ঘৃণা করে কিংবা ক্ষতিসাধন করে এমন ব্যক্তি; অরি, বৈরী; ২. প্রতিপক্ষ, বিপক্ষ। আবার আমাদের প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে একটু অন্যরকম শত্রু দেখছি - তার কয়েকটি negative, আবার কয়েকটি positive ও বটে। ওতে যেমন বাতশত্রু, পিত্তশত্রু, কাফশত্রু ইত্যাদি আছে, তেমনিই ঘৃতশত্রু, দুগ্ধশত্রুও আছে আবার বুদ্ধিশত্রু, জ্ঞানশত্রু আর আত্মশত্রুও আছে। বিষয়টা তলিয়ে ভাবলেই বোঝা যায় যে শত্রুতা একটি দৈহিক বা মানসিক অবস্থান বিশেষ, যাকে opportunityতে বদলে দেওয়ার উপায় খোঁজাই হলো সঠিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি।

আবার অন্যদিকে ঋগ্বেদে প্রথম যেখানে শত্রুতার উল্লেখ পাচ্ছি তা বৈরী মানসিকতা সংক্রান্ত, সরাসরি বৈরীতা সংক্রান্ত নয়। ঋষি প্রশ্ন করেছেন,

ज्योक्चि॒दत्र॑ तस्थि॒वांसो॑ अक्रञ्छत्रूय॒तामध॑रा॒ वेद॑नाकः ॥ ১.৩৩.১৫

jyok cid atra tasthivāṃso akrañ chatrūyatām adharā vedanākaḥ ||

ইংরেজিতে: “do you inflict sharp pains on those of hostile minds, who have long stood against us.”

এক্ষেত্রে এমন একজনকে আঘাত করার কথা বলা হচ্ছে যিনি বৈরী মানসিকতার বশবর্তী হয়ে দীর্ঘদিন বিরুদ্ধতা করে আসছেন। অর্থাৎ যিনি একত্রে মানসিকরূপে ও সামাজিকরূপে আমার বিরোধী এবং যাঁর কর্মকান্ডের ফলে আমি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত - তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়, প্রয়োজনে প্রত্যাঘাতও করা যায়, কিন্তু সবটাই অনেকদিন সহ্য করার পর এবং ন্যায়-নীতির ভিত্তিতে। উল্লেখ্য যে এখানে গোটা প্রতিক্রিয়াটাই কিন্তু retrospective ও reciprocal - পূর্বনির্ধারিত বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, অর্থাৎ শত্রুবোধজাত নয় - কর্তব্যজাত, প্রতিকারগত, deterrent।

প্রাচীন ভারতে মর্য্যাদা-আধারিত সামাজিক সীমারেখার বিশেষ সন্মান ছিল এবং এই মর্য্যাদা নির্ধারিত হতো ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত ধর্মবোধের দ্বারা। সমস্ত সম্পর্কের ভিত্তি ছিল এই স্বতন্ত্রতার সীমারেখা আর তা লঙ্ঘন করা পাপ বলেই বিবেচিত হতো। শ্রীরামচন্দ্রের বা শ্রীকৃষ্ণের জীবন দেখলেই আমরা বুঝতে পারি যে কিভাবে ধর্মভিত্তিক দায়িত্ববোধ তাঁদের সমস্ত নির্ণয়কে আলোকিত করতো। সাথে সাথে এটাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বিরোধিতা কখনোই শক্তির প্রমাণ নয়। শক্তিমান তিনি, যিনি সহনশীল, সহ্য করতে পারেন। সাধারণত অপরে সীমারেখা অতিক্রম করলে ক্রোধ উৎপন্ন হয় আর ক্রোধ থেকেই শত্রুবোধের জন্ম হয়। ক্রোধ বুদ্ধিকে বিচলিত করে তোলে। আর বুদ্ধিবিভ্রাট মানেই পতন। যখন হৃদয় থেকে ক্রোধ দূর হয়ে যায়, তখনই সহনশক্তি ধর্মের শক্তিতে পরিণত হয়। ক্রোধ থেকে প্রতিশোধের জন্ম হয় আর ধর্ম থেকে ন্যায়ের। এই দুই অবতারের জীবনে শুধুই ন্যায়, মর্য্যাদারক্ষা আর কর্তব্যবোধ, কোথাও কোনো ক্রোধও নেই, শত্রুবোধও নেই। এটা শিক্ষণীয়।

আসলে মানুষের সত্যিকারের শত্রুকে চিহ্নিত করার উপায় শ্রীকৃষ্ণ গীতার ষষ্ঠ অধ্যায়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন:

উদ্ধরেদাত্মনাত্মনং নাত্মনমবসাদয়েৎ। 

আত্মৈব হ্যাত্মনো বন্ধুরাত্মৈব রিপুরাত্মনঃ।।৫।।

অনুবাদঃ মানুষের কর্তব্য তার মনের দ্বারা নিজেকে জড় জগতের বন্ধন থেকে উদ্ধার করা, মনের দ্বারা আত্মাকে  অধঃপতিত করা কখনই উচিত নয়। মনই জীবের অবস্থা ভেদে বন্ধু ও শত্রু হয়ে থাকে। 

বন্ধুরাত্মনস্তস্য যেনাত্মৈবাত্মনা জিতঃ। 

অনাত্মনস্তু শত্রুত্বে বর্তেতাত্মৈব শত্রুবৎ।।৬।।

অনুবাদঃ যিনি তাঁর মনকে জয় করেছেন, তাঁর মন তাঁর পরম বন্ধু কিন্তু ‍যিনি তা করতে অক্ষম, তাঁর মনই তাঁর পরম শত্রু। 


আসল জীবনটা তো সরলরেখায় চলে না, ফলে সামাজিক শত্রুতারও বিভিন্নতা আছে, সময় বিশেষে যার স্তরান্তরণও ঘটে, বাস্তবিকই প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। মতান্তর থেকে মনান্তর, মনান্তর থেকে ক্রোধ, ক্রোধ থেকে বিদ্বেষ, বিদ্বেষ থেকে শত্রুভাবাপন্নতা, এবং শত্রুভাব থেকে অনাত্মীয়তা, অসামাজিকতা, অসহিষ্ণুতা এবং দৌরাত্ম - এটাই যেন ইদানিং অহিন্দুসুলভ অসামাজিক যাপনের অঙ্গ হয়ে পড়েছে। বস্তুতঃ, মতান্তর যদি শত্রুতার ভিত্তি হয় তাহলে সামাজিক ভিন্নতা এবং বহুমাত্রিকতা মূল্যহীন হয়ে পড়ে এবং সমাজে মানুষের স্বাধীন চিন্তার কোনো স্থান থাকে না, যা হিন্দুদের সনাতন ধর্ম-সংস্কৃতির একেবারে বিপরীত। আমাদের প্রত্যেকের ভেবে দেখা উচিত ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য শত্রুবোধের আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে নাকি ধর্মবোধ আর নিজের সমাজ-সংস্কৃতিকে রক্ষা করার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা ও উপলব্ধিসঞ্জাত কর্তব্যবোধই যথেষ্ট।


আমাদের ভেবে দেখা দরকার যে ভবিষ্যতে আমরা আদৌ প্রাচীন হিন্দু সংস্কৃতির প্রকৃত ধারক এবং বাহকরূপে এক স্থিতপ্রজ্ঞ বহুমাত্রিক modern achiever race হিসেবে চিহ্নিত হতে চাই নাকি পন্থতান্ত্রিকদের মতন ভিন্নতাবিরোধী কুপমণ্ডূক জঙ্গি মানসিকতাসম্পন্ন এক ঘৃণ্য জনগোষ্ঠী হিসেবে আতঙ্কের বাতাবরণ তৈরি করতে চাই। চিরায়ত ভারত এই অনিত্য শত্রুবোধ-মিত্রবোধের অনেক ঊর্ধ্বে উঠে জীবনের আসল মানে খুঁজে পেয়েছিল। সেটাই শাশ্বত, বাকিটা কেবল দুপয়সার সস্তা রাজনীতি।

Monday, October 25, 2021

কর্পোরেট বার্নআউট থেকে মুক্তির উপায়

 চোখের সামনে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোর মধ্যে কর্পোরেট বার্নআউটের বীভৎস রূপটি দেখছি আর ভাবছি মানুষের মনে জাগতিক চাহিদা সম্পর্কে একটু awareness জগলেই তারা আখেরে কি পাওয়ার জন্য 'চাই চাই' করে দিকবিদিকজ্ঞানশূন্যের মতন আচরণ করতে শুরু করে? এত কষ্ট করে চোখকান বন্ধ করে পড়াশুনা করা, এত compitition এর মধ্যে দিয়ে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করা, তারপর কর্পোরেট হানিমুন শেষ হয়ে গেলেই গুচ্ছের বিরক্তি, অশান্তি, ভয়, বেদনা, anxity, stress নিয়ে আধপাগল হয়ে যাওয়া- আখেরে কিসের জন্য? 


জীবনধারণের জন্য রোজগার চাই, অবশ্যই চাই - সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু জীবনের মূল উদ্দেশ্যটাই যদি রোজগারের হাঁড়িকাঠে বলি হয়ে যায়, তাহলে সেই প্রাণঘাতি রোজগারের প্রয়োজন কোথায়? কর্পোরেটদের যাঁতাকলে পিষে পিষে - এটাকেই সারা জীবনের ভবিষৎ বলে ধরে নিয়ে জীবনের প্রতিই কি মারাত্মক bitterness জন্মায় - অবিশ্বাস্য! সমস্ত সময় মন খারাপ, সমস্ত সময় অপ্রাপ্তি, সর্বক্ষণ দুঃশ্চিন্তা, কিছুতেই শান্ত না হতে পারা, কোনোকিছুই নিরবিচ্ছিন্নভাবে সম্পুর্নরূপে উপভোগ করতে না পারা - এই জন্যই কি ঈশ্বর মানুষের দেহ-মন দিয়েছেন?


এরা কেউ আশেপাশে থাকলে অজান্তেই একটা অশান্তির বলয় সৃষ্টি হয়। এদের আচার-ব্যবহারে কিছু telltale signs থাকে যেমন কথায় কথায় বিরক্তি প্রকাশ করা, ঝাঁঝিয়ে উঠে কথা বলা, যেখানে সম্ভব oneupmanship, একটু নরম মাটি পেলেই ভেতরের যন্ত্রণার ঠান্ডা বা গরম ক্রোধরূপে বহিঃপ্রকাশ, সর্বক্ষণ স্মার্টফোনে আর ল্যাপটপে ডুবে থাকা, মন সম্পূর্ণরূপে নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, জাগতিক খেলনায় ক্ষনিকের আনন্দ খোঁজা আর পয়সার জন্য সর্বদা লালায়িত - যেন অনেক বেশি পয়সা জমানো থাকলেই মন নিশ্চিন্ত থাকবে আর সমস্ত দুঃখকষ্টের অবসান হবে! আবার মজার ব্যাপার হলো, হাতে টাকা থাকা স্বত্তেও এরা ফস করে যেখানে সেখানে ক্রেডিট কার্ড বের করেন কারণ ক্রেডিট হিস্ট্রি তৈরি করা দরকার - ঋণী হওয়ার পথ সুগম করার জন্য! হায়রে! 


আসলে এদের দোষ নেই - দুনিয়াটাই ভুল ছন্দে চলছে। ছোটবেলা থেকে মানুষ শিখছে কিভাবে অন্যের দুঃখে সুখী হতে হয়, কিভাবে অনিত্যের নিরিখে নিজের মূল্যায়ন করতে হয়, কিভাবে অন্দরের দ্বার বন্ধ করে শুধুমাত্র বাইরে সুখের চাবিকাঠির জন্য হাতড়ে মরতে হয়। লেখাপড়ার মধ্যে ইতিহাস, ভূগোল, রসায়ন, পদার্থ সবকিছু আছে, কেবল উপলব্ধির অঙ্কটি নেই। শিক্ষার পুরো বৃত্তটাই জাগতিক - সেই জগৎ যা নতুন শরীর ধারণ করলে আর চেনার উপায় নেই - সেই ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স, সম্পত্তি, সোনাদানা, পরিবার পরিজন যা প্রতিদিন গভীর ঘুমে গায়েব হয়ে যায় আর চোখ খুললেই ফিরে আসে কিন্তু বর্তমান শরীর parmanently চোখ বোঝার পর parmanently গায়েব হয়ে যায় - নতুন শরীর নিয়ে পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও যাকে আর চেনা যায়না - এর জন্যই জীবনপাতের কুশিক্ষা এবং যুক্তিহীন যাপন।


বাবা মা হিসেবে আমাদের ভেবে দেখা দরকার কি ধরণের সংস্কার আমরা আমাদের সন্তানদের দিচ্ছি - তারা কিন্তু আমাদের দেখেই শিখছে। যা নিয়ে তারা জীবনের সাথে যুদ্ধ করতে নামছে তার ভেতর চক্রবুহ্য থেকে বেরোনোর শিক্ষাও আছে তো? আমরা আমাদের নিজেদের সারাজীবনের অকারণ পাগলামি তাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছি না তো? আমরা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মচিন্তন আর আত্মবোধ শেখাচ্ছি তো? তবে সবার আগে, আমরা নিজেরা ইঁদুর দৌড়ের অসারতা উপলব্ধি করে তার থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছি তো? কাজ তো করতেই হবে, জরুরিও বটে। কিন্তু সেই কাজের উদ্দেশ্যটি কি আমরা ছেলেমেয়েদের শিখিয়েছি? শ্রীশ্রীমা সারদাদেবী খুব সহজ করে বুঝিয়েছেন, “কাজ করা চাই বইকি; কর্ম করতে করতে কর্মের বন্ধন কেটে যায়, তবে নিষ্কাম ভাব আসে। একদন্ডও কাজ ছেড়ে থাকা উচিত নয়”। কিন্তু সেই কর্ম নিষ্কাম হতে হবে, বাসনা থাকলেই বিপদ। তাই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলছেন, "যতক্ষন তোমার সঙ্গে বাসনা, ততক্ষণই ভাবনা আর এই ভাবনাই হল তোমার দুঃখ কষ্ট মোহ মায়ার কারণ.."। এই হলো লাখ কথার এক কথা।


প্রথম শিক্ষা হলো প্রেম - সার্বজনীন প্রেম। উদাহরণস্বরূপ, আমার ফুসফুস কি শুধুই আমার শরীরের ভেতরে, তার বাইরে নেই? ওই যে জানলা দিয়ে রাস্তার ধারের গাছটা দেখতে পাচ্ছি, সে কি আমার ফুসফুসের অন্য অংশটি নয়? সে যা ছাড়ছে সেটাই তো আমার প্রাণবায়ু - সেই অক্সিজেন দিয়েই তো আমার ফুসফুস কাজ করছে। আর আমি যা ছাড়ছি সেটা ওই গাছটির প্রাণবায়ু, তা দিয়ে সে বেঁচে আছে, আমার জন্য অক্সিজেন তৈরি করছে। তাহলে আমারই ফুসফুসের অন্য অংশটির ক্ষতি কি আমার ক্ষতি নয়? তারপর ধরুন তাতে যে পাখিরা বাসা বেঁধে আছে, তার ফুলের মধু খেতে যে মৌমাছিরা আসছে - তাদের মাধ্যমেই তো তার বীজ ছড়াচ্ছে, তার ফল ফলছে, আমার জন্য আরো প্রাণবায়ু তৈরি হচ্ছে - তারাও কি আমার অস্তিত্বের অংশ নয়, তাদের প্রত্যেকের প্রতি প্রেমও কি আমার আত্মপ্রেমেরই প্রকাশ নয়? শ্রীশ্রীমা বলছেন, “জগৎকে নিজের করে নিতে শেখো | কেউ পর না, জগৎ তোমার”। সর্বজনে প্রেম, সর্বভূতে প্রেম - এই অখিল ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি কণা আমারই extension, ফলে ভেতরে বাইরে সবই আমি আর সবই আমার - এটা হলো প্রথম শিক্ষা।


দ্বিতীয় শিক্ষা হলো মন ও মনের মধ্যে ক্রমাগত বুদবুদের মতন ভেসে ওঠা বাসনাদের নিয়ন্ত্রণ - যেটুকু প্রয়োজন শুধু সেটুকুই চাওয়া, তার ওপরে বাকি সব চাওয়া হলো চৌর্যবৃত্তি, অর্থাৎ অন্যের allocation এ ভাগ বসানো। বাসনা প্রসঙ্গে ঠাকুর বলছেন, "যার যেমন ভাব তার তেমনি লাভ; ভগবান্ কল্পতরু। তাঁর কাছে যে যা চায়, সে তাই পায়। গরীবের ছেলে লেখাপড়া শিখে হাইকোর্টের জজ হয়ে মনে করে, "আমি বেশ আছি।" ভগবানও তখন বলেন, "তুমি বেশ থাক।" তারপর যখন সে পেনশন নিয়ে ঘরে বসে, তখন সে বুঝতে পারে এ জীবনে কল্লুম কি? ভগবানও তখন বলেন, "তাই তো, তুমি কল্লে কি?"। আবার অন্য একজনকে বাসনাহীনতা সম্পর্কে বলছেন, "বাসনাহীন মন কেমন জান? যেন শুকনো দেশলাই - একবার ঘষলে দপ করে জ্বলে উঠে। আর ভিজে হলে ঘষতে ঘষতে কাঠি ভেঙ্গে গেলেও জ্বলে না। সেইমত সরল, সত্যনিষ্ঠ, নির্মল-স্বভাব লোককে একবার উপদেশ দিলেই ঈশ্বরানুরাগের উদয় হয়। বিষয়াসক্ত ব্যক্তিকে শত শতবার উপদেশ করলেও কিছু হয় না।" এই বাসনা নিয়ন্ত্রণ একমাত্র সবার প্রতি প্রেম থেকেই আসে অর্থাৎ 'আমি প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেলে আমারই আত্মজর জন্য খাবার কম পড়ে যাবে, বেচারা অভুক্ত থাকবে' - এই একাত্মবোধটা থাকা খুব দরকার। এর থেকেই দয়াভাব আসে। শ্রীশ্রীমা বলছেন, “যে অল্পেতে তুষ্ট থাকে, তার কাছে এই পৃথিবীর সব কষ্ট সহজ হয়ে যায়”। আবার অন্য আরেকজনকে শ্রীশ্রীমা বলছেন, “ভগবান দর্শন বলো, ধ্যান বল, সবই মন। নিত্য ধ্যান করবে। কাঁচা মন কিনা? ধ্যান করতে করতে মন স্থির হয়ে যাবে। সর্বদা বিচার করবে। যে বস্তুতে মন যাচ্ছে তা অনিত্য চিন্তা করে ভগবানে মন সমর্পণ করবে”। এই হলো দ্বিতীয় শিক্ষা।


তৃতীয় শিক্ষা হলো মায়াকে বোঝা ও তাকে পাশ কাটিয়ে আত্মোপব্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়া। আসলে ঠাকুরের মতন সহজ করে বোঝানো মুশকিল, তাই এই প্রসঙ্গেও ঠাকুরের কথাই তুলে ধরা যাক, "জীবাত্মা-পরমাত্মার মধ্যে এক মায়া-আবরণ আছে। এই মায়া-আবরণ না সরে গেলে পরস্পরের সাক্ষাৎ হয় না। যেমন অগ্রে রাম, মধ্যে সীতা এবং পশ্চাতে লক্ষ্মণ। এস্থলে রাম পরমাত্মা ও লক্ষ্মণ জীবাত্মাস্বরূপ, মধ্যে জানকী মায়া-আবরণ হয়ে রয়েছেন। যতক্ষণ মা জানকী মধ্যে থাকেন, ততক্ষণ লক্ষ্মণ রামকে দেখতে পান না। জানকী একটু সরে পাশ কাটালে তখন লক্ষ্মণ রামকে দেখতে পান"। আবার অন্যত্র ঠাকুর বলছেন, "মায়া কাকে বলে জান? - বাপ, মা, ভাই, ভগ্নী, স্ত্রী, পুত্র, ভাগ্নে, ভাইপো, ভাইঝি - এই সব আত্মীয়দের প্রতি টান ও ভালবাসা; আর দয়া মানে - সর্বভূতে আমার হরি আছেন এই জেনে সকলকে সমান ভালবাসা"। কথায় বলে মায়ার সংসার বা সংসারের মায়া - দুটি যেন সমার্থক।


কথামৃত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংসার প্রসঙ্গে শ্রীমতি মহুয়া বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ব্লগে বড় ভালো লিখেছেন:

'সংসার। বড় মোহের আর বড় মায়ার জায়গা। মায়া নেই তো সংসারও নেই। মায়া থেকেই তো বহু। আর বহু থেকেই সংসার।

উপনিষদের আদি অনন্ত নিরাকার সত্তা যেদিন ইচ্ছে করেছিলেন—‘বহু স্যাম’, আমি বহু হব, প্রকৃতপক্ষে সেদিন থেকেই সংসারের শুরু।

মায়া জাগল তাঁর। যোগমায়া। আপন স্বরূপকেই ভিন্ন ভিন্ন রূপ দিতে শুরু করলেন।

তবে যোগমায়ায় যোগ আছে। ইচ্ছেমাত্র যোগে যুক্ত হতে পারেন। সমস্ত খণ্ড আবার এক বিরাট ‘আমি’তে লয় পেতে পারে।

অনন্তের সে সংসার বিদ্যার সংসার।

আর আমাদের?

সংসার মানে বহু তো বটেই। তবে শুধু জনে নয়, মনে বহু।

বাবা মা ভাই বোন স্বামী স্ত্রী ছেলে মেয়ে—মাথাগুন্তি এত বহু‘র সমাহারে সংসার আর একা থাকলে নেই, তা কিন্তু নয়।

সংসার আসলে মনে।

সংসার আসলে চিন্তায়।

যার যেমন প্রকৃতি, যার যেমন সঙ্গ, তার চিন্তাও সেই অনুযায়ী।'


চতুর্থ এবং সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা হলো আত্মজ্ঞান। ঠাকুর বলছেন, "মানুষ আপনাকে চিনতে পারলে ভগবানকে চিনতে পারে। 'আমি কে' ভালরূপ বিচার করলে দেখতে পাওয়া যায়, 'আমি' বলে কোন জিনিস নেই। হাত, পা, রক্ত, মাংস ইত্যাদি - এর কোনটা 'আমি'? যেমন প্যাঁজের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে কেবল খোসাই বেরোয়, সার কিছু থাকে না, সেইরূপ বিচার কল্লে 'আমি' বলে কিছুই পাইনে! শেষে যা থাকে, তাই আত্মা - চৈতন্য। 'আমার' 'আমিত্ব' দূর হলে ভগবান্ দেখা দেন"। আবার বলছেন, "যতক্ষণ সেথা সেথা (অর্থাৎ বাহিরে), ততক্ষণ অজ্ঞান; যখন হেথা হেথা (অন্তরের দিকে), তখন জ্ঞান। যার হেথায় আছে (অর্থাৎ অন্তরে ভাব আছে), তার সেথায়ও আছে (অর্থাৎ ভগবৎপদে স্থান আছে)"। 


কি দারুন কথা! একবার যদি বোঝা যায় যে আমি বলে আলাদা কিছু নেই, তখন কিসের ভেদাভেদ আর কিসের লোভ - সব দ্বন্ধ মিটে গিয়ে তো জীবনের অভিমুখটাই ঘুরে যাবে। এমন হলে কুলোক, কুচিন্তা ইত্যাদি আশেপাশে ভিড়তে পারেনা, তাদের মনমতো কিছু এখানে পাওয়া যায়না বলে। তার মানে কিন্তু কাজকম্ম ছেড়ে মুক্তকচ্ছ হয়ে 'শিবোহম শিবোহম' বলে চেঁচিয়ে বেড়ানো নয়। রামচন্দ্র নামক এক জটাজূটধারী ব্রহ্মচারী একদিন ঠাকুরকে দক্ষিণেশ্বরে দর্শন করতে এসেছিলেন। তিনি বসে অন্য কোন কথাবার্তা না বলে কেবল 'শিবোঽহম্' 'শিবোঽহম্' করতে লাগলেন। ঠাকুর খানিকক্ষণ চুপ ক'রে থেকে অবশেষে বল্লেন, "কেবল 'শিবোঽহম্' 'শিবোঽহম্' করলে কি হবে? যখন সেই সচ্চিদানন্দ শিবকে হৃদয়ে ধ্যান ক'রে তন্ময় হয়ে গিয়ে বোধে বোধ হয়, সেই অবস্থায় বলা চলে। তা ছাড়া শুধু মুখে 'শিবোঽহম্' বল্লে কি হবে? যতক্ষণ তা না হয়, ততক্ষণ সেব্য-সেবক-ভাবে থাকাই ভাল।" ঠাকুরের এইরূপ নানা উপদেশে ব্রহ্মচারীর চৈতন্য হল এবং তিনি নিজের ভ্রম বুঝতে পারলেন। যাবার সময় দেওয়ালের গায়ে লিখে রেখে গেলেন, "স্বামী-বাক্যে আজ হতে রামচন্দ্র ব্রহ্মচারী সেব্য-সেবক-ভাব প্রাপ্ত হল"। তাহলে সংসারে আনন্দে থাকার উপায় কি? 


এক ব্যক্তি ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করলেন, "সংসারে থেকে ঈশ্বর-উপাসনা কি সম্ভব?" পরমহংসদেব একটু হেসে বললেন, "ও দেশে দেখেছি, সব চিড়ে কোটে; একজন স্ত্রীলোক এক হাতে ঢেঁকির গড়ের ভেতর হাত দিয়ে নাড়ছে, আর এক হাতে ছেলে কোলে নিয়ে মাই খাওয়াচ্ছে, ওর ভেতর আবার খদ্দের আসছে, তার সঙ্গে হিসাব করছে - 'তোমার কাছে ওদিনের এত পাওনা আছে, আজকের এত দাম হল।' এই রকম সে সব কাজ করছে বটে, কিন্তু তার মন সর্বক্ষণ ঢেঁকির মুষলের দিকে আছে; সে জানে যে ঢেঁকিটি হাতে পড়ে গেলে হাতটি জন্মের মতো যাবে। সেইরূপ সংসারে থেকে সকল কাজ কর; কিন্তু মন রেখো তাঁর প্রতি। তাঁকে ছাড়লে সব অনর্থ ঘটবে"। শ্রীশ্রীমা এই একই কথা খুব সহজভাবে বোঝাচ্ছেন, "যিনি ব্রহ্ম, তিনিই শক্তি আর তিনিই মা। দরকার নেই ফুল, চন্দন, ধূপ, বাতি,  উপাচারের। মাকে আপন করে পেতে শুধু মনটাকে দেও তাঁরে”। এর ওপরে আর কথা নেই, তা যিনি যতই কর্পোরেট হঞ্চ হন না কেন। মনটা কর্পোরেটকে নয়, নিজেকে দিলেই আসল কাজ হয়ে যাবে। বাইরে নিষ্কামভাবে কাজ করে যাওয়া আর মনটা নিজের ভেতরে ঘুরিয়ে দেওয়া - ব্যাস, সব অশান্তি, অপ্রাপ্তির শেষ।


আবার শ্রীমতি মহুয়া বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্লগের সূত্র ধরেই সকলের শান্তি কামনা করে শেষ করি:

'যার যেমন প্রকৃতি, যার যেমন সঙ্গ, তার চিন্তাও সেই অনুযায়ী।

কোনও একটিমাত্র চিন্তা নয়। চিন্তার স্রোত। তরঙ্গ।

সেই তরঙ্গ কোনও ব্যক্তি মানুষকে নানা কাজে প্রবৃত্ত করে।

তার জন্য তার আশপাশে কেউ আছে কি নেই, তাতে বিশেষ কিছু যায় আসে না।

শ্রীরামকৃষ্ণ এর পরে যেমন বলবেন, তিন কুলে কেউ না থাকলেও মহামায়া একটা বেড়াল পুষিয়েও সংসার করান।

অর্থাৎ সংসারের মূল হল মনের প্রকৃতি।

এখন একবার জড়িয়ে গেলে জড়াতেই থাকে। তার কারণ আসক্তি। প্রতিটি কাজ বা চিন্তার সঙ্গে আমার আমিকে ওতপ্রোত যুক্ত করে ফেলি।

সেই আমি যত সঙ্কুচিত হয়, তাকে জড়িয়ে ধরা জালটা তত সমুদ্রের মতো অনন্ত হয়ে পড়ে।

এখন উপায়?

শ্রীরামকৃষ্ণ বলবেন, বড় মানুষের বাড়ির দাসীর মতো থাকতে হবে। সবই করা হচ্ছে অথচ অনাসক্ত ভাব। মনে জানে, এরা আমার নিজের কেউ নয়।

তবে নিজের কে?

সেই মাস্তুল। যাঁকে ধরলে সমুদ্রে ডোবার ভয় আর নেই।

মাস্টারমশাই চিনলেন ওই বারান্দাতেই। সংসার কী আর তার কর্ণধার কে।

এবার তাঁর অন্য আমি-র জাগরণ। সে আমি ভক্তের আমি।'

ওঁ শান্তি শান্তি শান্তিঃ।