Wednesday, February 1, 2023

ওঁ

আজকাল রোজ সকালে প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার মতন হাঁটি। বড়রাস্তা এড়িয়ে গলিঘুঁজির মধ্যে দিয়ে যাতায়াতই আমার পছন্দ কারণ গাড়িঘোড়ার উৎপাত থাকে না। এইরকমই একটি সরু রাস্তার ধারে একটি ছোট একতলা বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে ভেতর থেকে আজ ভোরে ওঁকার ধ্বনি কানে এলো - একটি স্পিকারে ক্রমাগত সামবেদীয় সুরে ওম ওম ওম ওম ওম ধ্বনি বাজছে। আমি বেশ কিছুক্ষণ ওঁদের জানলার পাশে দাঁড়িয়ে শুনলাম, তারপর বাকিটা পথ মনের মধ্যে ক্রমাগত ওই মহামন্ত্র বাজতে লাগলো, এখনো চোখ বন্ধ করলেই যেন শুনতে পাচ্ছি। 

'খুদ' অর্থাৎ 'মিথ্যে আমি'কে পেরিয়ে 'খুদা' অর্থাৎ 'সত্যি আমি' অবধি পৌঁছনোর রাস্তাই হলো আধ্যাত্মপথ। স্বর থেকে নাদ। আমরা সবাই জানি যে কন্ঠ থেকে বা কোন পদার্থে আঘাত করার ফলে যে একাধিক কম্পাঙ্কবিশিষ্ট আওয়াজ বা ধ্বনি নির্গত হয়, তাকেই স্বর বলে। আবার, একটু অন্যভাবে দেখলে, অন্তরস্থিত 'ঈশ'র সাথে দেহযুক্ত 'স্বর'কে সম্পৃক্ত করাও আসলে ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করার একটা পথ - শব্দপথ। সেটাও অধ্যাত্মযাপন। শব্দ এবং সুর তো স্বরেরই ভিন্নমাত্রিক বৈশিষ্ট্য। 

সামবেদ (সামন্‌ বা গান ও বেদ বা জ্ঞানের সমাস) হলো সুরারোপিত ঋগ্বেদ। সে আমলে এই বেদের স্তোত্রগুলি ‘উদ্‌গাতৃ’ বা গায়ক পুরোহিতরা গাইতেন। সামবেদে মূল পাঠের ঠিক উপরে অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাঠের অভ্যন্তরে নিহিত স্বরলিপিভুক্ত সুর পাওয়া যায়। এগুলিই সম্ভবত বিশ্বের প্রাচীনতম স্বরলিপিভুক্ত সুর। যাইহোক, ঋকপ্রাতিশাখ্যে শৌণিক সামবেদের সঙ্গীতোপযোগী স্বরগুলিকে 'যম' বলে উল্লেখ করেছেন।

ভাবগত দিক থেকে সামবেদের যম শব্দটির সাথে যোগশাস্ত্রে উল্লেখিত যমের আশ্চর্য্যজনক মিল আছে। আমরা জানি যে মহর্ষি পতঞ্জলি রচিত যোগশাস্ত্রে অষ্টাঙ্গযোগের প্রথমটিই হল যম। বলা যায় যে এটি মূলত এক নৈতিক আচরণবিধি। অর্থাৎ ব্যক্তি তাঁর পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ideally কেমন আচরণ করবেন, তার বিধিই হলো যম। 

মূলত যম হলো সংযম বিধি। সহজ, সরল, অনাড়ম্বড়  এবং লালসাহীন যাপনের মাধ্যমে জীবনকে উপভোগ করা বা সংযমের মধ্য দিয়ে জীবনের অর্থ খুঁজে পাবার সাধনাই হলো যমের চর্চা। অন্যদিকে, যেহেতু ধ্বনিই সঙ্গীতকে নিয়ন্ত্রণ করে বা সংযত করে, তাই স্বরের অপর নামও যম রাখা হয়েছিল।

যম হলো যে কোনো স্বরের সাধারণ নাম। পরে প্রতিটি স্বরের নামকরণের মধ্য দিয়ে সঙ্গীতের স্বরমালার পত্তন ঘটেছিল। ভাষার ক্ষেত্রে প্রতিটি ধ্বনিমূল ধরে নামকরণ করার সূত্রে বর্ণ (অ, আ, ক, খ ইত্যাদি) তৈরি হয়েছিল। তেমনি স্বরের নামকরণের মধ্য দিয়ে সঙ্গীতের বর্ণ সৃষ্টি হয়েছিল। একালের স র গ ম প ইত্যাদি হলো এইরকমই এক একটি সাঙ্গীতিক স্বরের নাম বা বর্ণ।

এমনই তিনটি স্বর অ+উ+ম্ নিয়ে একটি অনবদ্য ধ্বনি হলো ওঁকার বা প্রণবমন্ত্র। এতে মৌখিক এবং সাঙ্গীতিক দুটি স্বরেরই সমাহার এবং সনাতন দর্শনের মতে এতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যত স্বর আছে, সব অন্তর্ভুক্ত। তাই একদিক দিয়ে দেখলে তিন মাত্রার এই একটিমাত্র শব্দই সৃষ্টি স্থিতি এবং প্রলয়ের মূর্তরূপ, আবার অন্যদিক দিয়ে দেখলে ইনি সৃষ্টির আদিস্বর বা নাদব্রহ্মও বটে।

স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর The way to Blessedness ভাষণে একজায়গায় বলছেন, "He whom all the Vedas seek, to see whom men undergo all sorts of asceticism, I will tell you His name: It is Om. This eternal Om is the Brahman, this is the immortal One; he who knows the secret of this — whatever he desires is his." (CW, Vol.2)

আবার শিকাগো থেকে জন হেনরি রাইটকে লেখা ২রা অক্টোবর ১৮৯৩ সালের একটি চিঠিতে ন্যায়শাস্ত্রের (দ্বৈত) মহান দার্শনিক উদয়নাচার্যকে উদ্ধৃত করে স্বামীজী লিখছেন, "He who is the Brahman of the Vedântins, Ishvara of the Naiyâyikas, Purusha of the Sânkhyas, cause of the Mimâmsakas, law of the Buddhists, absolute zero of the Atheists, and love infinite unto those that love, may [He] take us all under His merciful protection". দ্বৈতমতের দৃষ্ঠিভঙ্গি থেকে এক ওঁকারে একেবারে সম্পূর্ণ সমর্পণ যাকে বলে আরকি। 

এই যে স্বরকে ধরে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানো, এ বড় কম কথা নয়। আমরা শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত জুড়ে নানা জায়গায় দেখতে পাই ঠাকুর প্রণবধ্বনি শুনে সমাধিস্থ হয়ে পড়ছেন, এই শব্দের এমনই দ্যোতনা। ওখানে একজায়গায় আছে যে ২৬শে নভেম্বর ১৮৮৩ সালে ঠাকুর সিঁদুরিয়াপটী ব্রাহ্মসমাজে গেছেন, সেখানে 'ওঁ সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম। আনন্দরূপমমৃতংযদ্বিভাতি। শান্তং শিবমদ্বৈতম্‌ ...' ইত্যাদি মন্ত্রোচ্চারণ হচ্ছে, ঠাকুর প্রণবসংযুক্ত এই ধ্বনি শুনে সমাধিস্থ হয়ে পড়েছেন। তারপর মাস্টারমশাইয়ের ভাষায়, 'সমাধির অব্যবহিত পরেই চক্ষু মেলিয়া চারিদিকে চাহিতেছেন। দেখিলেন, সভাস্থ সকলেই নিমীলিত নেত্র। তখন ‘ব্রহ্ম’ ‘ব্রহ্ম’ বলিয়া হঠাৎ দণ্ডায়মান হইলেন। উপাসনান্তে ব্রাহ্মভক্তেরা খোল-করতাল লইয়া সংকীর্তন করিতেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ প্রেমানন্দে মত্ত হইয়া তাঁহাদের সঙ্গে যোগ দিলেন আর নৃত্য করিতে লাগিলেন।' পড়লেই মনে হয়না যে ওঁকার আর আনন্দ, celebration, estacy সব যেন কেমন মিলেমিশে যাচ্ছে?

সঠিক পরিবেশে সঠিক উচ্চারণে সঠিক সুরে ওঁকার ধ্বনি শুনলে মনের ওপর কেমন এবং কতটা প্রভাব পড়ে, সেটা ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয়। একক বা সম্মিলিত কন্ঠস্বর আর একটি প্রাচীন সুর মিলে শ্রোতার মনকে হঠাৎই এমন এক পর্যায়ে নিয়ে চলে যেতে পারে, যেখানে বড় আনন্দ, বড় প্রশান্তি, বড় নির্লিপ্ততা, বড় নিশ্চিন্ততা - ওই feeling ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। কি অদ্ভুত শক্তি ওই একটি ধ্বনির মধ্যে, কি অসীম ক্ষমতা - কল্পনাও করা সম্ভব না। এতক্ষণ যে এইসব হাবিজাবি লিখলাম, কেন লিখলাম জানিনা, সব থিওরি, বেকার। আসল জিনিস হলো the effect of Omkara on one's state of being. 

ওঁ তৎ সৎ
হরি ওঁ রামকৃষ্ণ

Sunday, January 29, 2023

শুদ্ধাত্মা



ঠাকুর বলেছেন শুদ্ধ মন, শুদ্ধ বুদ্ধি আর শুদ্ধ আত্মা একই জিনিস। প্রতিটিকে আলাদা আলাদা করে বিচার করতে করতে শেষে কেন সেই একই জায়গায় পৌঁছতে হয়, সেই বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক। তার আগে আধ্যাত্ম মানে কি সেটা বুঝে নেওয়া দরকার। আত্মা শব্দের একটি অর্থ আমি। আর আত্মার অধ্যয়নই অধ্যাত্ম। আত্ম মানে আমার। তাই একে আত্মবিজ্ঞানও বলা যায়। বাহ্যিক অর্থে 'আমি' মানে দেহে অবস্থিত মন বুদ্ধি আর অহংকারের সমষ্টিগত রূপ। আর স্বরূপ অর্থে 'আমি' মানে আত্মা অর্থাৎ আমার চিরকালীন eternal existential form বা তুরীয় বা চতুর্থম্। ফলে আধ্যাত্মিক পথে চলতে গেলে আমার মন বুদ্ধি আর আত্মার মধ্যে যে interconnection, তাকে বুঝে নেওয়াটা প্রয়োজন বৈকি। অহংকারকে আমরা এই আলোচনা থেকে বাদ রাখবো কারণ যতক্ষণ কর্ম থাকবে ততক্ষণ দেহবোধও থাকবে আর ততক্ষণ অল্প হলেও 'আমি'ভাবও থাকবে। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, 
ন হি দেহভৃতা শক্যং ত্যক্তুং কর্মাণ্যশেষতঃ।
য়স্তু কর্মফলত্যাগী স ত্যাগীত্যভিধীয়তে ॥    
অর্থাৎ, অবশ্যই দেহধারী জীবের পক্ষে সমস্ত কর্ম পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়, কিন্তু যিনি সমস্ত কর্মফল পরিত্যাগী, তিনিই বাস্তবিক ত্যাগী বলে অভিহিত হন। (১৮/১১)

মন
The Basic Theory of Mind বইতে মন সম্পর্কে বলা হচ্ছে, 'The mind is one thing that has always fascinated and puzzled us. It is the only thing that we can be certain of existing, yet, apparently, we do not know exactly what it is, how it occurs, and why it occurs. This is in contrast to things outside the mind.' আর বিখ্যাত Merriam-Webstar অভিধানের মতে মনের সাধারণ অর্থ হলো memory বা স্মৃতি আর বিস্তৃত অর্থ হলো 'the element or complex of elements in an individual that feels, perceives, thinks, wills, and especially reasons.' অন্যদিকে বঙ্গীয় শব্দকোষকার হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে মনঃ মানে ১. চিত্ত, হৃদয়, মানস, অন্তঃকরণ; ২. মনীষা, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা; ৩. মানসশক্তি; ৪. মনঃসাধ্য গায়ত্রীজপাদি; ৫. সংকল্পবিকল্পাত্মিকা অন্তঃকরণবৃত্তি; ৬. ইন্দ্রিয়ের প্রেরক ও আত্মায় ইন্দ্রিয়জন্য জ্ঞানের সমর্পক - ইন্দ্রিয়গণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ - ইন্দ্রিয়ানাং মনশ্চামি (গীতা ১০.২২); ৭. ইচ্ছা, কাম; ৮. অন্তঃকরণবৃত্তি, ভাব, অভিপ্রায়। অভিধানকারেরা এই যে মনের এতগুলো অর্থ বের করেছেন, তাতে তিনটি জিনিস common - ১. মন অন্তঃকরণবৃত্তি, ২. মন বহুমুখী, আর ৩. মনের সঙ্গে ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি এবং conciousness বা চেতনার সরাসরি যোগ আছে। 

বুদ্ধি
Daeyeol Lee তাঁর Birth of Intelligence বই সংক্রান্ত একটি সাক্ষাৎকারে বলছেন, "Intelligence can be defined as the ability to solve complex problems or make decisions with outcomes benefiting the actor, and has evolved in lifeforms to adapt to diverse environments for their survival and reproduction. For animals, problem-solving and decision-making are functions of their nervous systems, including the brain, so intelligence is closely related to the nervous system." আর বুদ্ধিকে একদম দৈহিকস্তরে সীমাবদ্ধসূচক এইসব কথা বলার ঠিক পরেই তিনি বলছেন, "Intelligence is hard to define, and can mean different things to different people." বোঝা গেল যে ওঁরা artificial intelligence নিয়ে কাজ তো করছেন কিন্তু মনের মতোই intelligence বা বুদ্ধির আসল রহস্যটি এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। আবার হরিচরণের সাহায্য নেওয়া যাক। ওনার মতে বুদ্ধি মানে ১. 'বোধসাধন', মতি, প্রজ্ঞা; ২. নিশ্চয়াত্মিকা অন্তঃকরণবৃত্তি; ৩. প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, উপস্থিতবুদ্ধি; ৪. তত্ববিশেষ (সাংখ্য মতে); ৫. আত্মবিষয়প্রজ্ঞা; ৬. বিচারশক্তি, বিবেকশক্তি; ৭. বোধ, জ্ঞান; ৮. প্রত্যয়, বিশ্বাস; ৯. কর্তব্যবিষয়ে উপদেশ; ১০. উপায়; ১১. উপায়োদ্ভাবনের শক্তি; ১২. যুক্তি। এতসব সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে আবার তিনটি common thread বেরিয়ে আসে: ১. বুদ্ধি অন্তঃকরণবৃত্তি, ২. বুদ্ধি বহুমুখী, আর ৩. বুদ্ধির সাথে মন, বিচারশক্তি, জ্ঞান আর বোধের সরাসরি যোগ আছে। 

আত্মা
সাহেবরা যতই ইদানিং hard problem of conciousness নিয়ে মাতামাতি করুন না কেন, আত্মা বা তুরীয় বা চতুর্থম্ (4th One) সম্পর্কে একমাত্র আমাদের বেদান্ত দর্শনই ভরসা। আত্মা হলেন অবস্থাত্রয়ী অর্থাৎ জাগরণ, স্বপ্ন আর সুষুপ্তির অবস্থায় যে অন্তঃস্থিত চতুর্থ স্বতন্ত্র স্বত্তা সবকিছুর আসল দ্রষ্টা বা common factor বা স্বাক্ষী হিসেবে সদাজাগ্রত থাকেন, যিনি মৃত শরীর থেকে নতুন শরীরে transferred হন এবং নিজের সাথে পূর্বজন্মের কর্মফল বহন করে নিয়ে যান, তিনি। আত্মার সবচেয়ে প্রমুখ আভিধানিক অর্থ হলো স্ব, আপনি (Oneself), নিজস্বরূপ, স্বীয়রূপ। আর কি? হরিচরণের লেখনীতে আত্মা মানে ব্যবসয়াত্মিকা অর্থাৎ বুদ্ধি (বুদ্ধিরাত্মা -বেদান্তসার) আর মনঃ অর্থাৎ মন (মনঃ আত্মা -বেদান্তসার)। তার মানে বহুমুখী মন আর বুদ্ধি কোনো একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্তঃস্থিত একম্ অদ্বিতীয়ম্ আত্মার সমার্থক হয়ে গেল!

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে বেদান্তসার আর গীতার মধ্যে তাহলে কি contradiction তৈরি হয়ে যাচ্ছে না, কারণ গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের ৪২নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন,
ইন্দ্রিয়াণি পরাণ্যাহুরিন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মনঃ। 
মনসসন্তু পরা বুদ্ধির্যো বুদ্ধেঃ পরতস্তু সঃ।।
অর্থাৎ, স্থুল জড় পদার্থ থেকে ইন্দ্রিয়গুলি শ্রেয়; ইন্দ্রিয়গুলি থেকে মন শ্রেয়; মন থেকে বুদ্ধি শ্রেয়; আর আত্মা সেই বুদ্ধির থেকেও শ্রেয়।
এইখানেই শ্রীরামকৃষ্ণের ওই একটি বিশেষণ বা qualifying factor গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে - 'শুদ্ধ'। এইজন্যই বলে এইযুগে বেদান্তের সার হলো রামকৃষ্ণ কথামৃত। ঠাকুর বলছেন,
(মাস্টারের প্রতি) - "যিনি শুদ্ধ আত্মা, তিনি নির্লিপ্ত। তাঁতে মায়া বা অবিদ্যা আছে। এই মায়ার ভিতরে তিন গুণ আছে - সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ। যিনি শুদ্ধ আত্মা তাঁতে এই তিনগুণ রয়েছে, অথচ তিনি নির্লিপ্ত। আগুনে যদি নীল বড়ি ফেলে দাও, নীল শিখা দেখা যায়; রাঙা বড়ি ফেলে দাও, লাল শিখা দেখা যায়। কিন্তু আগুনের আপনার কোন রঙ নাই।
"জলে নীল রঙ ফেলে দাও, নীল জল হবে। আবার ফটকিরি ফেলে দিলে সেই জলেরই রঙ।
"মাংসের ভার লয়ে যাচ্চে চণ্ডালে - সে শঙ্করকে ছুঁয়েছিল। শঙ্কর যেই বলেছেন, আমায় ছুঁলি! - চণ্ডাল বললে, ঠাকুর, আমিও তোমায় ছুঁই নাই, - তুমিও আমায় ছোঁও নাই! তুমি শুদ্ধ আত্মা - নির্লিপ্ত।
"জড়ভরতও ওই সকল কথা রাজা রহুগণকে বলেছিল।
"শুদ্ধ আত্মা নির্লিপ্ত। আর শুদ্ধ আত্মাকে দেখা যায় না। জলে লবণ মিশ্রিত থাকলে লবণকে চক্ষের দ্বারা দেখা যায় না।
"যিনি শুদ্ধ আত্মা তিনিই মহাকারণ - কারণের কারণ। স্থূল, সূক্ষ্ম কারণ মহাকারণ। পঞ্চভূত স্থূল। মন বুদ্ধি অহংকার, সূক্ষ্ম। প্রকৃতি বা আদ্যাশক্তি সকলের কারণ। ব্রহ্ম বা শুদ্ধ আত্মা কারণের কারণ।
"এই শুদ্ধ আত্মাই আমাদের স্বরূপ।
"জ্ঞান কাকে বলে? এই স্ব-স্বরূপকে জানা আর তাঁতে মন রাখা! এই শুদ্ধ আত্মাকে জানা।"

শুদ্ধতা
শুদ্ধতা মানে কি? দিনে পাঁচবার স্নান করা, মাথায় গঙ্গাজল ছেটানো, শগরী এঁটো হেগো মুতো - সারাক্ষন এই সব করা না সবসময় ঘর ঝাড়পোঁচ করে কাচা জামাকাপড় পরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকা? ওগুলো সবই বাহ্যিক, আসল শুদ্ধতা হলো অন্তরের পরিচ্ছন্নতা আর তা হলো মনকে জাগতিক বস্তুর চাহিদা থেকে সরিয়ে এনে আধ্যাত্মিক চাহিদার দিকে চালিত করা, যাতে আত্মার সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয়। যে মন এটা করতে পারে সেই শুদ্ধ মন। ঠাকুর বলছেন, "... যোগের বিঘ্ন - কামিনী-কাঞ্চন। এই মন শুদ্ধ হলে যোগ হয়। মনের বাস কপালে (আজ্ঞা চক্রে) কিন্তু দৃষ্টি লিঙ্গ, গুহ্য, নাভিতে - অর্থাৎ কামিনী-কাঞ্চনে! সাধন করলে ওই মনের ঊর্ধ্বদৃষ্টি হয়।" আর এক জায়গায় বলছেন, "কথাটা এই - মন স্থির না হলে যোগ হয় না, যে পথেই যাও। মন যোগীর বশ, যোগী মনের বশ নয়।" এই কথাটির তাৎপর্য হচ্ছে যে বাহ্যিকভাবে মাথায় গঙ্গাজল ছেটালে যেমন শরীর শুদ্ধ হয় তেমনই মনকে স্থির করতে পারলে মন শুদ্ধ হয় আর ঊর্ধ্বমুখী হয়।

আর শুদ্ধ বুদ্ধি কাকে বলে? যে বুদ্ধি ঠিক বেঠিক, সৎ অসৎ আর ভালো মন্দ বিচার করে মনকে কেবল ঠিক সৎ আর ভালো decision নিতে বাধ্য করে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো শ্রীরামকৃষ্ণদেব আর শ্রীশ্রীমায়ের একটি কথোপকথন। ঠাকুর একদিন মাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তুমি কি আমায় সংসারপথে টেনে নিয়ে যেতে এসেছ?" মা উত্তর দিয়েছিলেন, "তা কেন, আমি তোমার ইষ্টপথে সহায়তা করতে এসেছি।" এই হলো শুদ্ধ বুদ্ধি, যা মনকে ঊর্ধ্বমুখী হতে প্রেরণা দেয়, জাগতিক temporary অকাজ থেকে focusটা পারমার্থিক দিকে ঘুরিয়ে দেয়। এখন, ভেবে দেখলে যেহেতু মন বুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত, সেহেতু শুদ্ধ মন হতে হলে শুদ্ধ বুদ্ধি হতেই হবে - they are integral to each other and therefore inseparable.

শেষে হলো আত্মা। আত্মা সততই শুদ্ধ কারণ আত্মা হলো সিনেমা হলের সেই পর্দার মতন - তার ওপর কমেডি ছবিই চলুক আর ট্র্যাজেডি, অভিনেতারা প্রেমই করুন বা মারামারি, পর্দার ওসবে কিছুই আসে যায় না - ছবি শেষ আর পর্দাও জিঁউ কে তিঁউ বিলকুল সাফ। ফলে যে শুদ্ধ বুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত শুদ্ধ মন আধ্যাত্মিক রাস্তায় এগোচ্ছে, সে আখেরে এগোচ্ছেটা কার দিকে? ওই আত্মার দিকে। অর্থাৎ স্ব-এর দিকে, নিজের অক্ষয় স্বীয়রূপের দিকে। যেই যোগ সফল হলো অমনি তো মন বুদ্ধি আর আত্মা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল, তাই ঠাকুর বলেছেন, "যোগীরা যে স্মরণ মনন করেন তার নাম মনোযোগ। আবার ভাবি কালীঘরে গিয়ে, মা মনও ত তুমি ! তাই শুদ্ধ মন, শুদ্ধ বুদ্ধি, শুদ্ধ আত্মা একই জিনিস"।

মন এবং বুদ্ধি শুদ্ধ হলে বাহ্যিক ভেদাভেদজ্ঞান ঘুচে গিয়ে সাধকের কি আনন্দময় অবস্থা হয় তার বিবরণ ঠাকুর নিজের মুখেই দিয়ে গিয়েছেন, কথামৃত থেকে সেই ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়ে আজকের এই প্রসঙ্গের ইতি টানা যাক।
"শ্রীরামকৃষ্ণ (নরেন্দ্রাদি ভক্তের প্রতি) - আমার এই অবস্থার পর কেবল ঈশ্বরের কথা শুনিবার জন্য ব্যাকুলতা হত। কোথায় ভাগবত, কোথায় অধ্যাত্ম, কোথায় মহাভারত খুঁজে বেড়াতাম। এঁড়েদার কৃষ্ণকিশোরের কাছে অধ্যাত্ম শুনতে যেতাম। কৃষ্ণকিশোরের কি বিশ্বাস! বৃন্দাবনে গিছিল, সেখানে একদিন জলতৃষ্ণা পেয়েছিল। কুয়ার কাছে গিয়ে দেখে, একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। জিজ্ঞাসা করাতে সে বললে, ‘আমি নীচ জাতি, আপনি ব্রাহ্মণ; কেমন করে আপনার জল তুলে দেব?’ কৃষ্ণকিশোর বললে, ‘তুই বল শিব। শিব শিব, বললেই তুই শুদ্ধ হয়ে যাবি।’ সে ‘শিব’ ‘শিব’ বলে জল তুলে দিলে। অমন আচারী ব্রাহ্মণ সেই জল খেলে! কি বিশ্বাস!"

শ্রীরামকৃষ্ণার্পণমস্তু।

Friday, January 27, 2023

আনন্দ



শ্রীমৎ স্বামী চেতনানন্দজীর একটি বক্তৃতায় তিনটি শব্দ শুনলাম - Faith, Hope and Love - বিশ্বাস, আশা আর ভালোবাসা। শুনে মনে হলো যে এগুলি একেবারে তিনটি essential element of living, যেগুলি না থাকলে মানুষের জীবনটাই অর্থহীন। কি বিশ্বাস? না নিজের অধ্যবসায়ের ওপর বিশ্বাস, নিজের গুরুবাক্যের ওপর বিশ্বাস আর এই জীবনেই ইষ্টদর্শন হবে সেই বিশ্বাস। কিসের আশা? গুরু আমায় কৃপা করবেন, ইষ্ট আমায় কৃপা করবেন, মা আমায় শরণাগতি দেবেন - সেই আশা। 

আর ভালোবাসা। ঠাকুর বলেছেন এই কালে মনের পাপ পাপ নয়। পূর্ব জন্মের সংস্কারের ফলে হয়তো মনের মধ্যে কখনো কখনো বৃত্তি খেলে যাচ্ছে কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি পাপী, আমার কেবল সুকর্ম আছে। I am essentially Divine. সেইজন্য আমার গুরু আমায় এত ভালোবেসে আমার ভার নিয়েছেন, আমার ইষ্ট আমায় এত ভালোবেসে তাঁর নামরূপ দিয়েছেন আর মা তো আমায় অসম্ভব ভালোবাসেনই, যার প্রমান আমি প্রতিটি পদে পদে পাই। আমিও আমার গুরুকে, আমার ইষ্টকে আর আমার চিরকালের মাকে ভীষণ ভালোবাসি, প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। তাই আমার প্রতিদিনের মানসিক যাপন একটা ভালোবাসার অনন্দঘন আবহে ঘেরা আর সেই আনন্দ-অনুভূতিই আমি সমস্ত ধরণের পরিবেশের মধ্যে পেতে চাই। 

কিরকম? ওই রবীন্দ্রনাথ একটি গানে বলেছেন না,
'তার অন্ত নাই গো যে আনন্দে গড়া আমার অঙ্গ।
তার অণু-পরমাণু পেল কত আলোর সঙ্গ,
ও তার  অন্ত নাই গো নাই।
তারে মোহনমন্ত্র দিয়ে গেছে কত ফুলের গন্ধ
তারে দোলা দিয়ে দুলিয়ে গেছে কত ঢেউয়ের ছন্দ,
ও তার  অন্ত নাই গো নাই।
আছে কত সুরের সোহাগ যে তার স্তরে স্তরে লগ্ন,
সে যে কত রঙের রসধারায় কতই হল মগ্ন,
ও তার  অন্ত নাই গো নাই।'

তাই যেখানে বিশ্বাস নেই কেবল সন্দেহ আছে, সেখানে আমি নেই। যেখানে আশা নেই, কেবল নিরাশা আছে, সেখানে আমি নেই। আর যেখানে ভালোবাসা নেই, আনন্দ নেই, শান্তি নেই, কেবল পরনিন্দা আছে, ঈর্ষা আছে, অন্যকে ব্যবহার করা আছে, অহেতুক চেঁচামেচি আর বিতর্ক আছে, সেখানে আমি নেই। একদম ধারেকাছেও নেই। তার মানে কি আমি escapist? মোটেও না। 

আমি নেই বলতে ওখানে আমার মন নেই, ওখানে আমার concentration নেই, ওর ওপর আমার focus নেই, কেবল motion আছে। আমায় যদি কোনো dispute resolution করতে কোর্টে যেতে হয় আমি যাবো, আমার তরফ থেকে যা defense তা পেশ করবো কিন্তু বিপক্ষ কি প্যাঁচ কষছে বা রায় কি হতে পারে তা নিয়ে সারাক্ষন মাথা ঘামাবো না, infact একেবারেই মাথা ঘামাবো না। I will go through the motion with sincerity but neither get affected nor involved at an emotional level. আমি জানি ওতে আনন্দ তো নেইই, ওতে permanent কোনোকিছুও নেই।

তাই যে মুহূর্তে কোর্ট থেকে বেরোবো সেই মুহূর্তেই আমি আমার যে নিজস্ব বিশ্বাস আশা আর ভালোবাসার bubbleটা আছে, যার দেওয়ালগুলো আমি জপ-ধ্যান দিয়ে একটু একটু করে গেঁথে তুলেছি, টুক করে তার মধ্যে নিশ্চন্তে ঢুকে পড়বো কারণ আমার জীবনের উদ্দেশ্য মামলা লড়া নয়, সৃষ্টির আনন্দকে অনুভব করা, উপলব্ধি করা আর ভোগ করা। আসলে পূর্বজন্মের বহু সুকৃতির ফলে এই যে হিন্দু শরীরটা পেয়েছি, এটা আমাকে আমার নিজের মনের মতো পথ বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই exhilarating অনুভূতিটা বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের ভাগ্যেই নেই। 

আমার ওপর মায়ের এমন কৃপা যে কোনো পন্থীয় dictation মানার বাধ্যবাধকতাই আমার নেই। আমাকে না তো বাধ্যতামূলকভাবে বিশেষ কোনো Personal Godকে মানতে হয়, না তাঁর কোনো একজন বিশেষ অবতারকে আর না তাঁর কোনো একটি বিশেষ নির্দেশনাবলীসূচক গ্রন্থকে। আমি মুক্ত, স্বেচ্ছাধীন। অনেক পথ, অনেক অবতার আর অনেক গ্রন্থের মধ্য থেকে আমার যা ভালোলাগে, যাঁকে ভালোলাগে আর যে রাস্তা ধরে এগোতে আমি যখন comfortable, হিন্দু হওয়ার কারণে সবসময় সেটাই বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা আমার আছে and I must preserve this independence at any cost. 

হিন্দুজীবন হলো সম্পূর্ণভাবে cerebral, হিন্দু শরীর পেলে temporary অকাজে সময় নষ্ট করার কোনো মানেই হয়না। তবে শরীর থাকলে তবে তো মন থাকে আর মন থাকলে তবে তো উচ্চচিন্তা করা সম্ভব হয়, ফলে শরীর রক্ষা করার জন্য যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু তো করতেই হবে, সেটা জরুরিও। রোজগার নেই অথচ অর্থ বা সামগ্রী দিয়ে সাধুসেবা করবো - absurd ব্যাপার, utopian. তাই রোজগার করাটা অকাজ নয় কিন্তু এসব আমার রোজগার, আমি মালিক, আমার টাকা, আমি যা ইচ্ছে করবো, কার বাপের কি - এই ভাবনাটা অকাজ। ফলে জাগতিক বিষয়ে involvement ততটুকুই রাখতে হয় যতটুকু না হলেই নয়।

আসল কথা হলো জীবনকে সম্যকরূপে উপভোগ করা। আমি শুদ্ধ, আমি শরণাগত, আমি কৃপাপ্রাপ্ত, মা আমার হাত ধরে আছেন, আমার এ শরীর মন বোধ বুদ্ধি সবই অনন্দময়ীর সদানন্দময় আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলের ভাব তরঙ্গে তরঙ্গায়িত; আমার উৎপত্তি আনন্দ থেকে, আমার স্থিতি আনন্দে এবং লয়ও আনন্দেই হবে - এই অনুভূতিটা খুবই calming, খুবই ভরসার। 
মা গো আনন্দময়ী নিরানন্দ করো না,
তোমার ও দুটি চরণ বিনে আমার মন
অন্য কিছু আর জানে না।
মা গো আনন্দময়ী নিরানন্দ করো না।।

Wednesday, January 25, 2023

৭৪তম গণতন্ত্র দিবস


সবাইকে ৭৪তম গণতন্ত্র দিবসের শুভেচ্ছা জানাই। আজ কর্তব্যপথের বুকে ভারতরাষ্ট্রের যে সুন্দর পরম্পরাশ্রয়ী ছবিটা আঁকা হলো সেটা আমাদের দেশীয় সামরিক শক্তিপ্রদর্শনের সাথে সাথে রাষ্ট্রের ইতিহাসিক ঐতিহ্যবাহী বিবিধের মাঝে ঐক্যের বার্তাবহনকারী। এটাই আমাদের পুণ্যভূমি থেকে উঠে আসা জাতীয় উত্তরাধিকার আর এটাই আমাদের ভবিষ্যতের পাথেয়। 

আজ স্বাধীনতা পরবর্তীকালে নতুন করে We the people এর সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠা করার দিন। কোন people? যারা ভারতীয় গণ। কারা ভারতীয় গণ? যারা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা, সমন্বিত সংস্কৃতি ও ধর্মসংস্কারের ধারক ও বাহক বলে গৌরবান্বিত বোধ করেন। 

বাকিরা resident হতে পারেন কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতিতে সম্পুর্নরূপে লীন না হতে পারার কারণে রাষ্টের তো বটেই, নেশনের citizen হবার যোগ্যতাও এখনো অর্জন করেননি - হয়তো তাঁদের মনে এখনো বিপরীত কোনো বিজাতীয় ধারাকে প্রাধান্য দেবার দ্বন্দ্ব গেঁথে আছে। ফলে ভারতের গণতন্ত্র দিবস যাদের জন্য, তাঁরা বাকিদের ভারতীয়ত্বের যোগ্য হয়ে ওঠার ব্যাপারে আরো প্রচেষ্ট হবেন, গণতন্ত্র দিবসের এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। 

গভীর সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক স্বাতন্ত্রবোধ সম্পন্ন যে কোনো বিশেষ জনসমাজই হলো জাতি। আর এরকম অনেক জনসমাজের সমষ্টি হলো নেশন। নেশন শব্দটি জেনেশুনেই ব্যবহার করলাম কারণ নেশনের বাংলা অনুবাদস্বরূপ জাতি লেখা হলেও, জাতি মোটেও নেশন নয় এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নেশন শব্দটিই ব্যবহার করতেন, জাতি শব্দটি নয়। 

এতগুলো কথা বলার কারণ এই, যে নেশন এবং রাষ্ট্রের অবধারণা বুঝতে গেলে উপজাতি, জাতি, নেশন বা দেশ এবং রাষ্ট্রের মধ্যে যে সম্পর্ক সেটা স্পষ্টভাবে বোঝা দরকার। ভারতীয় নেশন হলো বিভিন্ন অঙ্গপ্ৰতঙ্গ মিলিয়ে একটা শরীর, একটা big melting pot আর হিন্দুত্ব বা Hinduness হলো তার প্রাণ। হিন্দু মানে প্রাচীন হিন্দু সভ্যতার উত্তরাধিকারি citizen, যার প্রসঙ্গ আগেই আলোচিত হয়েছে।

ইংরেজিতে Nation বলতে বোঝায় 'a large body of people united by common descent, history, culture, or language, inhabiting a particular country or territory'. এই পরিভাষা অনুযায়ী তো দক্ষিণ-রাঢ়ি, মিজো, তামিল, কোঙ্কানি, বিদর্ভি, মৈথিলি ইত্যাদি সব আলাদা আলাদা জাতি হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা তো নয়, এগুলো কেবল উপজাতিগত পরিচয়। রাষ্ট্র একটা magical word, জাতির চশমা পরে দেখলে যাকে বোঝা মুস্কিল।

হিন্দুত্বের নানাদিকের একটা দিক হলো তার বিশিষ্ট রাষ্ট্রচেতনা - তার প্রাচীন ইতিহাস, তার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট, তার ধর্মবোধ, সব মিলেমিশে হিন্দু হয়ে ওঠা যেমন রোমান, গ্রিক, মিশরীয় ইত্যাদিদেরও সভ্যতাভিত্তিক বিশিষ্ট পরিচয় আছে। এই সভ্যতার legacyকে অস্বীকার করে চার্চিল India সম্পর্কে তাঁর ভ্ৰান্তধারণা অনুযায়ী বলেছিলেন যে, ‘India is a geographical expression…. No more a single country than the Equator.’ কিছু ভারতীয় এখনো এই কথাতেই বিশ্বাস করেন, ফলে তারা এখনো ভারতীয় citizen বা হিন্দু হয়ে উঠতে পারেননি, Indian হয়েই রয়ে গেছেন।

চার্চিল একটা unitarian উপজাতির কথা বলছেন, নেশনেরও নয়, রাষ্ট্রের নয়। আর ভারত কেবল একটা নেশন নয়, একটি মহান রাষ্ট্র, হিন্দুরাষ্ট্র, যার ভূগোল আজ বিভক্ত হলেও, ইতিহাস ও ঐতিহ্য এক। তাই সাভারকার সঠিকভাবেই বলেছিলেন যে, 'Hindu is one who considers India to be his motherland (matrbhumi), the land of his ancestors (pitrbhumi), and his holy land (punya bhumi)', যা চার্চিলের অবধারণার চেয়ে একেবারে উল্টো।

আমরা হলাম গণতন্ত্রের মাতৃভূমি। এর বিস্তারিত ইতিহাসে যাওয়ার অবকাশ এখানে নেই, কিন্তু গণতন্ত্র সেই বৈদিক যুগ থেকেই মূল ভারতীয় হিন্দু জীবনশৈলীর অবিচ্ছেদ্য সামাজিক-রাজনৈতিক অঙ্গ। ফলে, আজ যখন নতুন করে গণতন্ত্র দিবস পালিত হয়, তখন একে হিন্দু সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে ভুল হবে কারণ পরবর্তীকালে বাইরে থেকে যে authoritarianism আমদানিকৃত হয়েছে, তা আমাদের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির basic tenet-এর বিরোধী। আমাদের বালি আর কংসকে বধ করা থেকে নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে হারিয়ে দেওয়া পর্য্যন্ত একটা বহু হাজার বছরের ইতিহাস আছে।

ভারত এখন বিশ্বগুরু হিসেবে নতুন করে আবার নিজের পুরানো ভূমিকা পালন করার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। সাংস্কৃতিকভাবে অখন্ড ভারত কেবলমাত্র সময়ের অপেক্ষা। এইসময়, যারা দেশে থাকেন, তাদের সবাইকেই যদি আমরা এক ছাতার তলায় আনতে না পারি তাহলে যারা মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন, তাদের একত্রিত করবো কি করে? তাই প্রত্যেক ভারতবাসীর উচিত প্রজা থেকে রাজা হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় নিজেরা তো সামিল হবেনই, বাকিদেরও হাত ধরে সেই রথে টেনে তুলবেন। হয়তো সময় লাগবে, কিন্তু আমার বিশ্বাস লেগে থাকলে একদিন না একদিন এই লক্ষ্য ঠিকই হাসিল হবে।

The rise of Bharat

A Colonial-Merchantile economy reigned for 200 years, followed by Socialism for 75 years, followed by Globalisation for 25 years. All of these are dead and buried now and a transition is in progress. Coming is the era of a Bharatiya economic order, which is unique, just and equitable. 

Britain's economy rose because she enjoyed peace dividend while the rest of Europe were fighting among themselves. US rose after the World Wars as she too enjoyed peace dividend till the fag end of the war while all the colonial and neocolonial powers were fighting with each other. Post WW II Germany, Japan and China's rise at the behest of US can also be attributed to peace dividend enjoyed by them while the two major poles of the era i.e. USA and USSR were at loggerheads with each other.

Now, Europe is at war again, albeit in a proxy mode, US is at loggerheads with China and Russia, Japan is probably going nuclear, the Middle East is confused regarding which pole to join, Iran is threatening the Arabs, Israel is threatening Iran, Syria is a global headache, Turkey is trying to punch above her weight while Greece, Armenia and Egypt are closing in on her from all sides, NATO is chaos personified and war can erupt between North and South Korea anytime at China's prodding, to act as a smokescreen for her adventurism in Taiwan. 

Amidst all this turmoil and a sure shot world war looming large in the horizon within five years, which nation would now reap peace dividend to the hilt? Goes without saying. And therefore, after the dust settles, a new economic order shall emerge very soon, which would be a beautiful combination of ancient wisdom and new aspirations, an order based on Dharma and humaneness. Wait and watch folks. 

Our era has just begun. The rise of a strong nationalist in the form of Narendra Modi (and incidentally of BJP) is not without reason. As his agenda of promoting our age-old National Identity above everything else gains ground, Bharat is steadily moving away from her colonial legacy of casteist, linguistic and regional divides and getting more and more united while the European, American and Chinese societies are getting increasingly fragmented.

Also look at what fate has befallen on our enemies - they are steadily moving towards bankruptcy and disintegration from within. These are clear indications of the future. Our future role is preordained by the Divine Power. It is to ensure peace and harmony across the globe as the world's conscience keeper. We will get there very soon, come what may.

Tuesday, January 24, 2023

কংগ্রেস

অনেকদিন রাজনীতি নিয়ে কিছু লিখিনি কিন্তু বিবিসির একটা বেআইনি কাজকে সমর্থন করে কিছু অপগন্ডের আশা জেগে উঠছে দেখে ভাবলাম মনের কথাটা বলেই ফেলি। অবশ্য একই কথা সুপ্রিম কোর্টের কলিজিয়ামের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য যেখানে জজ সাহেবরা নিজেরা নিজেরাই সংবিধান সংশোধন করে নিয়েছেন আর রাজনৈতিক কারণেই কেউ কেউ সেটাকে সমর্থনও করছেন!

কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির রাজনীতিতে আমার বিন্দুমাত্র কৌতুহল নেই কারণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি যে 'হামাম মে সব নাঙ্গে হ্যায়'। কিন্তু আমার দেশের ব্যাপারে আমার যথেষ্ট চিন্তা আছে এবং একটা credible opposition এর অভাবে শাসকদলের লাগামছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ও আছে। 

প্রথমেই বুঝে নেওয়া দরকার যে নেহেরুর কংগ্রেস আর ইন্দিরার কংগ্রেস এক নয়, যেমন নরসিংহ রাওয়ের কংগ্রেস আর এখনকার সোনিয়া-রাহুলের কংগ্রেসও এক নয়। নেহেরু বিচারধারায় প্রায়-বামপন্থী ছিলেন, ইন্দিরা ক্ষমতার জন্য দেশের ভেতরে ও দেশের বাইরের বামপন্থী শক্তিকে চতুরতার সঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন মাত্র।

তারপর নরসিংহ রাও যদিও কংগ্রেসকে বামপন্থার বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো থেকে প্রায় বের করে এনেছিলেন, সোনিয়া কংগ্রেসকে রাওমুক্ত করার জন্যই নিজের আধিপত্য বজায় রেখেই শাশুড়ির মতোই বামপন্থাকে ব্যবহার করেছিলেন। মনমোহন সিংয়ের সময় বিচারব্যবস্থা নিয়ে কংগ্রেসি মন্ত্রীরা সংসদে যে ধরণের সমালোচনা করেছিলেন এবং সে সময়ের বিরোধী দলনেতা অরুন জেটলির সমর্থন পেয়েছিলেন, আজ নিজেরা শুনলে হয়তো অবাক হবেন।

রাহুল গান্ধীর ব্যাপারটা একদম অন্যরকম কারণ তাঁর নিজের কোনো স্বাধীন চিন্তা নেই, বৌদ্ধিকস্তরে তিনি সম্পূর্ণভাবে পরনির্ভর অথচ পাহাড়প্রমাণ অহংকারের অধিকারী। তাই কাজের লোকেরা সবাই তাঁকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর অকেজো বামপন্থীরা তাঁকে ঘিরে ফেলে নিশ্চিন্তে নিজেদের এজেন্ডা চালাতে পারছে আর তিনি কাঠপুতুলের মতো তাদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে কংগ্রেসকে দিনে দিনে আরো অপ্রাসঙ্গিক করে তুলছেন। 

আচ্ছা, ভারতের কতজন নাগরিক নিউ ইয়র্ক টাইমস বা ওয়াশিংটন পোস্ট বা দ্য ওয়ের পড়েন অথবা বিবিসি বা আল জাজিরা দেখেন? পয়সা দিয়ে ওখানে মিথ্যে ন্যারেটিভ ছাপিয়ে বা মিথ্যে প্রোপাগান্ডামূলক ডকুমেন্টরি চালিয়ে কি দেশের অগুনিত সাধারণ নাগরিকের প্রাত্যহিক জীবনের সদর্থক অভিজ্ঞতাকে নস্যাৎ করে দেওয়া যাবে? এতে একমাত্র বিদেশি ভারতবিরোধী শক্তির হাতে কিছু প্রোপাগান্ডার অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়, আর কিছুই না।

বেছে বেছে সেনাদিবসের দিনেই যদি দিগ্বিজয় সিং বালাকোট হামলার সত্যতা নিয়ে আবার প্রশ্ন তুলে বসেন, যখন কিনা সেই অপারেশনের প্রধান কান্ডারীকেই কংগ্রেস নিজেদের জাতীয় সুরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করে কিছুদিন আগেই প্রচারের বন্যা বইয়ে দিয়েছে, জয়রাম রমেশের ঠাকুর্দার সাধ্য আছে সেই দেশবিরোধী কংগ্রেসকে অবনমনের হাত থেকে বাঁচানোর? 

নিছক রাজনৈতিক কারণে হটাৎ করে গণবেশ পরে ময়দানে হাজির হয়ে গেলেই যেমন কেউ স্বয়ংসেবক হয়ে যান না, ঠিক তেমনই বামপন্থীদের দ্বারা চালিত হলেই কেউ বামমনস্ক হয়ে যান না এবং সেটা তাঁর দামি পোশাকআশাক আর অসংলগ্ন কথাবার্তায় ফুটেও ওঠে। দুটোই সমান মেকি এবং ভারতে সুস্থ, স্বচ্ছ, মতবাদভিত্তিক রাজনীতির পক্ষে ক্ষতিকারক। 

কংগ্রেসের উচিত তারা যা নন সেটা সাজার বৃথা চেষ্টা ত্যাগ করা, ঠিক যেমন বিজেপির উচিত তারা যা নন, অন্যের দেখাদেখি তাই হয়ে ওঠার চেষ্টা না করা। গণতন্ত্রে বিভিন্ন বিচারধারা থাকবে, খোলাখুলি মতের আদানপ্রদান হবে, দেশের স্বার্থ কেবল ব্যক্তিস্বার্থ ও দলীয়স্বার্থের উর্দ্ধে হবে তাই নয়, সর্বোপরি হবে - তবে না দেশের মানুষের উপকার হবে। 

কংগ্রেস ভেবে দেখুক সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে দেশের পক্ষে ক্ষতিকারক অপপ্রচারকারী, শত্রুর বন্ধু আর নিন্দুকের ভূমিকা পালন করবে না রাষ্ট্রের উন্নতি ও বৈভবের কারণ হয়ে উঠবে। কংগ্রেসে কি চায় তা গৌণ, দেশের মানুষ কি চান সেটাই মুখ্য। দেশের মানুষ যদি কোনো রাজ্যে বিজেপিকে না চান, কংগ্রেস বা অন্য কোনো দল যদি নির্বাচিত হয়, ক্ষতি কি? তেমনিই দেশের মানুষ যদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এইমুহূর্তে কেবলমাত্র মোদিজীকেই চান, অন্য কাউকে নয়, তাঁদের মতামতকে অসম্মান করার অধিকার কারো আছে কি?

বামপন্থীরা মনুষ্যত্বের শত্রু, এদের চেয়ে দোগলা, হিংস্র আর মিথ্যেবাদী রাজনৈতিক মতাবলম্বী সারা বিশ্বে আর দ্বিতীয়টি নেই। শ্রেণীর নামে সারা বিশ্ব জুড়ে কত কোটি কোটি মানুষকে যে এরা খুন করেছে, তার ইয়ত্তা নেই, হিটলার এদের এক একটি রত্নের তুলনায় দুগ্ধপোষ্য শিশু। এদেরকে ব্যবহার করা এক জিনিস আর এদের দ্বারা চালিত হওয়া অন্য জিনিস। এদের রাস্তা যদি সঠিক হতো তাহলে মাত্র সত্তর বছরের মধ্যে সারা বিশ্বজুড়ে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে এদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করতেন না। 

এদের খপ্পরে পড়ে কংগ্রেস যা করছে ভুল করছে, ভবিষ্যতে যা করবে তাও ভুল করবে। এতদিনে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে গেছে - রাহুলমুক্ত হতে না পারলে দেশের রাজনীতিতে কংগ্রেসের কোনো সদর্থক ভূমিকা থাকবে না। ব্যাপারটা দুঃখের হলেও সত্যি। ততদিন মিথ্যের বেসাতি চলতে থাকবে, যা দেখে ঘোড়াতেও হাসছে। আমি আশা করবো যে অদূর ভবিষ্যতে সারা দেশজুড়ে একটা মস্ত বড় রাজনৈতিক মন্থন হবে আর across the spectrum যা কিছু মেকি, যা কিছু অসৎ, যা কিছু মিথ্যা সব মানুষের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে আস্তাকুঁড়ে স্থান পাবে।

Sunday, January 22, 2023

একটা ঘর

একটা ঘর 

ঘরটা অগোছালো
লেপ এলোমেলো
খোলা ল্যাপটপের পাশে খোলা জলের বোতল
মাঝেমাঝেই বেজে ওঠা ফোন
আর বহুদিনের পিছটান -
হটাৎ চুপচাপ।

সবকিছু গুছানো
বিছানাটা টানটান
খালি টেবিলে কোণে খালি ফুলদানি
পর্দাগুলোও টানা
ছায়া ছায়া ঘুমন্ত ঘরে
এখনো কোলোনের আভাস।

কেউ ছিল, এখন নেই,
এটুকুই।
২২.১.২৩
(বিশালের আজ ভোরে বোম্বে ফিরে যাওয়ার পর সন্ধ্যায় লেখা)