Saturday, January 21, 2023

কবি সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

সৌভিককে কাল নিল না জীবনের ঝাল নিল, নাকি যেসব আলবালছালরা ওর মাতলামোকে তোল্লা দিত - তারা নিল জানিনা, কিন্তু বাংলা কবিতার ছাদে এমন একটা বিরাট ছেঁদা হয়ে গেল যে এখন ঐ ঘরে গেলেই সেই ফুটো দিয়ে অজাত কুজাতদের ডাঁই করা রাবিশ হুড়মুড়িয়ে গায়ে পড়তে পারে। বলে নাকি মরা মানুষের নিন্দে করতে নেই। করবো না তো কি করবো? ঈশ্বর ট্যালেন্ট একেবারে ভরে ভরে দিয়ে পাঠিয়েছিলেন, ছোকরা সম্পুর্ন নিজের দোষে তাকে নয়ছয় করে দিয়ে হটাৎ ফুটে গেল। কতদিন অফিস কেটে ভরদুপুরে ক্যাফেলায় এসে কোণের ওই বড় ফ্রেঞ্চ উইন্ডটার পাশে বসে বসে কবিতা লিখতো, টাটকা কবিতা পড়ে শোনাতো, শোনাতে শোনাতে হোঁচট খেলে কাটাকুটি করতো, আবার প্রথম থেকে শোনাতো, সেসব আজ হটাৎ হুশ হয়ে গেল। প্রচুর ঝগড়া হয়েছে সৌভিকের সঙ্গে আমার, প্রচুর বকেছি ওকে অপরিমিত মদ খাওয়ার জন্য, দুএকবার মনে হয়েছে গালে দুই থাপ্পড় বসিয়ে দিই। পিপির সঙ্গে বিচ্ছেদটা ওর নরম কবিমন মেনে নিতে পারেনি এটা যেমন সত্যি, ওর সঙ্গে ২৪ঘন্টা থাকাটাও যে একটা দুরূহ যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার, সেটাও তেমনিই সত্যি। ছেলেটা জীবনে সুখ পেল না, এই খেদ অবশ্যই রয়ে যাবে। আর সেই পরিস্থিতিটা শুধরানোর যে আর কোনো সুযোগ নেই, সেই খেদটা আমাদের মতন ওর বড় দাদাদের পক্ষে আরো অনেক বেশি বেদনাদায়ক হয়ে রয়ে গেল। ওর মা আগেই চলে গেছেন, বেঁচে গেছেন, কিন্তু বৃদ্ধ অসুস্থ বাবা যে রয়ে গেলেন, কি যে দুঃখের সে আর বলার নয়। নিচে সৌভিকের লেখা একটা কবিতা দিলাম, যারা ওকে চিনতেন না, তাদের জন্য।

এখন, দিনরাত

বিবর্ণ বিকেলের কালচে রাজপথ
যেন অলস, পুরনো অজগর
সময়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে
আমরাও পুরনো হয়ে চলি

সরু গলি, কবেকার মরচে অ্যান্টেনা
সেইসব বাড়ীতে আর কেউ থাকেনা এখন
সাদাকালো ফটো-অ্যালবামে
শুধু পড়ে আছে কিছু
যুবতী বনভোজন, আর হুটোপাটি হাসিগান ছবি

কলকাতায় বসন্ত নেই বহুকাল
একটা গভীর, নীলচে শীতকাল
নিঝঝুম বসে আছে জানলায়

কোন আতসবাজী নেই একশো বছর
ইতিহাসনির্ভর আলতো টিকে থাকা -

বন্ধুদের কথা ভাবতে ভাবতে
একটা ধূসর, ঠান্ডা জামা পরে
আমি নিয়মমাফিক ভেসে যাচ্ছি দিনরাত.....

Friday, January 20, 2023

মোদি

যে যা ইচ্ছে ফালতু বকার বকতে থাকুক, ওঁর যা করার উনি মুখ বুজে ঠিকই করে যাবেন কারণ ওনার এই শরীরধারণের উদ্দেশ্য কি, কেন এ দেশে, এই সময়ে ওঁর জন্ম হয়েছে, উনি তা সম্যকরূপে জানেন। এই জানাটা একমাত্র গভীর সাধনা এবং মহাকালকৃপা ও গুরুকৃপা থেকে আসে, যা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্যও নয়। যেদিন উনি থাকবেন না সেদিন আসমুদ্রহিমাচল জুড়ে লোকে ওনার মূর্তি বসিয়ে মালা দেবে, এখন যারা পেছনে লাগছে তাদের কথা তখন কেউ মনেও রাখবে না। এটাই ধ্রুব সত্য। উনি যে ভূমিকা পালন করছেন এবং যে বিরুদ্ধ পরিবেশের মধ্যে থেকে যে ধরণের লোকদের নিয়ে ওঁকে কাজ করতে হচ্ছে, তাতে খানিকটা চাতুরী, খানিকটা নার্সিসিসম দেখানো হয়তো জরুরি, নইলে ওঁর উদ্দেশ্যসাধন হবে না। ওঁর ওই বাইরের রূপটা দেখে এখন অবুঝ বোদ্ধারা যত পারে নেগেটিভ ন্যারেটিভ বানিয়ে যাক, শেষমেশ ওনার কাজই ওনার হয়ে কথা বলবে। ওঁর ভূমিকা ভারতের অন্তরাত্মার পুনরুত্থানের জন্য দৈবনির্ধারিত, যার ইঙ্গিত রামকৃষ্ণ মিশনের পঞ্চদশ সংঘাধ্যক্ষ পরম পূজ্যপাদ স্বামী আত্মাস্থানন্দজী মহারাজ বহুদশক আগেই ওঁকে দিয়েছিলেন। ওঁর মূল্যায়ন করার সঠিক সময় এখনো আসেনি। ওটা সেইদিনই হবে যেদিন ওঁর গড়া সুদৃশ্য জয়স্তম্ভটি সবাইকে ছাড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ওঁর অতুল কীর্তির সাক্ষ্য দেবে আর বিশ্বশুদ্ধু লোকে বিস্ফারিত নেত্রে সেদিকে তাকিয়ে মনে মনে বিস্মিত হয়ে ভাববে, এমনও হয়?

Wednesday, January 18, 2023

কেমন মুক্তি চাই?

বেদান্তে তিন রকমের মুক্তির কথা বলা হয়েছে - আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক আর আধিভৌতিক অর্থাৎ নিজের মনের প্রভাব থেকে মুক্তি, সমাজের প্রভাব থেকে মুক্তি আর প্রকৃতির প্রভাব থেকে মুক্তি। আমি ঠিক জানিনা একেবারে জীবনচক্র থেকেই মুক্তির ইচ্ছেটা ঠিক কোন সময় আমাদের bucketlist এ ঢুকে পড়েছে, কিন্তু আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে বলে যে আসল মুক্তি তখনই হয় যখন ব্যক্তিস্বত্তা সম্পূর্ণরূপে আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠে - বাইরের সম্পদের বদলে ধীরে ধীরে অন্তরের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হওয়াই তো শ্রেয় কারণ বাইরেরটা temporary, শরীরভিত্তিক, আর অন্তরেরটা permanent। 

পাপ-পুণ্যের ফর্মুলা তো সেই কোন আদ্যিকালে ব্যাসদেব নিজেই বলে দিয়ে গিয়েছেন - 'পূণ্যায় পরোপকরায়, পাপায় পরপীড়নম্', অর্থাৎ পরোপকার করলে পূণ্য হয় আর পরকে উৎপীড়ন করা হলো পাপ। যেহেতু পাপ আর পুণ্যের সাথে প্রারব্ধ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে, ফলে মুক্তির perspective থেকেও এদুটিকে ignore করার উপায় নেই। এখন, কারো পুণ্যলাভের মাধ্যমে যদি জগতের কল্যাণ হয় তাহলে তো পুণ্যাত্মারা বারেবারে শরীর ধারণ করতেই চাইবেন, মাঝপথে সব মজা ছেড়ে-ছুঁড়ে খামোখা পালাতে চাইবেন কেন? 

এ ব্যাপারে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব আর শ্রীশ্রীমায়ের একদিনের কথোপকথন মা নিজমুখে একবার বলেছিলেন। "ঠাকুর আমাকে বলেছিলেন, "দেখো, এরপর ঘরে ঘরে এর (ঠাকুরের) পুজো হবে। পরে দেখবে - একেই সবাই মানবে, তুমি কোনো চিন্তা করো না। মাইরি বলছি - বাপান্ত দিব্যি।" তাঁর অনেক শ্বেতকায় ভক্ত আসবে, যেমন এখন সব খ্রিস্টানরা আসছে না। ঠাকুর বলেছিলেন যে একশো বছর পরে আবার আসবেন। এই একশো বছর সূক্ষ্মশরীরে ভক্ত-হৃদয়ে থাকবেন। গোলবারান্দা হতে বালি উত্তরপাড়ার দিকে দেখিয়ে বলেছিলেন। আমি বললুম, "আমি আর আসতে পারব না।" লক্ষী বলেছিল, "আমাকে তামাক-কাটা করলেও আর আসব না।" ঠাকুর হেসে বললেন, "যাবে কোথা? কলমির দল একজায়গায় বসে টানলেই সব এসে পড়বে।" এর ওপরে তো আর কথা হয় না, তাই না?

এখন, পাপ-পূণ্যর থিওরি থেকে মাটিতে নেমে এসে দৈনন্দিন জীবনে ভালো আর মন্দের বিষয়টি একটু তলিয়ে দেখা যাক। এক্ষেত্রেও underlying theme ওটাই - যাতে কারো মঙ্গল হয় তা ভালো আর যাতে কারো ক্ষতি হয় তা খারাপ। আজকেই দেখলাম একটা লোক মদ খেয়ে বেহুঁশ হয়ে ফুটপাথে পড়ে আছে। ভর সন্ধ্যেবেলায় নেশা করে out - কি খারাপ কাজ, তাই না? যদি ধরে নিই যে ঐ মানুষটির কোনো পিছটান নেই তাহলে সে তো আর অন্য কারো ক্ষতি করেনি, নিজে বুঁদ হয়ে রাস্তার ধারে পড়ে আছে। হ্যাঁ, সে যদি নেশার চোটে মারামারি করতো, বা কাউকে কটু কথা বলতো বা মদের পয়সা জোটাবার জন্য চুরিচামারি করতো, তাহলে অবশ্যই সে অন্যের ক্ষতি করতো এবং সেক্ষেত্রে কাজটা একেবারেই ভালো হতো না। 

তার মানে কি নেশা করা উচিত? মোটেই না, কারণ তা শরীর ও মনের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। কিন্তু আমরা পারম্পরিকভাবে যেগুলোকে ভালো বা খারাপ কাজ বলে জানি সেগুলো যে আদপেই পাপ বা পুণ্যের সাথে aligned নয়, হবে যে তারও কোনো স্থিরতা নেই, সেটাই বোঝাবার চেষ্টা করছি মাত্র। অমুক মটরসাইকেল ছেড়ে নতুন গাড়ি কিনেছে শুনলে প্ৰথমেই যে জিনিসটা মাথায় আসে তা হলো, 'ভালো করেছে'। এটা কি মাথায় আসে যে সেই গাড়িটি অসৎ পথে রোজগার করা টাকা থেকেও কেনা হয়ে থাকতে পারে এবং সেক্ষেত্রে সেটা মোটেই ভালো কাজ হয়নি, বরং গর্হিত অপরাধ? বোধহয় না, কারণ আমাদের ভালো-মন্দ বিচারের মানক সবসময় morality নির্ভর নয়, ধর্মবোধ আধারিত নয়, পাপ-পুণ্যের বোধ থেকে অনেকসময়ই আলাদা।

এবার মূল বক্তব্যে আসি। রামকৃষ্ণ মিশনের লোগো আঁকার সময় স্বামীজী তার তলায় লিখেছিলেন, 'আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ' - নিজের মোক্ষ এবং জগতের কল্যাণের জন্য। তার মানে জগতের কল্যাণের মাধ্যমেই নিজের মুক্তি বা মোক্ষলাভ সম্ভব - সেই বেদব্যসের পুণ্যের পুরানো ফর্মুলা যাকে ঠাকুর অনেকধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে 'শিবজ্ঞানে জীবসেবা'র সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন। আমি গুহার মুখে পাথর এঁটে ভেতরে পড়ে আছি আর বাইরে অসহায় অসুস্থ মানুষ সেবা ও সাহায্যের অভাবে কাতরাচ্ছে - কোন যুক্তিতে এইরকম একজন স্বার্থপরের মুক্তিলাভ হবে? তারা কি আমার থেকে আলাদা, তাদের মধ্যে কি সেই একই অনন্ত চেতনা কাজ করছে না, তাহলে? এই যে মানুষের শরীর পাওয়া, এর দ্বারা যদি মানুষের উপকারই না হলো, তাহলে এ শরীরের স্বার্থকতাই বা কি আর এই মানবজীবনের উদ্দেশ্যসাধনেরই বা কি?

গাজীপুর থেকে স্বামীজীর প্রমদাবাবুকে ৩রা মার্চ, ১৮৯০ সালে লেখা চিঠিতে দেখছি তিনি শুরুতেই লিখছেন, 'আপনি জানেন না—কঠোর বৈদান্তিক মত সত্ত্বেও আমি অত্যন্ত নরম প্রকৃতির লোক। উহাই আমার সর্বনাশ করিতেছে। একটুকুতেই এলাইয়া যাই, কত চেষ্টা করি যে, খালি আপনার ভাবনা ভাবি। কিন্তু বারংবার পরের ভাবনা ভাবিয়া ফেলি। এবার বড় কঠোর হইয়া নিজের চেষ্টার জন্য বাহির হইয়াছিলাম—এলাহাবাদে এক ভ্রাতার পীড়ার সংবাদ পাইয়া অমনি ছুটিতে হইল।' এই তো এক আদর্শ মহাজীবন, যিনি মায়া মায়া নেতি নেতি করে কাঁদুনি না গেয়ে মানুষের সেবায় নিজের প্রাণপাত করে আধুনিক যুগের আদর্শ ব্রহ্মজ্ঞ মহাতাপস হয়েছেন এবং জীবের কল্যাণের জন্য হাজার বার জন্ম নিতেও পিছপা নন, বরং আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। 

মোক্ষ তো আর গাছ থেকে পড়বে না, ওই বোধ ধীরে ধীরে নিজের ভেতর থেকেই উৎসারিত হবে - it is an internal transformation emanating from within. আমার যদি অহংবোধ এবং স্বার্থবোধ প্রবল হয়, আমি যদি নিজের শরীরের বাইরে একই মহাশক্তির প্রকাশ জগৎ সংসারকে আপন না ভাবতে পারি, তাদের দুঃখে কাঁদতে না পারি, তাদের আনন্দে নাচতে না পারি, তাহলে আমার আধ্যাত্মিক journey শুরু করবো কোন বিন্দু থেকে? 

আমরা, ইংরিজি শিক্ষায় শিক্ষিত অশিক্ষিতরা, আব্রাহামিক মতবাদগুলির প্রভাবে একটা সম্পূর্ণ ভুল notion এর বশে সাধারণত ভেবে থাকি যে ঈশ্বর এখানে নেই স্বর্গে আছেন, এখনই নয়, তাঁর সাথে শেষ বিচারের দিন দেখা হবে এবং তিনি আর আমি দুটি ভিন্ন স্বত্তা। আমাদের নিজেদের বেদান্ত কিন্তু এর ঠিক উল্টো কথাটা বলে, যা যুক্তিগ্রাহ্য inference, blind faith এর কোনো ব্যাপার নেই। বলে তিনি এখানেই আছেন, এখনই আছেন এবং আমি তিনিই এবং সেটা আমাদেরই দৈনন্দিন অনুভূতির ভিত্তিতে আবার প্রমাণও করে দেয়। তাই ঠাকুরের পথ ধরে স্বামীজী বলেছেন ব্রহ্ম সত্য জগৎ সত্য - নির্গুণ স্বগুণ সবই এক - একম্ সৎ। আমিই যদি সব হয়েছি তাহলে কার থেকে পালাবো রে বাবা?

পূজ্যপাদ শ্রীমৎ স্বামী প্রেমেশানন্দজী মহারাজ একটি চিঠিতে একজায়গায় লিখছেন, 
'ঠাকুর পরাবিজ্ঞানের সব রহস্যই এবার বিশ্বসভায় উদ্ঘাটিত করিয়াছেন৷ তিনি সর্বজীবের ভিতরে, জগতের সর্বত্র এক চিদবস্তুকে দেখিতেছেন৷ চিৎ ছাড়া যে অন্য কোন বস্তু থাকিতেই পারে না৷ অন্য কোন বস্তু আছে, বোধ করাই ব্রহ্মকে সীমাবদ্ধ করা৷ ইহা চরমজ্ঞান, চরম অনুভূতি৷ ঠাকুর ছাড়া কেহ ইহা এত সুস্পষ্ট করিয়া মানবজাতিকে কখনও দেখান নাই।' সত্যিই তো, ঠাকুরের চেয়ে সহজবোধ্য করে 'জগজ্জননী জগন্মাতা মহামায়ার লীলাপোষ্টাই'কে কেই বা আর আমাদের মতন নিরেট জীবসেবার বদলে জিবসেবারত অর্বাচীনদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন?

Friday, January 13, 2023

দুঃখের অভাবই কি আনন্দ?

প্ল্যেটো বলছেন যে দুঃখের অভাবকেই আমরা সুখ বা আনন্দ বলে মনে করি। আসলে সুখ এবং দুঃখ থেকে সমদূরত্বের যে বিন্দু, যাকে neutral point বলা যেতে পারে, ভেবে দেখলে সেটা আসলে দুঃখ থেকে দুঃখাভাব পেরিয়ে এসে যে মানসিক অবস্থা - সেটা। আসল সুখ বা আনন্দ পেতে গেলে সেই জায়গা থেকে এগিয়ে যেতে হবে অনেকটাই, যা আমাদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই হয়তো সারা জীবনে অনুভব করা সম্ভবই হয়ে ওঠে না। তাজা উদাহরণ আছে। আমাদের বড় ছেলে অনেক দূরে থাকে, তাকে ইচ্ছে করলেই আমরা দেখতে পাইনা, তাই সবসময় একটা ক্ষিণ না পাওয়ার বেদনা কাজ করে মনের ভেতর। গত পরশু সে কয়েকদিনের জন্য বাড়ি এসেছে - কি আনন্দ! আসলে ঘটনাটা কি ঘটলো? দূরে ছিল - দুঃখ ছিল, কাছে এলো - সেই দুঃখবোধ চলে গেল, এরপর বেশিদিন কাছে থাকলে আবার সব ব্যাপারে সর্দারি ফলাতে শুরু করবে, তখন সহ্য করা কঠিন আর তখন মনে হবে অনেকদিন তো হলো, কবে যাবে রে বাবা - এই তো। তাহলে সত্যিকারের সুখ হলো কই? 

এবার প্রশ্ন উঠবে, সুখ তাহলে কি? তৈত্তিরীয় উপনিষদে আমরা পাই যে আমাদের উৎপত্তি আনন্দ থেকে, যাপন আনন্দে এবং নিষ্পত্তিও আনন্দেই। 
আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি, ভূতানি, জায়ন্তে,
আনন্দেন জাতানি জীবন্তি,
আনন্দং প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তি। (তৈঃ উঃ ৩/৬/১)
'সেই সর্বব্যাপী আনন্দ হইতেই এই সমস্ত প্রাণী জন্মিতেছে, সেই সর্বব্যাপী আনন্দের দ্বারাই এই সমস্ত প্রাণী জীবিত আছে, সেই সর্বব্যাপী আনন্দের মধ্যেই ইহারা গমন করে, প্রবেশ করে।' তা, এত আনন্দসাগরের মধ্যে থেকেও আমরা তাকে ছুঁতে পারিনা কেন? রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'ধর্মের সরল আদর্শ' প্রবন্ধে বিষয়টি খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে বলেছেন। 

'যাহা ধারণা করিতে পারি, তাহাতে আমাদের তৃপ্তির অবসান হইয়া যায়, যাহা ধারণা করি, তাহাতে প্রতিক্ষণে বিকার ঘটিতে থাকে। সুখের আশাতেই আমরা সমস্তকিছু ধারণা করিতে যাই, কিন্তু যাহা ধারণা করি, তাহাতে আমাদের সুখের অবসান হয়। এইজন্য উপনিষদে আছে—
যো বৈ ভূমা তৎ সুখং নাল্পে সুখমস্তি।
যাহা ভূমা তাহাই সুখ, যাহা অল্প তাহাতে সুখ নাই।
সেই ভূমাকে যদি আমরা ধারণাযোগ্য করিবার জন্য অল্প করিয়া লই, তবে তাহা দুঃখসৃষ্টি করিবে,—দুঃখ হইতে রক্ষা করিবে কী করিয়া? অতএব সংসারে থাকিয়া ভূমাকে উপলব্ধি করিতে হইবে, কিন্তু সংসারের দ্বারা সেই ভূমাকে খণ্ডিত-জড়িত করিলে চলিবে না।

'একটি উদাহরণ দিই। গৃহ আমাদের পক্ষে প্রয়োজনীয়, তাহা আমাদের বাসযোগ্য। মুক্ত আকাশ আমাদের পক্ষে সেরূপ বাসযোগ্য নহে, কিন্তু এই মুক্ত আকাশকে মুক্ত রাখাই আমাদের পক্ষে একান্ত আবশ্যক। মুক্ত আকাশের সহিত আমাদের গৃহস্থিত আকাশের অবাধ যোগ রাখিলেই তবেই আমাদের গৃহ আমাদের পক্ষে কারাগার, আমাদের পক্ষে কবরস্বরূপ হয় না। কিন্তু যদি বলি, আকাশকে গৃহেরই মতো আমার আপনার করিয়া লইব—যদি আকাশের মধ্যে কেবলই প্রাচীর তুলিতে থাকি, তবে তাহাতে আমাদের গৃহেরই বিস্তার ঘটিতে থাকে, মুক্ত আকাশ দূর হইতে সুদূরে চলিয়া যায়। আমরা যদি বৃহৎ ছাদ পত্তন করিয়া সমস্ত আকাশকে আমার আপনার করিয়া লইলাম বলিয়া কল্পনা করি, তবে আলোকের জন্মভূমি, ভূর্ভুবঃস্বর্লোকের অনন্ত ক্রীড়াক্ষেত্র আকাশ হইতে নিজেকে বঞ্চিত করি। 

'যাহা নিতান্ত সহজেই পাওয়া যায়, সহজে ব্যতীত আর-কোনো উপায়ে যাহা পাওয়া যায় না, নিজের প্রভূত চেষ্টার দ্বারাতেই তাহাকে একেবারে দুর্লভ করিয়া তোলা হয়। বেষ্টন করিয়া লইয়া সংসারের আর-সমস্ত পাওয়াকে আমরা পাইতে পারি,—কেবল ধর্মকে, ধর্মের অধীশ্বরকে বেষ্টন ভাঙিয়া দিয়া আমরা পাই। সংসারের লাভের পদ্ধতিদ্বারা সংসারের অতীতকে পাওয়া যায় না। বস্তুত যেখানে আমরা না পাইবার আনন্দের অধিকারী, সেখানে পাইবার ব্যর্থ চেষ্টা করিয়া আমরা হারাই মাত্র। সেইজন্য ঋষি বলিয়াছেন—
যতো বাচো নিবর্তন্তে অপ্রাপ্য মনসা সহ।
আনন্দং ব্রহ্মণো বিদ্বান্‌ ন বিভেতি কুতশ্চন॥
মনের সহিত বাক্য যাঁহাকে না পাইয়া নিবৃত্ত হয়, সেই ব্রহ্মের আনন্দ যিনি জানিয়াছেন, তিনি কিছু হইতেই ভয় পান না।'

Note: ভূমা মানে পূর্ণ; ওই যে 'পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে। পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।।' - সেই পূর্ণ, পরব্রহ্ম। 

Monday, January 9, 2023

নির্বাসনা

দিনকয়েক আগে একজনের বিয়েতে উপহার দেওয়ার জন্য গুগুলে একজোড়া smart watch খুঁজেছিলাম, AI সেটা ধরে নিয়ে এখন আমায় রোজই নানারকমের option পাঠিয়ে যাচ্ছে। গতকাল তো আমি প্রায় প্রলভিত হয়েই পড়েছিলাম, পরে সম্বিৎ ফিরতে মনে হলো এত যে গুচ্ছের ঘড়ি পরে আছে, যার অধিকাংশই অব্যাবহারের ফলে ব্যাটারি ফুরিয়ে মৃত, তার ওপর আবার আরো একটা ঘড়ির প্রয়োজনটা কোথায়? মিনিটে মিনিটে পাল্স বিপি ইত্যাদি না দেখেও তো জীবন দিব্যি চলে যাচ্ছে, সেধে চিন্তা বাড়ানো কেন রে বাবা? সত্যি, বাসনা যেন আর কিছুতেই যেতে চায় না, ফাঁক পেলেই টুপ করে মাথাটা তুলে ধরে।  

আমি সার সত্য এই বুঝেছি যে ঈশ্বরের কাছে যদি কিছু চাইতেই হয়, সেটি হলো নির্বাসনা। বিবেক, বৈরাগ্য, ভক্তি ইত্যাদি সব খুব কঠিন কঠিন ব্যাপার, ও সবের মানে বুঝতে বুঝতেই জীবন কেটে যাবে। তবে যেটা বুঝতে কোনো কষ্ট নেই, যা আমাদের দৈনন্দিন অনুভূতি, তা হলো বাসনা বা desire। আমি কোনো কিছু চাইছি কিন্তু পাচ্ছি না - তার থেকে বিরক্তি উৎপন্ন হচ্ছে, যাদের আছে তাদের সম্পর্কে ঈর্ষা উৎপন্ন হচ্ছে, নিজের ওপর রাগ হচ্ছে আর সেই বেদনা থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য না পাওয়ার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে এর-ওর কাছে তাদের নিন্দা করে বেড়াচ্ছি, সবসময় tension, stress, অন্তর্বেদনা, অশান্তি - এগুলো আমাদের প্রাত্যহিক অনুভব।

তাহলে root cause of অশান্তি কি - না বাসনা। বাসনা না থাকলেই নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি - না রাহেগী বাঁশ না বাজেগি বাঁশুরি। তাই ঈশ্বরের কাছে কোনো meaningful বাসনাপূর্তির আবেদন যদি জানাতেই হয়, সেটা কেবলমাত্র নির্বাসনার - desirelessness। উল্টোটাও করা যায় - যা যা কিছু এখানেই রেখে দিয়ে হুশ করে একদিন কেটে পড়তে হবে, খুব করে প্রার্থনা করে সে সবও চাওয়া যায়। ওটা অনেকটা ঘুষখোরের বৌয়ের ঢাঁই পরিমান জামা কাপড় কেনার শখের মতন - আলমারি উপচে পড়ছে, রাখার জায়গা নেই, অতগুলো পরার মতন occassion-ও নেই, তবু সমানে কিনে যাচ্ছে - কি, না অভ্যেস। শেষে থেকে থেকে পোকায় কাটবে অথবা পি‌ঁজে যাবে, নিজেরও কোনো কাজে কোনোদিন লাগবে না। 

একটু তলিয়ে ভাবলেই বোঝা যাবে যে আসলে দৈনন্দিন জীবন যাপনের জন্য আমাদের প্রয়োজন অত্যন্ত অল্প। এই কোভিডের সময় আমরা সকলেই কি সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাইনি? যেটুকু দরকার, শরণাগত হলে সেটুকু মা ঠিকই জুটিয়ে দেবেন, ওটাই প্রকৃতির নিয়ম। এত যে কোটি কোটি কীট পতঙ্গ পশু পাখি, ওদের কি আর আমরা খাওয়াই না ওদের বাসস্থান আমরা বানিয়ে দিই - ওরা কি সব না খেয়ে মরে? অভাব আর অভাববোধ এক জিনিস নয়। আমাদের সত্যিকারের কোনো অভাব নেই, অভাববোধ আছে, যা পশুপাখিদের নেই। আমরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত পেতে চাই, স্বাভাবিকভাবে না পেলে ছিনিয়ে নিতে চাই, তাও না পারলে লজ্জায় ঘেন্নায় ঈর্ষায় stress এ জ্বলেপুড়ে মরি - কেন রে বাবা? একজায়গায় আমি নিজের চোখে দেখেছি ভিখারিরা territory ভাগাভাগি নিয়ে ছেঁড়া কাঁথা-কম্বল আর ট্যাম খাওয়া ঘটিবাটি ছুঁড়ে ছুঁড়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে - ভিক্ষা করবে, সেখানেও অধিকারবোধ!

শ্রীশ্রীমায়ের পদপ্রান্তে বইটিতে মায়ের সম্পর্কে একটি ঘটনার কথা বর্ণিত আছে, যা এখানে উধৃত করা হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না। 'একজন বাছাই করা দুটি সেরা আম নিয়ে এসেছেন। মা চাইছিলেন আমি (ভগিনী দেবমাতা) ঐ আম দুটি নিয়ে যাই। কিন্তু আমি রাজি হলাম না, কারণ জানতাম, সেগুলি শেষ মরশুমের আম, আর মা আম খুব ভালবাসেন। বললাল, “আম দুটি আপনি নিজে রাখলে আমার বেশী আনন্দ হবে।” মা চকিতে বললেন, “আমি রাখলে তােমার আনন্দ, আর তুমি নিলে আমার আনন্দ, কার আনন্দ বেশী হবে তুমি মনে কর?” আমার মুখে তখনই কথা জুগিয়ে গেল, “মা, আপনার আনন্দই বেশী হবে, কারণ আপনার অনেক বড় মন।” জবাব শুনে মা খুশি হলেন।' অধিকারবোধ যদি থাকতেই হয়, তাহলে তা কেমন হবে সেটি মায়ের গোটা জীবন ধরে এরকমের নানান ঘটনা বিশ্লেষণ করলে সহজে শেখা যায়।

আমার পরম পূজনীয় গুরুদেব শ্রীশ্রীমায়ের সন্তান ছিলেন, ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ। দিব্যজীবনের অধিকারী এক মাতৃভক্ত রামকৃষ্ণময় সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী, কোনো পাপের সাধ্য নেই তাঁকে স্পর্শ করে, অথচ শেষ বয়সে তাঁকে দেখেছিলাম ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রায় দৃষ্টিশক্তিহীন এক শারীরিক অবস্থায়, যা কর্মফল অনুযায়ী মোটেও তাঁর প্রাপ্য নয়। তাহলে তিনি এত ভুগলেন কেন? কারণ সদগুরু জেনেশুনে শিষ্যের negative কর্মফল শুষে নেন আর তার effect তাঁদের দিব্যশরীরের ওপর দিয়েই বয়ে যায়। গুরু এই অযাচিত কৃপা এই কারণে করেন যাতে শিষ্য নিশ্চিন্তে তার ভাগের সাধনভজনটুকু করতে পারে, তাকে জাগতিক বিষয়ে আর বেশি গেঁথে না থাকতে হয়। প্রয়োজনের ভার তো মা নিয়েই আছেন, গুরু যাপনটুকুও কত সহজ করে দেন, তবু আমরা আমাদের ভাগের কাজটুকু আর করি কৈ? ওই এক বাসনা অসুর, ওটাকে যে কিছুতেই control করতে পারিনা, ফলে গুরু ইষ্ট মিলে পথ এত সহজ করে দেওয়া স্বত্তেও আমরা আসল ফেলে নকলের পেছনে দৌড়ে মরি। মা তাঁর এক অল্পবয়স্ক বিধবা শিষ্যাকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, "মা, আমার নাম ডােবাসনি। শিষ্যের পাপ গুরুতে লাগে। খুব সাবধানে থাকবি।" এই বিপথ থেকে রেহাই পাওয়ার একমাত্র রাস্তা নির্বাসনা, পেলেই কেল্লা ফতে।

তবে মানুষের মন তো, দুর্বলতা আসবেই, একেবারে বাসনাহীন হওয়া কি আর যায়? শ্রীশ্রীমায়ের পদপ্রান্তে বইটি থেকে আর একদিনের কথোপকথন follow করলে কিভাবে এই রাস্তায় হাঁটতে হবে, তাও স্পষ্ট হয়ে যায়। 'একদিন উদ্বোধনে চন্দন ঘষছি, মা উত্তরদিকের দরজার ধারে দক্ষিণ পশ্চিম দিকে মুখ করে মালা জপ করতে বসেছেন। কেউ নেই দেখে জিজ্ঞাসা করলাম, “মা, মাঝে মাঝে মন দুর্বল হয়ে পড়ে কেন?” তিনি শুনেই মালা রেখে বললেন, “ওদিকে নজর দিও না, কার মনে দুর্বলতা না আসে এক ঠাকুর ছাড়া? আজ পর্যন্ত এমন কোনও মহাপুরুষ জন্মেছেন কি, যার মনে কখনাে কোনও দুর্বলতা ওঠে নি? যদি শুধরােবার চেষ্টা থাকে, যদি মানুষ বুঝতে পারে যে, আমার মনে দুর্বলতা উঠেছে—তাহলে ঐ জিনিষটাই একটা মস্ত শিক্ষা, মহামায়া খুশি হয়ে তখন তাকে পথ ছেড়ে দেন। মানুষ কিছুদিন ভাল থাকলেই মনে করে আমার সব হয়ে গেছে, আরও উঁচুতে ওঠবার চেষ্টা ছেড়ে দেয়। কিন্তু বিবেকীর মনেও মাঝে মাঝে দুর্বলতা দিয়েই ঠাকুর স্মরণ করিয়ে দেন যে, এখনাে সাধনা শেষ হয়নি, ভূত-প্রেত সব ওত পেতে চারপাশে বসে আছে, সুবিধে পেলেই ঘাড়ে চেপে বসবে। এতে হয়কি, অহঙ্কার নষ্ট হয়। যতদিন বাঁচবে সাবধানে ঠাকুরের শরণাগত হয়ে থাকবে, অহঙ্কার হলেই ঐ সব হিজিবিজি মনে উপস্থিত হবে। শেষ পর্যন্ত শরণাগতির ভাব নিয়ে থাকতে হয়। ঠাকুর একবার নিজের শরীরে কামের বেগ ধারণ করে দেখালেন, জীবের অহঙ্কার করবার কিছুই নেই।”

Wednesday, January 4, 2023

মা-টি



মাটির পরে জন্ম আমার মাটির গুণে চাষ
মাটির বাড়ি মাটির হাঁড়ি মাটির ওপর বাস ।
মাটির সূত্রে বেদ বেদান্ত মাটির কৃপায় শ্বাস
মাটির প্রাণে মায়ের দরদ মাটির ঘ্রাণে আশ ।।
মাটির শ্যামলবরণ রূপে মাটির জলোচ্ছ্বাস
মাটির ঢ্যালা শ্যামার খেলা মাটিই চিদাকাশ ।
মাটির সাথে সহজ যাপন মাটির সাথে পাশ 
মাটির তরেই আনাগোনা মাটির নিচে খাস ।।

মাটির সাথে আড়ি আমার বুকের বোঝা ভারি ।
মাটির পরশ এড়িয়ে যেন নিজের কাছেই হারি ।।

(আজ শ্রীরামকৃষ্ণ পার্ষদ স্বামী তুরীয়ানন্দজীর আবির্ভাব তিথিতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে বোরো ধান চাষের শুভারম্ভ উপলক্ষে লেখা)

Monday, January 2, 2023

বন্দে ভারত

ইঁট কাঠ পাথর কংক্রিট মিশিয়ে একটা বাড়ি তৈরি হতে পারে কিন্তু সুখী গৃহকোন বা ঘরকন্না তৈরি হয় ঈশ্বরের আশীর্বাদ, পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য, মায়ের স্নেহ ভালোবাসা আর অপরিসীম ত্যাগ, বাপের কর্তব্যবোধ আর ছেলেমেয়েদের নির্ভরশীলতা ও ভক্তি শ্রদ্ধা মিশিয়ে। প্রত্যেক বাড়িরই একটা নিজস্ব পারিবারিক ধারা, একটা বিশিষ্ট সংস্কৃতি আছে, যা পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে জীবনে চলার পথে সদর্থক দৃষ্টিকোণ জোগায় আর একে অপরের প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে গোটা পরিবার একটা complete composite unit হিসেবে যাতে অনায়াসে function করতে পারে, তার foundation গড়ে দেয়। এই যে sense of belonging, এই যে নিজেদের পরম্পরাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রবণতা, এই যে একটাই unit হিসেবে নিজেদের ভাবা, এসব ছাড়া-ছাড়া ভাব থাকলে আসে না, আসতে পারেনা - যে কোনো broken familyর দিকে তাকালেই সেটা বোঝা যায়।

ঠিক সেইরকমই আমাদের দেশ। যেদিন পরিবারের একটা অংশ নিজেদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে যেতে চায়, সেইদিনই তাদের মধ্যে পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব দেখা দিতে শুরু করে, তারা পরিবারের ভালোর মধ্যে আর নিজেদের ভালো দেখতে পায়না। 'পরিবার' শব্দটির বদলে 'দেশ' শব্দটি ব্যবহার করলেও ঠিক এই একই ব্যাপার লক্ষ্য করা যাবে - দেশীয় মূল্যবোধহীন কিছু লোক একটা অদ্ভুত negative দেশবিরোধী ক্ষতিকারক মানসিক অবস্থানের কারণে নতুন বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের গায়ে পাথর ছুঁড়ে ক্ষতি করে অল্হাদিত হয়, যেমন পাগলের গো-বধে আনন্দ। এই একই মানসিকতা আমরা দেখেছিলাম সিএএ নিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ওপর অকারণ বিধ্বংসী রোষবর্ষণের সময়ও। সে সময় না হয় ইচ্ছাকৃতভাবে অশিক্ষিতদের ভুল বুঝিয়ে তাতানো হয়েছিল, তাও যাহোক একটা justification পাওয়া যায়, কিন্তু এবারে?

আমাদের দেশটি কেবলমাত্র একটি বাসভূমি নয়, ইনি আমাদের মা। ঠিক যেমন একটা বাড়ি কেবল বাড়ি নয়, সেটি একটি শান্তিপূর্ণ আশ্রয়স্থল। মা যেমন আমাদের প্রতিপালন করেন, আমাদের দেশ মাতৃকাও ঠিক সেভাবেই আমাদের খাওয়ান, পরান, দুহাত দিয়ে আগলে রাখেন। ভারতবর্ষ কোনো inanimate object নয়। ভারত হলো আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রাণশক্তির ধারকক্ষেত্র, আমাদের জন্মভূমি, আমাদের ধাত্রীভূমি, আমাদের কর্মভূমি, পুণ্যভূমি। আর সেজন্যই সনাতন পরম্পরায় তিনি জীবন্ত, মহাশক্তির অংশ, সাক্ষাৎ জননী। এই যে মায়ের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে আশীর্বাদ নেওয়ার ভারতীয় পরম্পরা, এটা সনাতন পারিবারিক সংস্কৃতি এবং ধর্মবোধ থেকেই তৈরি হয়েছে এবং সেই চিরন্তন মাতৃরূপ আমরা দেশমাতৃকার মধ্যেও দেখি।

ভারতীয় সংস্কৃতিতে শ্রীরামচন্দ্রের সামাজিক পরিচয় কি? না কৌশল্যানন্দন আর জানকীবল্লভ। লক্ষণের কি? সুমিত্রানন্দন। শ্রীকৃষ্ণের কি? দেবকিনন্দন ও যশোদানন্দন। কর্ণের কি? রাধাসুত। পাণ্ডব কারা? কুন্তিপুত্র। এটাই শাশ্বত ভারতবর্ষ, যেখানে নারীর পরিচয়ে পরিচিত হওয়া এককালে পুরুষের সৌভাগ্য বলে গণ্য করা হতো। তাই বিরজা হোম করে সংসার ত্যাগ করার পরেও সন্ন্যাসী নিজের ইষ্ট, গুরু আর অন্যান্য সন্ন্যাসী ছাড়া পূর্বাশ্রমের মধ্যে একমাত্র জন্মদাত্রী মাজননীকেই প্রণাম করতে পারেন। চতুর্দিকে কেবল শক্তির প্রকাশ - শক্তি ছাড়া আর কোথাও কিছুই নেই। পঞ্চকোষেও সেই শক্তির প্রকাশ, আবার আমার দেশমাতৃকাও সেই শক্তিরই রূপ, তাই এক অবিচ্ছেদ্য অনন্ত শক্তির manifestation হিসেবে আমি আর আমার জন্মভূমি এক এবং অবিচ্ছেদ্য, ঠিক যেমন সারা বিশ্ব আমার কুটুম্ব। এই identity relationship construct একমাত্র সনাতন সংস্কৃতিরই অংশ, যা আর কারো মধ্যে নেই। যাদের ধর্মবোধ নেই তাদের মাতৃবোধও নেই, তাই মায়ের জাতের ওপর অত্যাচার করতে তাদের বুক কাঁপে না। ফলে মায়ের সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে বেচে দিতেও তাদের দ্বিধা হয় না, যেমন বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের গায়ে ঢিল ছুঁড়ে তার ক্ষতি করতে তাদের মনে একটুও বাঁধে না, বরং পৈশাচিক উল্লাস হয়।

প্রশাসন কি ব্যবস্থা নেবেন আমি জানি না, হয়তো নেবেন, হয়তো নেবেন না। তবে মালদার কুমারগঞ্জ থেকে গোটাকতক দুষ্কৃতিকে ধরে জেলে পুড়ে বা তাদের সম্পত্তি ক্রোক করে বা বুলডোজার চালিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে ভয় দেখানো যেতে পারে, তাদের মনে প্রাণে 'বন্দে মাতরম' মন্ত্র প্রোথিত হবে না। ওটাই কিন্তু একমাত্র permanent solution - অসীম বলশালিনী মাতৃশক্তিকে পুরুষের চেয়ে হীনমন্য, subservient, dependent, obedient প্রাণী হিসেবে নয়, মা হিসেবে ভাবতে শেখানো আর মা হিসেবে বিনত অবনত অনুগত হয়ে শ্রদ্ধা করতে শেখানো। বাধ্য যদি করতেই হয়, এইখানটায় করতে হবে, আর না বদলাতে চাইলে এমন exemplary punishment দিতে হবে যাতে আচ্ছা-সে-আচ্ছা ক্রিমিনালেরও প্রাণ কেঁপে উঠে। নতুন যে ভারতবর্ষ জেগে উঠছে তার একটাই মহামন্ত্র - 'বন্দে মাতরম'। বন্দে ভারত, বন্দে মাতরম।