Wednesday, May 11, 2022

গীতা ৮.৩

অষ্টম অধ্যায়ের তৃতীয় শ্লোকে শ্রীভগবান বলছেন, 
অক্ষরং ব্রহ্ম পরমং সভাবোহধ্যাত্মমুচ্যতে।
ভূতভাবোদ্ভবকরো বিসর্গঃ কর্মসংজ্ঞিতঃ।।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার বেশিরভাগ শ্লোকের ক্ষেত্রেই একেকদিন এক এক রকমের মানে মনের মধ্যে ভেসে ওঠে, মন যেদিন যে ভাবে থাকে সেই ভাব অনুযায়ী আরকি। আজ সকালে যেভাবে এই শ্লোকটির মানে বুঝতে পারলাম, তা নিজের জন্যই লিখে রাখছি যাতে পরে ভুলে না যাই:

অক্ষরম মানে 'ন ক্ষরতি' - that which does not perish - অক্ষয়। 'অক্ষরং ব্রহ্ম পরমং' মানে যাঁর নাশ নেই তিনিই পরমব্রহ্ম। 
'সভাবঃ-অধ্যাত্মম্-উচ্যতে' মানে স্বভাবই আধ্যাত্ম বলে উল্লিখিত হয়। সেটা কিরকম? না, জীব আর ব্রহ্মের স্বভাব একই। ব্রহ্মই জীবরূপে উৎপন্ন হয়ে সুখ দুঃখ ভোগ করেন আর এইজন্যই তাঁকে আধ্যাত্ম বা জীবচৈতন্য বলে। অর্থাৎ এখানে প্রতি জীবদেহে পরব্রহ্মের প্ৰত্যগাত্মরূপে অবস্থানকেই একটি শব্দে বোঝানো হয়েছে।

'ভূত-ভাব-উদ্ভবকরঃ বিসর্গঃ' - ভূত মানে পৃথিবী, তার যে ভাব অর্থাৎ বস্তু, সেটাই ভূতভাব। সেই ভূতভাব অর্থাৎ এই মায়ার জগতের মূলে যে কামনা বাসনা - আমার বিবেচনায় তাকেই এখানে 'ভূতভাবোদ্ভবকর' বলা হয়েছে। বিসর্গঃ কি? নির্বাসনা, ভূতভাবের উৎপত্তিকারক সবকিছুকে ত্যাগ করার যজ্ঞ। কি ত্যাগ? যা কিছু ক্ষয়িষ্ণু, অনিত্য, সাময়িক, সে সবকে পাওয়ার বাসনা ত্যাগ। আর বস্তুজগৎরূপ যজ্ঞকুণ্ডে প্রজ্জ্বলিত ত্যাগরূপ যজ্ঞাগ্নিতে দেহধারণের ফলে উৎপন্ন হওয়া বাসনারূপ যজ্ঞহবির আহুতিদানের এই engagement-কেই বলা হচ্ছে 'কর্ম', যার সম্পাদন সগুণ ব্রহ্মস্বরূপা মহামায়ার কৃপা হলে সম্ভব হয়। এটাই হলো নিষ্কাম কর্ম, যে কর্মের দ্বারা জগতের কল্যাণ হয় আর নিজেরও মোক্ষলাভ অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞান হয়। 

তাহলে সংক্ষেপে কি দাঁড়ালো? ব্ৰহ্ম = অবিনাশী পরম সত্তা = পরম অক্ষর। অধ্যাত্ম = দেহকে আত্মভাবে অধিকার করে যা কিছু আছে = স্বভাব। কৰ্ম্ম = ভূতনিচয়ের উৎপাদক যজ্ঞ = ভূতভাবোদ্ভবকরো বিসর্গঃ। বাউলরা বলেন যে এই দেহে অধিযজ্ঞরূপে ভগবান বিদ্যমান আছেন (অধিযজ্ঞোহহমেবাত্র দেহে দেহভূতাং বর - গীতা ৮.৪)। অধিযজ্ঞ মানে যিনি সমস্ত যজ্ঞের প্রবর্তক ও ফলদাতা, যিনি অন্তর্যামীরূপে দেহমধ্যে বাস করেন। যেহেতু দেহ দ্বারাই যজ্ঞাহুতি অর্থাৎ মায়াজগতের প্রতি মোহ ত্যাগ হয়, সেইজন্য লিঙ্গশরীরকে আশ্রয় করে আত্মসুখের জন্য যজ্ঞাভিমানিনী ভগবান এই দেহেই বসবাস করেন। ওঁরা তাই তাঁকে নিজের দেহের মধ্যে খোঁজেন, তাতে অসুবিধের তো কিছু নেই। বাউলদের দর্শন তো আর অদ্বৈতের বাইরে নয়। তাঁর সংসারে তিনি নেই এমন জায়গা কই?

Tuesday, May 10, 2022

প্রেম

জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখছি বাইরেটা ঝাপসা হয়ে গেছে, মাতার স্তন্যসুধা-হেন বৃষ্টির জীবনদায়িনী ফোঁটা ঝরে ঝরে পড়ছে অঝোরে। গাছের পাতাগুলো সব যেন স্নেহচুম্বনের পরিপূর্ণতায় একেবারে টগবগ করছে, বহতি ঝোড়ো হাওয়ার সাথে সাথে যেন মায়ের কোলে ওঠা শিশুর হটাৎ আনন্দের উচ্ছলতার স্পর্শ সবকিছুকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টিভেজা মাটি যেন উদ্ভিন্নযৌবনা সদ্যযুবতীর মতো আরক্তমুখে সোহাগে সিঞ্চিত হতে হতে প্রেমে নিশ্চিন্ত নির্ভর নিবেদিতা হয়ে পড়ছেন। একটু পরেই রোদ উঠবে, আলোর কণায় কণায় ভরে যাবে এই ভোর, পাতাদের ভিজে গায়ে যেন হাজার হাজার জোনাকি জ্বলে উঠবে, তার ফাঁক দিয়ে জীবন উঁকি মেরে মুচকি হেসে বলবে, "কেমন আছো?" হয়তো তারপর আবার আকাশ মেঘে ঢেকে যাবে, আবার বৃষ্টি নামবে, আবার আলো আর কালোর লুকোচুরি খেলা শুরু হবে। দেখছি আর রবীন্দ্রনাথ মনে পড়ছেন, মনে পড়ছে শেষের কবিতার অমিত আর লাবণ্যকে, মনে পড়ছে শিলং পাহাড়ে এমনই এক বৃষ্টিস্নাত দিনে অমিতের সেই কথাগুলো, "বিধাতার রাজ্যে ভালো জিনিস অল্প হয় বলেই তা ভালো, নইলে সে নিজেরই ভিড়ের ঠেলায় হয়ে যেত মাঝারি"। ওই হলো আসল কথা - 'ভালো'।

শিলং পাহাড়ে একসঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে অমিত যখন লাবণ্যকে একটা ছ্যাৎলাপড়া পাথরের ওপর বসতে অনুরোধ করেছিল, তখন লাবণ্য ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেছিল, "কিন্তু সময় যে অল্প।" উত্তরে অমিত কি বলেছিল মনে পড়ে? বলেছিল, "জীবনে সেটাই তো শোচনীয় সমস্যা লাবণ্যদেবী, সময় অল্প।… সময় যাদের বিস্তর তাদের পাঙ্কচুয়াল হওয়া শোভা পায়। দেবতার হাতে সময় অসীম; তাই ঠিক সময়টিতে সূর্য ওঠে, ঠিক সময়ে অস্ত যায়। আমাদের মেয়াদ অল্প, পাঙ্কচুয়াল হতে গিয়ে সময় নষ্ট করা আমাদের পক্ষে অমিতব্যয়িতা।" সবটাই তো সময়ের খেলা প্রভু। সময় হলে পাওয়া আবার সময় না হলে না-পাওয়া আর এই পাওয়া না-পাওয়ার মাঝের সময়টিতে নিজেকে বোঝা।
"ক্ষণিক আলোকে আঁখির পলকে তোমায় যবে পাই দেখিতে
ওহে ‘হারাই হারাই’ সদা ভয় হয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে।
আশ না মিটিতে হারাইয়া– 
পলক না পড়িতে হারাইয়া–
হৃদয় না জুড়াতে হারাইয়া ফেলি চকিতে। 
কী করিলে বলো পাইব তোমারে, রাখিব আঁখিতে আঁখিতে।"

অমিত একদিন বুঝেছিল যে প্রেমেরও বাহির আর ভেতর আছে, তার মধ্যে ওপরে ভেসে ওঠা আর ভেতরে ডুব দেওয়ার খেলাও আছে। তাই তো সে বলেছিল, "কেতকীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালোবাসারই। কিন্তু সে যেন ঘড়ায় তোলা জল, প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যের ভালোবাসা, সে রইল দীঘি। সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে।" আসলে ভেতরের জগতের মধ্যেই বাইরের জগৎটাও বিরাজ করে, ওটা যেমন, এটাও তেমনই সজীব - ফলে গোটাটাকে চাই, সুপুরিগাছ বেয়ে আকাশের দিকে উঠে যাওয়া লতাগুল্মের মতন একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে চাই। যাকে বাইরে দেখা যায়, তাকেই ভেতরে দেখা যায়, ঠিক যেন আয়নার সামনে দাঁড়ানোর মতন। আবার, চোখ খুললে যে আলো, চোখ বন্ধ করলেও তো সেই আলো, কেবল আলোর রকমফের কারণ চোখের নিজের যে কোনো আলো নেই। অন্ধকার মানে তো আসলে আলোই, আলোর বাইরের রূপ। যেমন প্রেম মানেই অপ্রেম আর অপ্রেম মানেই প্রেম। প্রেমের ওপর বাইরের আলো পড়লে তাকে খালি চোখে দেখা যায়, আর ভেতরে ঢুকলে সে আত্মগত হয়, তখন তাকে অন্তরের আলোয় দেখতে হয়। অমিতের সেই কথাগুলো মনে পড়ছে? "যে ভালোবাসা ব্যাপ্তভাবে আকাশে থাকে অন্তরের মধ্যে সে দেয় সঙ্গ; যে ভালোবাসা বিশেষভাবে প্রতিদিনের সব-কিছুতেই যুক্ত হয়ে থাকে সংসারে সে দেয় আসঙ্গ। দুটোই আমি চাই।"

Sunday, May 8, 2022

মৃত্যু ও রবীন্দ্রনাথ

আজ রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন। বেশ কয়েক ঘন্টা হয়ে গেল ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে, রাস্তাঘাট জনশূন্য, পাখিদের ডাকও তেমন শুনতে পাচ্ছি না।কেন জানিনা আমার মন গতকাল বিকেল থেকেই বড় মৃত্যুময়। আসলে গতকালই আরো এক বছর এগিয়ে গেছি মৃত্যুর দিকে, ফলে খালি মনে হচ্ছে আর বেশি সময় নেই - হয়তোবা আর মাত্র পনেরো-কুড়ি বছর, এটুকুর মধ্যে কি সেই চিরকালীন অধরা ক্ষণকালীন হয়ে আমার বোধে, চেতনায় ধরা দেবেন? নাকি এই জীবনটা সত্যিই একেবারে বৃথা যাবে?

রবীন্দ্রনাথ বলছেন,
"পৃথিবীতে সকল বস্তুই আসিতেছে এবং যাইতেছে-- কিছুই স্থির নহে; সকলই চঞ্চল-- বর্ষশেষের সন্ধ্যায় এই কথাই তপ্ত দীর্ঘনিশ্বাসের সহিত হৃদয়ের মধ্যে প্রবাহিত হইতে থাকে। কিন্তু যাহা আছে, যাহা চিরকাল স্থির থাকে, যাহাকে কেহই হরণ করিতে পারে না, যাহা আমাদের অন্তরের অন্তরে বিরাজমান-- গত বর্ষে সেই ধ্রুবের কি কোনো পরিচয় পাই নাই-- জীবনে কি তাহার কোনো লক্ষণ চিহ্নিত হয় নাই? সকলই কি কেবল আসিয়াছে এবং গিয়াছে? আজ স্তব্ধভাবে ধ্যান করিয়া বলিতেছি তাহা নহে-- যাহা আসিয়াছে এবং যাহা গিয়াছে তাহার কোথাও যাইবার সাধ্য নাই, হে নিস্তব্ধ, তাহা তোমার মধ্যে বিধৃত হইয়া আছে। যে তারা নিবিয়াছে তাহা তোমার মধ্যে নিবে নাই, যে পুষ্প ঝরিয়াছে তাহা তোমার মধ্যে বিকশিত-- আমি যাহার লয় দেখিতেছি, তোমার নিকট হইতে তাহা কোনোকালেই চ্যুত হইতে পারে না। আজ সন্ধ্যার অন্ধকারে শান্ত হইয়া তোমার মধ্যে নিখিলের সেই স্থিরত্ব অনুভব করি। বিশ্বের প্রতীয়মান চঞ্চলতাকে অবসানকে বিচ্ছেদকে আজ একেবারে ভুলিয়া যাই।" (বর্ষশেষ)

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে প্রাচীন ভারতের ঋষি মানুষকে অমৃতের পুত্র বলে সম্বোধন করে বলছেন,
‘শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ’ (শ্বেতাশ্বতর-২/৫)। 
তিনি আরো বলছেন, মৃত্যুকে অতিক্রম করার পন্থা -
‘বেদাহ্‌মেতং পুরুষং মহান্তম্‌ আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ। 
তমেব বিদিত্বাহ্‌তি মৃত্যুমেতি নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেহ্‌য়নায়।।’ (শ্বেতাশ্বতর-৩/৮)। 
দেখছি এই দিব্যচেতনার অসামান্য অনুবাদ করছেন আধুনিক ভারতের ঋষি রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থে -
‘শোনো বিশ্বজন,
শোনো অমৃতের পুত্র যত দেবগণ
দিব্যধামবাসী, আমি জেনেছি তাঁহারে,
মহান্ত পুরুষ যিনি আঁধারের পারে
জ্যোতির্ময়। তাঁরে জেনে, তাঁর পানে চাহি
মৃত্যুরে লঙ্ঘিতে পার, অন্য পথ নাহি’।
দুই যুগ এক হয়ে যাচ্ছে এক অনন্ত অখন্ড বোধের প্রবাহমান ধারায়। কি অপূর্ব, কি অপূর্ব!

উপনিষদে ঋষি প্রার্থনা করছেন,
ওঁ মধু বাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ।
মাধ্বীর্ন সন্তোষধীঃ।।
মধু নক্তমুতোপষো মধুমত্পার্থিবং রজঃ।
মধু ধৌরস্তু নঃ পিতা।।
মধুমান্নো বনস্পতির্মধুমাং অস্তু সূর্যঃ।
মাধ্বীর্গাবো ভবন্তু নঃ।। (বৃহদারণ্যক ৬॥৩॥৬॥)
(বায়ু মধু বহন করিতেছে। সমুদ্রসকল মধুক্ষরণ করিতেছে। রাত্রি মধু হউক, ঊষা মধু হউক, পৃথিবীর ধূলি মধুমৎ হউক। যে আকাশ পিতার ন্যায় সমস্ত জগৎকে ধারণ করিয়া আছে তাহা মধু হউক। ঔষধি বনস্পতি সকল মধুময় হউক। সূর্য মধুমান হউক। গাভীরা জগতের জন্য মাধ্বী হউক।)

আর রবীন্দ্রনাথ বলছেন,
"হে বিশ্ববিধাতঃ, আজ আমাদের সমস্ত বিষাদ-অবসাদ দূর করিয়া দাও-- মৃত্যু সহসা যে যবনিকা অপসারণ করিয়াছে তাহার মধ্য দিয়া তোমার অমৃতলোকের আভাস আমাদিগকে দেখিতে দাও। সংসারের নিয়ত উত্থানপতন, ধনমানজীবনের আবির্ভাব-তিরোভাবের মধ্যে তোমার ‘আনন্দরূপমমৃতং’ প্রকাশ করো। কত বৃহৎ সাম্রাজ্য ধূলিসাৎ হইতেছে, কত প্রবল প্রতাপ অস্তমিত হইতেছে, কত লোক-বিশ্রুত খ্যাতি বিস্মৃতিমগ্ন হইতেছে, কত কুবেরের ভাণ্ডার ভগ্নস্তূপের বিভীষিকা রাখিয়া অন্তর্হিত হইতেছে–কিন্তু হে আনন্দময়, এইসমস্ত পরিবর্তনপরম্পরার মধ্যে ‘মধু বাতা ঋতায়তে’, বায়ু মধুবহন করিতেছে, ‘মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ’, সমুদ্রসকল মধুক্ষরণ করিতেছে–তোমার অনন্ত মাধুর্যের কোনো ক্ষয় নাই–তোমার সেই বিশ্বব্যাপিনী মাধুরী সমস্ত শোকতাপবিক্ষোভের কুহেলিকা ভেদ করিয়া অদ্য আমাদের চিত্তকে অধিকার করুক।" 

১৯০৫এ পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়ানের পর রবীন্দ্রনাথ ১৭ই পৌষ ১৩১৬ (ইং ১৯১০) তাঁকে উদ্দেশ্য করে একটি গান লিখেছিলেন যেটি পরে গীতাঞ্জলিতে ৫১ নম্বর কবিতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। গানটি হলো:
কোন্‌ আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস।
সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো, পাগল ওগো, ধরায় আস।
এই অকুল সংসারে,
দুঃখ-আঘাত তোমার প্রাণে বীণা ঝংকারে।
ঘোরবিপদ-মাঝে 
কোন্‌ জননীর মুখের হাসি দেখিয়া হাস।
তুমি কাহার সন্ধানে
সকল সুখে আগুন জ্বেলে বেড়াও কে জানে।
এমন ব্যাকুল করে 
কে তোমারে কাঁদায় যারে ভালোবাস।
তোমার ভাবনা কিছু নাই -
কে যে তোমার সাথের সাথি ভাবি মনে তাই।
তুমি মরণ ভুলে 
কোন্‌ অনন্ত প্রাণসাগরে আনন্দে ভাস।

আমি বহুক্ষণ গানটি গেয়ে বা না গেয়ে গুনগুন করছি কিন্তু একে এতদিন যেভাবে বুঝতাম, আজ যতবার পড়ছি, সেই বোঝার সমস্তটাই কেমন যেন পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে। আজ আর খেই পাচ্ছি না, যত এক একটি শব্দবন্ধ ধরে ধরে মনে মনে ব্যাখ্যা করছি তত স্তর থেকে স্তরান্তরে চালে যাচ্ছে ভাবনা, অর্থের নতুন নতুন দিগন্ত খুলে যাচ্ছে। এক একটা যতিচিহ্নর ব্যবহার সম্পুর্ন স্তবকের ব্যঞ্জনা পাল্টে দিচ্ছে, এ যেন বোধের এক অদ্ভুত অনিঃশেষ ধাঁধা। এটুকুই কেবল নিশ্চিতরূপে বুঝছি যে এতদিন কিছুই বুঝিনি আর চোখ দুটো আপনা থেকেই বারেবারে জলে ভরে উঠছে।
আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না।
এই জানারই সঙ্গে সঙ্গে তোমায় চেনা ॥
কত জনম-মরণেতে     তোমারি ওই চরণেতে
আপনাকে যে দেব,      তবু বাড়বে দেনা ॥

Thursday, May 5, 2022

কর্মফল

তিনি নিজের ইচ্ছাতেই নির্গুণ থেকে সগুণ হন, তাঁর ইচ্ছাতেই জগৎ সৃষ্টি হয়, তাঁর ইচ্ছাতেই জীবের জন্ম এবং মৃত্যুর কালচক্র চলতে থাকে এবং তাঁর ইচ্ছা ছাড়া গাছের একটি পাতারও নড়বার যো নেই, এমনটাই তো বিভিন্ন শাস্ত্রে শোনা যায়। তাহলে আমাদের পাপ এবং পুণ্যের জিম্মেদারও নিশ্চয় তিনি। খামোখা আমরা কর্মফল ভোগ করি কোন দুঃখে! অন্ততঃ যুক্তির দিক দিয়ে তাই তো হওয়া উচিৎ। ইচ্ছাধারীর ইচ্ছামাত্র যখন জীব সৃষ্টি হচ্ছে, তখন ইচ্ছাপ্রসূতদের কর্মকাণ্ডের দায় তো তাঁরই ওপর বর্তায়, এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?

দুটি মানব মানবী পরস্পর পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হলেন, তাঁদের প্রেম গভীর হলো, তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন, তাঁদের প্রেম সর্বাত্মক হওয়ার কারণে পরস্পরের মন এবং দেহ দুটিই সংযুক্ত হলো এবং ফলত জৈবিক কারণেই একদিন সন্তান উৎপন্ন হলো। সেই সন্তান এই দম্পতির প্রেমের মূর্ত প্রকাশ হলেও পক্ষান্তরে তাঁদের ইচ্ছার ফসলও তো বটে। এইবার সেই সন্তানকে তাঁরা সযত্নে লালন পালন করলেন, নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিলেন, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিলেন, ভালো মানুষ হতে শেখালেন। ক্রমে সন্তান বড় হলেন, কর্মক্ষম হলেন, তাঁর নিজস্ব পরিবার গড়ে উঠলো, পিতা-মাতা বৃদ্ধ হলেন, অশক্ত হলেন, সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হলেন। এইবার সন্তান কর্মক্ষেত্রে এমন একটি পরিস্থিতির শিকার হলেন যেখানে তাঁকে বেশ কিছু অধস্তন কর্মচারীকে বিনা দোষে ছাঁটাই করতে হলো। তিনি জানেন যে তাঁর নির্ণয়ের কারণে এতগুলো পরিবার পথে বসবে, সেই পরিবারগুলির নিষ্পাপ শিশুদের দুর্দশা হবে। কিন্তু তাও তিনি নিরুপায় কারণ নিজের পরিবারের আর্থিক সুরক্ষার জন্য নিজের চাকরিটি বাঁচানো তাঁর কাছে ভীষণ জরুরি এবং সেই কারণেই তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অবাধ্য হতে পারলেন না। তিনি এও জানেন যে তিনি যদি বেঁকে বসেন তাতেও আখেরে কারো লাভ হবে না - তাঁর জায়গায় অন্য কাউকে দিয়ে কর্তৃপক্ষ ছাঁটাই ঠিকই করিয়ে নেবেন। এখন প্রথম প্রশ্ন হলো, সন্তান যেহেতু পিতা-মাতার ইচ্ছার ফসল, তাহলে সন্তানের কর্মফলের দায় তাঁদের নেওয়া উচিত - কিন্তু এক্ষেত্রে সেটা কি যুক্তিযুক্ত? দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, সন্তান যা করছেন বা করতে বাধ্য হচ্ছেন, তার কারণ তাঁর বৃদ্ধ, অশক্ত পিতা-মাতাকে এবং পরিবারকে সুখে স্বস্তিতে রাখা ধর্মত তাঁর দায়িত্ব এবং তিনি চাইলেই হুট করে চাকরি ছেড়ে দিয়ে সেই দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন না - সেক্ষেত্রে কর্মফল কার? আর তৃতীয় প্রশ্ন হলো, যাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে, তাঁদের দুর্ভোগ কি ঈশ্বরের ইচ্ছায় হচ্ছে নাকি তাঁদের নিজেদের প্রারব্ধের ফলে?

যুবাবস্থায় শ্রীমৎ স্বামী বিবেকানন্দজীর অন্যতম প্রিয় জার্মান দার্শনিক ইমেন্যুয়েল কান্ট তাঁর বিখ্যাত Groundwork of the Metaphysic of Morals বইতে categorical imperative থিওরি অনুযায়ী কর্মকে চারটি মুখ্য পর্য্যায় ভাগ করেছেন:
১. Act as if the maxims of your action were to become through your will a universal law of nature.
২. Act in such a way that you treat humanity, whether in your own person or in the person of any other, never merely as a means to an end, but always at the same time as an end.
৩. Thus the third practical principle follows [from the first two] as the ultimate condition of their harmony with practical reason: the idea of the will of every rational being as a universally legislating will.
৪. Act according to maxims of a universally legislating member of a merely possible Kingdom of Ends.
এই সূত্র ধরেই উনি perfect duty আর imperfect duty তত্বের অবতারণা করেছিলেন, যেখানে যে কোনো কৃতকর্মের বিশ্বজনীন মান্যতা পেতে গেলে তার ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একটা সার্বজনীন প্রয়োগযোগ্যতা থাকতে হবে। সম্ভবত ওনার এই hypothetical Kingdom of Ends হলো সেই মানসিক স্থিতি যেখান 'all people should consider themselves never solely as means but always as ends.' কান্টসাহেবের থিওরির স্বপক্ষে এবং বিপক্ষে  নানান মত থাকতে পারে এবং আছেও, কিন্তু তাঁর duty for duty's sake বক্তব্য যে পাশ্চাত্যকে এককালে কর্তব্যের দিশা দেখিয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের সংস্কৃতিতে কিন্তু কর্ম সম্পর্কে কোনো অস্পষ্টতা কোনোকালেই ছিল না, তা সে ঈশ্বরবিশ্বাসী মতবাদসমূহেই হোক বা মীমাংসাসূত্রধারী নিরীস্বরবাদীদেরই হোক।

তুমি যদি ব্যক্তিগত ফললাভের আশায় কোনো কাজ করো, অর্থাৎ যা করছো তার পেছনে যদি তোমার ব্যক্তিগত কোনো ভোগেচ্ছা কাজ করে, তাহলে বাপু তার কর্মফলও সব তোমার, অতএব জন্মজন্মান্তর ধরে সব ভোগান্তিও তোমার। অর্থাৎ বাসনা থাকলেই জন্মান্তর থাকবে। আর যদি নিষ্কাম হয়ে কোনো কাজ করো, অর্থাৎ অনাসক্ত হয়ে, ফলাকাঙ্খাহীন হয়ে, কেবল কর্তব্যবোধের খাতিরে কিছু করো, তাহলে তার দায় বাপু তোমার নয়। এই হলো সাধারণ নিয়ম। আর জ্ঞান-বিজ্ঞানপথে সকাম কর্মের উদ্দেশ্য হলো সাময়িক জাগতিক শারীরিক ও মানসিক সুখ আর নিষ্কাম কর্মের উদ্দেশ্য হলো সরাসরি ঈশ্বরের সাথে যোগস্থাপন কারণ মানুষ তখন নিজেকে সৃষ্টজীব হিসেবে বুঝতে পেরে এটাও বোঝে যে তার সব কর্ম ঈশ্বরের দ্বারাই পরিচালিত, সে নিমিত্তমাত্র, অর্থাৎ যন্ত্রীর হাতের যন্ত্র। একেই যজ্ঞার্থ কর্ম বলে অর্থাৎ যে কাজ ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে যজ্ঞরূপে কার্য্যকারী করা হয়। আর নিঃস্পৃহতারূপ অগ্নিতে কর্মফলরূপ হবি অর্পণ করে নিজে দায়মুক্ত হয়ে ঈশ্বরের সাথে সংযুক্ত হয়ে যাওয়ার নামই মুক্তি।

'অনিত্যাশুচিদুঃখানাত্মসু নিত্যশুচিসুখাত্মখ্যাতিরবিদ্যা।' 
(যোগসূত্র : ২/৫) ।।
বিবেকখ্যাতিরবিপ্লবা হানোপায়ঃ। 
(যোগসূত্র ২/২৬) ।।
‘ইত্যেষ মোক্ষস্য মার্গো হানস্যোপায় ইত্যি’। (যোগভাষ্য ২/২৬)।।
অর্থাৎ :
অনিত্যকে নিত্য, অশুচিকে শুচি, দুঃখকে সুখ এবং অনাত্মাকে আত্মাবোধ করা বা খ্যাতিই হলো অবিদ্যা (যোগসূত্র ২/৫)।।  
সত্যজ্ঞান প্রদায়িনী বিবেকপ্রসূত প্রজ্ঞাই অবিদ্যা ত্যাগের প্রধান উপায়। (যোগসূত্র ২/২৬)।।  
এই অবিদ্যা থেকে পরিত্রাণই মোক্ষ বা মুক্তির উপায়। (যোগভাষ্য ২/২৬)।।

মহাভারতে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন,
'বুদ্ধিযুক্তো জহাতীহ উভে সুকৃতদুষ্কৃতে।
তস্মাদ্ যোগায় যুজ্যস্ব যোগঃ কর্মসু কৌশলম্।।'  
(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২/৫০)
বলছেন যে নিষ্কাম কর্মযোগী ঐহিক জীবনেই পাপ ও পুণ্য উভয় হতে মুক্ত হন। সুতরাং তুমি নিষ্কাম কর্মযোগের অনুষ্ঠান করো। কর্মফল নিজের নয় বলে আবার হেলাফেলা করে কাজ করো না যেন। সমস্ত কাজ ভীষণ নিপুনতার সাথে করবে কারণ যে কোনো কাজে নৈপুণ্য অর্জনের নামই হলো যোগ। 
যোগসূত্রকার মহর্ষি পতঞ্জলি আবার যোগের লক্ষণ প্রসঙ্গে বলেছেন- 'যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ'
অর্থাৎ : চিত্তবৃত্তির নিরোধই যোগ। সেইজন্যই চিত্তশুদ্ধি, সংযম ও ধ্যানের আলোচনা ওনার শাস্ত্রে এত গুরুত্ব পেয়েছে। এসব নাহলেই যারপরনাই ক্লেশ উৎপন্ন হয়।
অবিদ্যাস্মিতারাগদ্বেষাভিনিবেশাঃক্লেশাঃ।’ 
(যোগসূত্র ২/৩)
অর্থাৎ : অবিদ্যা, অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ এবং অভিনিবেশই পঞ্চপ্রকার ক্লেশের পঞ্চনাম।

যোগশাস্ত্র চারটি অঙ্গবিশিষ্ট - হেয়, হেয়হেতু, হান ও হানোপায়। হেয় হলো সংসার, হেয়হেতু হলো সংসার হেতু। এখানে হেতু বলতে প্রকৃতি ও পুরুষের সংযোগ বোঝায়। হান হলো মোক্ষ বা কৈবল্য এবং হানোপায় হলো মোক্ষের বা কৈবল্যের উপায়। এ বিষয়ে পাতঞ্জলসূত্রে বলা হয়েছে-
১. ‘হেয়ং দুঃখমনাগতম্’- (যোগসূত্র ২/১৬)
অর্থাৎ : সংসার দুঃখময় বলে তা পরিত্যাজ্য।
২. ‘দ্রষ্টদৃশ্যয়োঃ সংযোগো হেয়হেতুঃ’- (যোগসূত্র ২/১৭)
অর্থাৎ : পুরুষ ও প্রকৃতির সংযোগ হলো হেয়-হেতু বা দুঃখের কারণ।
৩. ‘তদভাবাৎ সংযোগাভাবো হানং তদ্দৃশেঃ কৈবল্যম্’- (যোগসূত্র ২/২৫)
অর্থাৎ : পুরুষ ও প্রকৃতির সংযোগাভাব হলো হান বা কৈবল্য।
৪. ‘বিবেকখ্যাতিরবিপ্লবা হানোপায়ঃ’- (যোগসূত্র ২/২৬)
অর্থাৎ : সত্যজ্ঞান প্রদায়িনী বিবেকপ্রসূত প্রজ্ঞাই কৈবল্য লাভের প্রধান উপায়, যার কথা আগেই বলা হয়েছে।

এই কথাগুলিই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে কত সহজভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছেন,
১৪। জলে নৌকা থাকে ক্ষতি নেই, কিন্তু নৌকার ভেতর যেন জল না ঢোকে, তা হলে ডুবে যাবে। সাধক সংসারে থাকুক ক্ষতি নেই কিন্তু সাধকের মনের ভেতর যেন সংসারভাব না থাকে।
১৫। সংসার কেমন? যেমন আমড়া - শাঁসের সঙ্গে খোঁজ নেই, কেবল আঁটি আর চামড়া; খেলে হয় অম্লশূল।
১৬। যেমন কাঁঠাল ভাঙতে গেলে লোকে আগে বেশ ক'রে হাতে তেল মেখে নেয় তা হলে আর হাতে কাঁঠালের আঠা লাগে না; তেমনি এই সংসাররূপ কাঁঠালকে যদি জ্ঞানরূপ তেল হাতে মেখে সম্ভোগ করা যায়, তা হলে কামিনীকাঞ্চনরূপ আঠার দাগ আর মনে লাগতে পারবে না।
১৭। সাপকে ধরতে গেলে তখনই তাকে দংশন ক'রে দেবে, কিন্তু যে ব্যক্তি ধুলোপড়া জানে, সে সাতটা সাপকে ধরে গলায় জড়িয়ে বেশ খেলা দেখাতে পারে; তেমনি বিবেকবৈরাগ্যরূপ ধুলোপড়া শিখে কেউ যদি সংসার করে, তাকে আর সাংসারিক মায়া-মমতায় আবদ্ধ করতে পারে না।
২। গুটিপোকা যেমন আপনারই নালে ঘর ক'রে আপনি বদ্ধ হয়, তেমনি সংসারী জীব আপনার কর্মে আপনি বদ্ধ হয়। যখন প্রজাপতি হয়, তখন কিন্তু ঘর কেটে বেরোয়, তেমনি বিবেক-বৈরাগ্য হলে বদ্ধজীব মুক্ত হয়ে যায়।
(শ্রীমৎ স্বামী ব্রহ্মানন্দজী সঙ্কলিত "শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ উপদেশ" - প্রথম চারটি উপদেশ 'সংসার ও সাধন' এবং শেষেরটি 'কর্মফল' অধ্যায় থেকে উদ্ধৃত)

Wednesday, May 4, 2022

অক্ষয়তৃতীয়া ২

সবটাই হলো প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার খেলা। আমরা বাইরের প্রকৃতিকে নিজেদের বাসনা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছি, নিজেদের সাময়িক সুখের জন্য তাকে যথেচ্ছ শোষণ করেছি, দোহন করেছি, ধ্বংস করেছি, যার ফলে সসাগরা বসুন্ধরা আজ সুস্থ বসবাসের প্রায় অযোগ্য হয়ে উঠেছেন। একমুঠো মাটি তৈরি করার মুরোদ নেই অথচ রাসায়নিক সার ব্যবহার করে করে সেই মাটিকেই বন্ধ্যা বানাতে আমাদের জুড়ি নেই। সূর্যের আল্ট্রা ভায়োলেট বিকিরণ থেকে রক্ষা করার জন্য ভগবান যে ট্রাইঅক্সিজেনের আবরণ দিয়ে পৃথিবীকে ঢেকে দিয়েছিলেন, তার আমরা এমন দুর্দশা করেছি যে মানুষের বেঁচে থাকাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যে জল জীবনদায়ী অমৃত হিসেবে প্রকৃতির বদান্য, সেই জলের আমরা এমন দুরাবস্থা করেছি যে আগামী বিশ্বযুদ্ধ নাকি স্বচ্ছ পানীয় জলের দখলদারির জন্য হবে বলে শোনা যায়। কারণ একটাই - লোভ। আত্মবিস্মৃতির কারণে আমরা অনেকেই নিজেদের পরিচয় এই শরীরের ঊর্ধ্বে কিছু ভেবে উঠতে পারিনি এবং মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও মাত্র কয়েক দশকের জীবিতকালের সুখের জন্য চিরকালের অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়াতেও দ্বিধা করিনি। আমরা একশ্রেণীর মানুষ এক বিধ্বংসী আসুরিক ভোগবাদীর দল এবং আজকের পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলও বটে। 

এর একেবারে উল্টো অবস্থানে আছেন শাশ্বত ভারতের মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিরা, যাঁরা অন্তরের আসুরিক প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন যাতে বাইরের প্রকৃতি অবিকৃত সুজলা সুফলা থাকেন, সেখানে যেন সমস্ত জীব জগৎ জুড়ে এক অবিচ্ছিন্ন, অর্থপূর্ণ এবং পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্ক চিরকাল বিরাজ করে। তাঁরা বলতেন সর্বে ভবন্তু সুখিন, সর্বে সন্তু নিরাময়া, সর্বে ভদ্রানি পশ্যন্তু, মা কশ্চিদ দুঃখ মাপ্নুয়াত, ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি (বৃহদারন্যক উপনিষদ ১/৪/১৪)। তাঁদের মননে সর্বে বলতে শুধু সমস্ত মানবজাতি নয়, সর্বে বলতে এই গোটা  বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত জড় ও চেতন বস্তু, ঈশ্বরের গোটা সৃষ্টিসমূহ। তাঁরা ভোগ নয়, ত্যাগে বিশ্বাসী ছিলেন, লোভ নয়, অল্পেতে সন্তুষ্ট ছিলেন, পূর্ববর্ণিত অবৈদিক সংস্কৃতির দলের চেয়ে একেবারে বিপরীতধর্মী পথের পথিক ছিলেন তাঁরা। তাঁরা নির্লোভ ছিলেন।

আসলে নির্লোভ মানেই তো নির্দোষ। যত গভীরভাবে 'সমগ্র সৃষ্টি একই শক্তির প্রকাশ'রূপী অবধারণা অন্তঃস্থ করা যাবে, তত মনের মধ্যে বিশ্বজনীন একাত্মতার বোধ দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হবে আর নিজেকে শুধু শরীর বা মন নয়, সেই অখন্ড অনন্ত দৈবীশক্তির বিশালতা ও ব্যাপকতার সাথে সম্পৃক্ত ভাবাও সম্ভব হবে। তখন কে কাকে দোহন করবে? শ্রীশ্রীমা একজনকে বলেছিলেন, "যদি শান্তি চাও মা, কারাে দোষ দেখােনা, দোষ দেখবে নিজের। জগৎকে আপনার করে নিতে শেখ। কেউ পর নয় মা, জগৎ তােমার"। সত্যি সত্যিই কেউ যে আর পর নন, কিছুই তো পর নয়, সব আপন, সবাই যে আপনার। একমাত্র মনের আসুরিক প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেই যে এই মানবিক একাত্মতাবোধ জাগতে পারে, এই আসল কথাটা আমাদের পূর্বপুরুষ বুঝতে পেরেছিলেন। যদি বিজাতীয় ভোগবাদী নির্মমতা আর নির্দয়তার দোষ আমাদের অনেকের বোধ-বুদ্ধি দূষিত না করে দিত, হয়তো আজও আমরা সবাই নির্দোষই থাকতাম।

অবশ্য এক অর্থে আমরা কেউই আসলে নির্দোষ নই। নির্দোষ হলে কর্মফলের বোঝা মাথায় করে প্রারব্ধ ভোগার জন্য বারেবারে শরীরধারণ করতে হতো না, তারতম্যটি কেবল মাত্রার এবং মানের। এবং এই তারতম্যের জন্যই কিন্তু আমরা কেউ মানুষেতর, কেউ মানুষ, কেউ বা দেবতা। প্রারব্ধ যাই থাকুক না কেন, নিজেদের যাপনের মাধ্যমে আমরা দোষের ঢিপি আরো উঁচু করবো না সমস্ত দোষ যাতে স্খলন হয়, অন্তত ঈশ্বরের কাছে এমন প্রার্থনাটুকু করার মতন নিজেকে যেন উপযুক্ত বিবেচনা করতে পারি, সেটা একমাত্র আমাদেরই বিবেচ্য। অর্থাৎ আমরা বাইরের প্রকৃতি নিয়ে মাথা ঘামাবো না অন্তরের প্রকৃতি নিয়ে মাথা ঘামাবো, তার ওপর নির্ভর করে আমরা কোন দলের - বেশিদের দলে না কমদের দলে।

আমাদের আর পশুদের মধ্যে যদি একটি মূল পার্থক্য থেকে থাকে, সেটি হলো চেতনা। আমরা সত্য আর মিথ্যা, সৎ আর অসৎ, ন্যায় আর অন্যায়, ধর্ম আর অধর্ম বিচার করতে পারি, তারা পারেনা। আরো একটা বড় পার্থক্য আছে। আমরা স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে বিবেকের মাথা খেয়ে অসৎকেও অনায়াসে আপন করে নিতে পারি, সে বেচারারা পারেনা। পশুদের মধ্যে প্রাণরক্ষার তাগিদে আক্রমণ প্রতি-আক্রমণ অবশ্যই আছে কিন্তু কোনো ছল কপট নেই। ফলে, আমাদের মনে আমরা বিষ ধারণ করবো না অমৃত নাকি কিছু কিছু মাত্রায় দুটোই, সেই মন্থনের প্রক্রিয়া কিন্তু আমাদেরই হাতে। ঠাকুর ছিপ ফেলে মাছধরা খুব অপছন্দ করতেন কারণ তাতে খাবারের লোভ দেখিয়ে একটি প্রাণীকে প্রতারণা করে তার প্রাণহরণ করা হয়। এই পছন্দ অপছন্দগুলোই আমাদের নিয়ন্ত্রিত মনের ফসল, যা আমাদের মানুষ করে তোলে, ক্রমাগত আমাদের ধর্মাশ্রয়ী জীবন যাপনের দিকে এগিয়ে দেয়।

ভাগবতে রাজা পরীক্ষিৎ শুকদেবকে জিজ্ঞেস করছেন, 'হে মহাভাগ, মানুষ পাপকাজ থেকে কিভাবে বিরত থাকতে পারে আর নিজের পাপকর্মজনিত বিভিন্ন ভয়ানক যন্ত্রণাদায়ক নরকভোগ থেকে কিভাবে নিষ্কৃতি পেতে পারে?' (এই যে উন্নয়নের নামে যথেচ্ছাচারের ফলে উষ্ণায়নের ফলস্বরূপ আর্কটিক আইস গলে গলে সমুদ্রের জলস্তর বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থায় পৌঁছিয়েছে যে বহু দ্বীপপুঞ্জভিত্তিক দেশের চিরতরে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে এবং সেইসব দেশের নাগরিকরা অনিশ্চয়তা আর প্রবল আতঙ্কে রোজ দিনযাপন করছেন, এটাই তো নরক - জীবন্ত নরক।) তখন শুকদেব উত্তর দিচ্ছেন, 'অগ্নি যেমন বৃহৎ বেণুগুল্মকে দগ্ধ করে, তেমনি শ্রদ্ধাযুক্ত  ব্যক্তিগণও তপস্যা, ব্রহ্মচর্য, শম, দম, ত্যাগ, সত্য, শৌচ, যম, নিয়ম ইত্যাদি সহায় করিয়া বুদ্ধি ও বাক্যকৃত সমূহ পাপ বিনষ্ট করিতে সমর্থ হয়'। শম মানে শান্তি, দম মানে সংযম, যম মানে অহিংসা আর নিয়ম মানে নিয়ন্ত্রণ। অন্তে সেই নিয়ন্ত্রণেই ফেরা। ওটাই যে মূল।

আত্মনিয়ন্ত্রণ

সবটাই হলো প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার খেলা। আমরা বাইরের প্রকৃতিকে নিজেদের বাসনা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছি, নিজেদের সাময়িক সুখের জন্য তাকে যথেচ্ছ শোষণ করেছি, দোহন করেছি, ধ্বংস করেছি, যার ফলে সসাগরা বসুন্ধরা আজ সুস্থভাবে বসবাসের জন্য প্রায় অযোগ্য হয়ে উঠেছেন। একমুঠো মাটি তৈরি করার মুরোদ নেই অথচ রাসায়নিক সার ব্যবহার করে করে সেই মাটিকেই বন্ধ্যা বানাতে আমাদের জুড়ি নেই। সূর্যের আল্ট্রা ভায়োলেট বিকিরণ থেকে রক্ষা করার জন্য ভগবান যে ট্রাইঅক্সিজেনের আবরণ দিয়ে পৃথিবীকে ঢেকে দিয়েছিলেন, তার আমরা এমন দুর্দশা করেছি যে মানুষের বেঁচে থাকাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যে জল জীবনদায়ী অমৃত হিসেবে প্রকৃতির বদান্য, সেই জলেরও এখন এমন দুরাবস্থা যে আগামী বিশ্বযুদ্ধ নাকি স্বচ্ছ পানীয় জলের দখলদারির জন্য হবে বলে শোনা যায়। কারণ একটাই - লোভ। আত্মবিস্মৃতির কারণে আমরা অনেকেই নিজেদের পরিচয় এই শরীরের ঊর্ধ্বে কিছু ভেবে উঠতে পারিনি এবং মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও মাত্র কয়েক দশকের জীবিতকালের সুখের জন্য চিরকালের অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়াতেও দ্বিধাবোধ করিনি। আমরা একশ্রেণীর মানুষ এক বিধ্বংসী আসুরিক ভোগবাদীর দল এবং আজকের পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলও বটে। 

এর একেবারে উল্টো অবস্থানে আছেন শাশ্বত ভারতের মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিরা, যাঁরা অন্তরের আসুরিক প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন যাতে বাইরের প্রকৃতি অবিকৃত সুজলা সুফলা থাকেন, সেখানে যেন সমস্ত জীব জগৎ জুড়ে এক অবিচ্ছিন্ন, অর্থপূর্ণ এবং পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্ক চিরকাল বিরাজ করে। তাঁরা বলতেন সর্বে ভবন্তু সুখিন, সর্বে সন্তু নিরাময়া, সর্বে ভদ্রানি পশ্যন্তু, মা কশ্চিদ দুঃখ মাপ্নুয়াত, ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি (বৃহদারন্যক উপনিষদ ১/৪/১৪)। তাঁদের মননে সর্বে বলতে শুধু সমস্ত মানবজাতি নয়, সর্বে বলতে এই গোটা  বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত জড় ও চেতন বস্তু, ঈশ্বরের গোটা সৃষ্টিসমূহ। তাঁরা ভোগ নয়, ত্যাগে বিশ্বাসী ছিলেন, লোভ নয়, অল্পেতে সন্তুষ্ট ছিলেন, পূর্ববর্ণিত অবৈদিক সংস্কৃতির দলের চেয়ে একেবারে বিপরীতধর্মী পথের পথিক ছিলেন তাঁরা। তাঁরা নির্লোভ ছিলেন।

আসলে নির্লোভ মানেই তো নির্দোষ। যত গভীরভাবে 'সমগ্র সৃষ্টি একই শক্তির প্রকাশ'রূপী অবধারণা অন্তঃস্থ করা যাবে, তত মনের মধ্যে বিশ্বজনীন একাত্মতার বোধ দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হবে আর নিজেকে শুধু শরীর বা মন নয়, সেই অখন্ড অনন্ত দৈবীশক্তির বিশালতা ও ব্যাপকতার সাথে সম্পৃক্ত ভাবাও সম্ভব হবে। তখন কে কাকে দোহন করবে? শ্রীশ্রীমা একজনকে বলেছিলেন, "যদি শান্তি চাও মা, কারাে দোষ দেখােনা, দোষ দেখবে নিজের। জগৎকে আপনার করে নিতে শেখ। কেউ পর নয় মা, জগৎ তােমার"। সত্যি সত্যিই কেউ যে আর পর নন, কিছুই তো পর নয়, সব আপন, সবাই যে আপনার। একমাত্র মনের আসুরিক প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেই যে এই মানবিক একাত্মতাবোধ জাগতে পারে, এই আসল কথাটা আমাদের পূর্বপুরুষ বুঝতে পেরেছিলেন। যদি বিজাতীয় ভোগবাদী নির্মমতা আর নির্দয়তার দোষ আমাদের অনেকের বোধ-বুদ্ধি দূষিত না করে দিত, হয়তো আজও আমরা সবাই নির্দোষই থাকতাম।

অবশ্য এক অর্থে আমরা কেউই আসলে নির্দোষ নই। নির্দোষ হলে কর্মফলের বোঝা মাথায় করে প্রারব্ধ ভোগার জন্য বারেবারে শরীরধারণ করতে হতো না, তারতম্যটি কেবল মাত্রার এবং মানের। এবং এই তারতম্যের জন্যই কিন্তু আমরা কেউ মানুষেতর, কেউ মানুষ, কেউ বা দেবতা। প্রারব্ধ যাই থাকুক না কেন, নিজেদের যাপনের মাধ্যমে আমরা দোষের ঢিপি আরো উঁচু করবো না সমস্ত দোষ যাতে স্খলন হয়, অন্তত ঈশ্বরের কাছে এমন প্রার্থনাটুকু করার মতন নিজেকে যেন উপযুক্ত বিবেচনা করতে পারি, সেটা একমাত্র আমাদেরই মাথায়। অর্থাৎ আমরা বাইরের প্রকৃতি নিয়ে মাথা ঘামাবো না অন্তরের প্রকৃতি নিয়ে মাথা ঘামাবো, তার ওপর নির্ভর করে আমরা কোন দলের - বেশিদের দলে না কমদের দলে।

আমাদের আর পশুদের মধ্যে যদি একটি মূল পার্থক্য থেকে থাকে, সেটি হলো চেতনা। আমরা সত্য আর মিথ্যা, সৎ আর অসৎ, ন্যায় আর অন্যায়, ধর্ম আর অধর্ম বিচার করতে পারি, তারা পারেনা। আরো একটা বড় পার্থক্য আছে। আমরা স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে বিবেকের মাথা খেয়ে অসৎকেও অনায়াসে আপন করে নিতে পারি, সে বেচারারা পারেনা। পশুদের মধ্যে প্রাণরক্ষার তাগিদে আক্রমণ প্রতি-আক্রমণ অবশ্যই আছে কিন্তু কোনো ছল কপট নেই। ফলে, আমাদের মনে আমরা বিষ ধারণ করবো না অমৃত নাকি কিছু কিছু মাত্রায় দুটোই, সেই মন্থনের প্রক্রিয়া কিন্তু আমাদেরই হাতে। ঠাকুর ছিপ ফেলে মাছধরা খুব অপছন্দ করতেন কারণ তাতে খাবারের লোভ দেখিয়ে একটি প্রাণীকে প্রতারণা করে তার প্রাণহরণ করা হয়। এই পছন্দ অপছন্দগুলোই আমাদের নিয়ন্ত্রিত মনের ফসল, যা আমাদের মানুষ করে তোলে, ক্রমাগত আমাদের ধর্মাশ্রয়ী জীবন যাপনের দিকে এগিয়ে দেয়।

ভাগবতে রাজা পরীক্ষিৎ শুকদেবকে জিজ্ঞেস করছেন, 'হে মহাভাগ, মানুষ পাপকাজ থেকে কিভাবে বিরত থাকতে পারে আর নিজের পাপকর্মজনিত বিভিন্ন ভয়ানক যন্ত্রণাদায়ক নরকভোগ থেকে কিভাবে নিষ্কৃতি পেতে পারে?' (এই যে উন্নয়নের নামে যথেচ্ছাচারের কারণে বিশ্ব জুড়ে উষ্ণায়নের ফলস্বরূপ আর্কটিক আইস গলে গলে সমুদ্রের জলস্তর বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থায় পৌঁছিয়েছে যে বহু দ্বীপপুঞ্জভিত্তিক দেশের চিরতরে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে এবং সেইসব দেশের নাগরিকরা অনিশ্চয়তা আর প্রবল আতঙ্কে রোজ দিনযাপন করছেন, এটাই তো নরক - জীবন্ত নরক।) তখন শুকদেব উত্তর দিচ্ছেন, 'অগ্নি যেমন বৃহৎ বেণুগুল্মকে দগ্ধ করে, তেমনি শ্রদ্ধাযুক্ত  ব্যক্তিগণও তপস্যা, ব্রহ্মচর্য, শম, দম, ত্যাগ, সত্য, শৌচ, যম, নিয়ম ইত্যাদি সহায় করিয়া বুদ্ধি ও বাক্যকৃত সমূহ পাপ বিনষ্ট করিতে সমর্থ হয়'। শম মানে শান্তি, দম মানে সংযম, যম মানে অহিংসা আর নিয়ম মানে নিয়ন্ত্রণ। অন্তে সেই আত্মনিয়ন্ত্রণেই ফেরা। ওটাই যে মূল।

Tuesday, May 3, 2022

অক্ষয়তৃতীয়া

সংশ্লিষ্ট সকল সনাতনীকে জানাই অক্ষয় তৃতীয়ার আন্তরিক শুভেচ্ছা। এই তিথিতে যা কিছু শুভকর্ম করা হয়, তার ফল হয় অক্ষয় পূণ্যদায়িনী। এই তিথিতে যা জ্ঞান আহরণ করা হয়, তাও অক্ষয় প্রভাব ফেলে বুদ্ধিতে, চিত্তে। আজকের এই বিশেষ দিনে দানের ফলও অক্ষয় হয়। এই তিথিতে পুণ্যতোয়া, পুণ্যসলিলা ভগবতীদেবী গঙ্গা মর্ত্যে অবতরণ করেন। তারপর থেকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে অক্ষয় জলসম্ভার সমেত মর্ত্যবাসীর জীবনদায়িনী তথা পাপনাশিনী নদীরূপে তিনি প্রবাহমানা। তাই আজ অনুশোচনা, প্রায়শ্চিত্ত ও প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে পাপস্খলনের দিনও বটে।

বহুযুগ আগে এই শুভদিনের একটি বিশেষ ঘটনার বিবরণ ভাগবৎ পুরাণে লেখা আছে। 

দ্বাপর যুগে শ্রীকৃষ্ণ তখন দ্বারকার অধিনায়ক। বাল্যসখা সুদামা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বৃন্দাবন থেকে সুদূর দ্বারকায় এলেন কিছু অর্থসাহায্য চাইতে। দরিদ্র সুদামা কৃষ্ণের জন্য কাপড়ের পুটুলিতে বেঁধে এনেছিলেন তিনমুঠো চালভাজা। প্রাসাদের দ্বারীরা তো তাঁকে দূরছাই করে তাড়িয়েই দিচ্ছিল কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ জানতে পেরে বন্ধুর জন্য যে রাজাতিথেয়তার আয়োজন করলেন, তাতে মুগ্ধ হয়ে সুদামা আর নিজের দৈন্যাবস্থার কথা মুখ ফুটে বলতেই পারলেন না। এমনকি কৃষ্ণের প্রাসাদে সম্পদের বৈভব দেখে, তাঁর জন্য আনা কাপড়ে বাঁধা সামান্য চালভাজাটুকুও লজ্জায় আর দিতে পারেননি সুদামা। কিন্তু ভক্তবৎসল ভগবান বাসুদের যে ভাবগ্রাহী। তিনি ভাবটুকু গ্রহণ করেন, কেবল ভেট নয়। তাই নিজেই সেই চালভাজা চেয়ে খেয়ে পরম তৃপ্তি প্রকাশ করলেন। আর সুদামা নিজের মুখে কিছু না চাইলেও, বাড়িতে ফিরে দেখেন যে তার ক্ষুদ্র কুঠিরের পরিবর্তে বৃহৎ এক অট্টালিকা দাঁড়িয়ে আছে! ভগবান অযাচিত করুণাভরে সবকিছু সাজিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন তাঁর একান্ত প্রিয় সখা তথা ভক্তপ্রবর সুদামাকে। এই লীলার দ্বারা এটাই প্রমাণ হয় যে, ভক্তের চাওয়ার অপেক্ষা করেন না ভগবান। অহৈতুকী অযাচিত কৃপা তিনি নিজে থেকেই করেন তাঁর ভক্তের প্রতি। 

যিনি সকল গুনের আকর, তাঁর মতো সুহৃদ, তাঁর মতো ভক্তবৎসল পরমবান্ধব আর কে কোথায় আছেন? তাঁর কাছে ব্যাকুল হয়ে প্রার্থনা করলে তিনি ভক্তের মনোবাঞ্চা সবসময়ই পূর্ণ করেন। এর প্রত্যক্ষ প্রমাণও আছে। সবাই জানেন যে কৌরব রাজসভায় রথী-মহারথীদের সামনে দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের চেষ্টা করেছিলেন দুঃশাসন কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের করুণায় সে চেষ্টা সফল হয়নি। পাঞ্চালীর কাতর প্রার্থনা শুনে তাঁর লজ্জা নিবারণ করেছিলেন বাসুদেব। সেই দিনটিও ছিল অক্ষয় তৃতীয়া। আজ ভগবৎকৃপা প্রার্থনা করার অন্যতম উৎকৃষ্ট সেই দিন, যার আধ্যাত্মিক প্রসাদলাভ জন্মজন্মান্তর ধরে অক্ষয় হয়।