Thursday, September 21, 2023

ভারত সঙ্ঘ বনাম প্রদেশিকতা

এক বুড়োখোকা সারাক্ষন 'India is not a Nation but an Union of States' বলে বলে মাথা খারাপ করে দেন, তিনি কি জানেন শ্রী ভীমরাও আম্বেদকর সংবিধানের আর্টিকেল ১এর বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যায় কি বলেছিলেন? তিনি বলেছিলেন 'India is an indestructible Union with destructible States' অর্থাৎ ভারত একটি অবিনাশী Union বা সঙ্ঘ, আর রাজ্যগুলি অনিত্য - তারা ভাঙতে পারে, জুড়তে পারে, অন্য রাজ্যে বিলয় হতে পারে, তারা কেন্দ্র দ্বারা শাসিতও হতে পারে, ইত্যাদি। 

আমেরিকার ফেডারেশন, যার ভিত্তিতে বুড়োখোকা এইসব আজেবাজে কথা বলে বেড়ান, সেটা কিন্তু সম্পুর্ন ভিন্ন একটা কনসেপ্ট যেখানে বিভিন্ন রাজ্য সম্মিলিতভাবে একটি রাষ্ট্রগঠনের জন্য চুক্তিবদ্ধ। ভারতের ক্ষেত্রে একেবারেই তা নয় এবং ফেডারেশনের বদলে ইউনিয়ন শব্দটি সংবিধান সভায় প্রচুর আলোচনার পরেই প্রয়োগ করা হয়েছিল। তার কারণ, এক, ভারতীয় ফেডারেশন আমেরিকান ফেডারেশনের মত রাজ্যগুলির মধ্যে একটি চুক্তির ফলাফল নয়; এবং দুই, রাজ্যগুলির ফেডারেশন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কোনো অধিকারই নেই৷ 

এখন মুস্কিল হলো 'এক রাষ্ট্র' বা 'one Nation' এর ধারণা রাষ্ট্র্ববাদের ভাবনাকে সুদৃঢ় করে, nationalism এর জন্ম দেয়, আর এর ঠিক উল্টোটা, অর্থাৎ প্রাদেশিকতা বা আঞ্চলিকতাকে মুখ্যধারা করতে পারলে উগ্র sub nationalism এবং আখেরে বিচ্ছিন্নতাবাদকে ছড়াতে সাহায্য করে রাজনৈতিক লাভ ওঠানো যায়। আজ বহুবছর ধরে তামিলনাড়ুতে যে ধরণের Dravidian রাজনীতি আমরা দেখছি - উত্তর ভারতের প্রতি ঘৃণা, মুখ্য উত্তর ভারতীয় ভাষার প্রতি অবজ্ঞা আর হিন্দুত্ব অর্থাৎ আসমুদ্র হিমালয় একটাই single entity, সমস্ত নাগরিকের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত মূল রাষ্ট্রীয় পরিচয় হিন্দু এবং এই সমাজ এক সনাতন ধর্মবোধ দ্বারা চালিত - এর বিরুদ্ধাচরণ করতে গিয়ে ইচ্ছে করে সেই বাতিল হয়ে যাওয়া আর্য - অনার্য বিভাজনের থিওরিকে তুলে এনে আঞ্চলিকতাকে খুঁচিয়ে তোলা হচ্ছে যাতে ভারতীয় সঙ্ঘকে কমজোর করা যায়।  

এই একই ক্ষুদ্র রাজনৈতিক লাভের জন্যই বুড়োখোকা টুকরে টুকরে গ্যাংকে তোল্লা দেন অথবা সারা দেশে জাতিভিত্তিক জনগণনা করার জন্য জোরাজুরি করেন বা বিদেশে গিয়ে ভারত এক রাষ্ট্র নয় বলে বেড়ান। এই জন্যই ভারতের দখল হয়ে যাওয়া জমির ওপর দিয়ে যখন চীন তার নিজের বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের রাস্তা বানায়, বুড়োখোকা তাকে চীনের visionary পদক্ষেপ বলেই প্রচার করেন। এখন ব্যাঙ্গালোরে আছি, সহায়িকারা কেউ হিন্দি বুঝতে পারেন না কিন্তু ইংরিজি বুঝতে পারেন - এতদিনের ইন্ডি গোষ্ঠীর শাসনের ফলে এখানকার এই অদ্ভুত দ্বিচারিতা দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি ! 

আমি আশা করবো বুড়োখোকাদের গুষ্টিকে এবার জনতা আগাপাসতলা বর্জন করবেন এবং যে বীর সভারকারকে এঁরা মনেপ্রাণে ঘৃণা করেন, মাঝেমাঝেই বীরদর্পে "I am not Savarkar" বলে নিজেদের হিন্দুবিরোধী মানসিকতাকে উজাগর করেন, হিন্দুরাষ্ট্র সম্পর্কে সেই শ্রী বিনায়ক দামোদর সভারকারের ব্যাখ্যাই একেবারে সঠিক এবং সর্বজনগ্রহণযোগ্য বলে প্রতিপন্ন হবে। পুরাণ বলছেন,
आसिंधु सिंधु पर्यन्ता यस्य भारतभूमिका ।
 पितृभू: पुण्यभूश्चैव स वै हिंदुरिति स्मृत: ॥
(সিন্ধু নদী থেকে নিয়ে সিন্ধু সাগর পর্য্যন্ত বিস্তৃত ভারতভূমিকে যে নিজের পিতৃভূমি এবং পূণ্যভূমি মানে, সেই হিন্দু।)
সাভারকার এই ব্যাখ্যাকে আরো এগিয়ে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, 'Hindu is one who considers India to be his motherland (matrbhumi), the land of his ancestors (pitrbhumi), and his holy land (punya bhumi).'

Monday, September 18, 2023

দেশের ক্ষতি

সংসদীয় গণতন্ত্রের নিজস্ব একটা মর্য্যাদা আছে কারণ সংসদে সরকারপক্ষ এবং বিরোধীপক্ষ উভয়ই কিন্তু জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি - জনপ্রতিনিধি হিসেবে ধারে ভারে কেউ কারো থেকে কম বা বেশি ক্ষমতাবান নন। দুপক্ষের সাংসদরাই একই শপথবাক্য পাঠ করেন, দুপক্ষই সংবিধানের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠা রাখার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ, সেখানেও দুপক্ষের ভূমিকার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। বাকি, সরকারপক্ষের কাজ শাসন করা আর বিরোধীপক্ষের কাজ ভুল ধরিয়ে দেওয়া - মিটে গেল। তাহলে একপক্ষের এত হীনমন্যতা কিসের?

খুবই খারাপ লাগে যখন দেখি নেহাত বিরোধিতার জন্য বিরোধীপক্ষের কেউ কেউ বিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনের মধ্যেও ক্ষুদ্র দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থকে টেনে এনে গণতান্ত্রিক পরম্পরাকে হেয় করছেন। এঁদের কখনো দেখি নতুন সংসদভবনের নির্মাণ আটকানোর জন্য বারেবারে আদালতে ছুটে যাচ্ছেন, তাতে জাতীয় প্রতীক প্রতিষ্ঠা করার সঙ্গে সঙ্গে সিংহের হিংস্রতা নিয়ে অকারণে বিতর্ক সৃষ্টি করে সমালোচনায় মুখর হচ্ছেন, ভবন উদ্ঘাটনের দিন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান বয়কট করছেন, আর আজ যখন প্রথমবার নতুন সংসদে রাষ্ট্রীয় ধ্বজারোহন হলো, তখন রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা চিঠি লিখে জানিয়ে দিলেন তিনি আসতে পারবেন না, অন্যত্র দলীয় কার্য্যক্রমে ব্যস্ত। 

এটা যদি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতো, খুশি হতাম কিন্তু বাস্তবিক তা নয়। এর আগেও স্বাধীনতা দিবসে এই একই ভদ্রলোক লালকেল্লার জাতীয় অনুষ্ঠানকে এড়িয়ে দলীয় অনুষ্ঠানে চলে গিয়েছিলেন। আমার মনে হয় প্রতিষ্ঠান ও পরম্পরার ওপর বারবার এই আঘাত আসলে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ওপরেই আঘাত। রাজনীতিকে যদি এত নিচু স্তরে নামিয়ে আনা হয় যেখানে সরকারি অনুষ্ঠানকে অন্য পক্ষের দলীয় অনুষ্ঠানের মতন তুচ্ছতাচ্ছিল্য বা উপহাস বা অবজ্ঞা করা যেতে পারে, তাতে সংবিধানকে কতদূর শ্রদ্ধা বা তার প্রতি কতটা নিষ্ঠা প্রদর্শিত হয়, আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। 

আমি জানি না যে দলটি ৬০ বছর দেশের শাসনভার সামলেছেন, তাঁরা আজ এত বেসামাল কেন। এমনটা তো আগে ছিল না - তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরসিংহ রাও ভারতের পক্ষ রাখতে তৎকালীন বিরোধী নেতা শ্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীকে জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলিতে পাঠিয়েছিলেন। সংবিধান প্রধান বিরোধীপক্ষকে যে ভূমিকা দিয়েছে তাঁরা যদি তা ঠিকমত পালন না করেন তাহলে সেই ভূমিকা যে তাঁরা অচিরেই হারিয়ে বসবেন, সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই কারণ গণতন্ত্রের ওই স্তরে শূন্যস্থান পূরণ হতে বেশিক্ষন সময় লাগে না। 

বিরোধীপক্ষ হয়তো এই ভেবে খুশি হচ্ছেন যে সরকার অপদস্থ হচ্ছেন আর সরকারপক্ষ হয়তো এই ভেবে আনন্দিত যে দেশের সামনে বিরোধীদের নেতিবাচক ভূমিকা প্রকাশিত হচ্ছে কিন্তু আখেরে এতে দেশের ক্ষতি হচ্ছে, সংসদ নামক মহান প্রতিষ্ঠানটির ক্ষতি হচ্ছে, জনপ্রতিনিধিত্ব সম্পর্কেই প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিচ্ছে আর গণতান্ত্রিক পরম্পরার প্রতি সম্মান ক্রমশঃ কমে যাচ্ছে। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে এঁরা অনেকেই নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পর্ককেও একইভাবে তলানিতে এনে ফেলেছেন - এতটাই যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ৭৩তম জন্মদিনে তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতেও অনেকে অক্ষম। 'দোল দোল দুলুনি রাঙা মাথায় চিরুনি' করতে করতে কখন যে ক্ষতিটা মাত্রাছাড়া হয়ে যাবে, নিজেদের ক্ষুদ্র রাজনীতি নিয়ে মশগুল এই মানুষগুলো হয়তো আজ বুঝতেও পারছেন না।

Tuesday, September 12, 2023

সফলতার চাবি

যদিও আগে একাধিকবার পড়েছি, তবু আজ সকাল থেকে সেই প্রিয় বইটিই আবার পড়ার চেষ্টা করছি যদিও চোখের কারণে খুবই মন্থরগতিতে পড়তে হচ্ছে। বইটির নাম The Divine Life, পূজ্যপাদ স্বামী যতিস্বরানন্দজি মহারাজের লেখা। আসলে লেখা না বলে সংকলন বলাই ভালো যেখানে ৭৮ পৃষ্ঠার এক দীর্ঘ introduction লেখার পর পূজনীয় মহারাজ গীতা, উপনিষদ, ভাগবত, মনুস্মৃতি, পুরাণ ইত্যাদি নানা শাস্ত্রগ্রন্থ থেকে নানা শ্লোক তুলে তুলে একত্রিত করে এক আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় structure তৈরি করেছেন। 

Introduction ছাড়া মোট ১৪টি অধ্যায়ে বিভক্ত ছোট একটি বই, অসাধারণ বই, সবসময় সঙ্গে রাখার মতন বই। বইটার বক্তব্য আত্মস্থ করতে গেলে অন্তত বার কয়েক পড়তে হবে আর জীবনে যাঁদের দেখেছি, ভালো মন্দ indifferent, তাঁদের সাথে এবং অবশ্যই নিজের আচরণের সাথে শ্লোকগুলো মিলিয়ে মিলিয়ে দেখতে হবে, তবে theory আর practice এর মধ্যে কোথায় মিল আর কোথায় গরমিল আর তার ফলে একজন মানুষ ঠিক কি ধরণের legacy রেখে গেছেন বা তৈরি করছেন, তা স্পষ্ট বোঝা যাবে। 

প্রায় গোটা পঞ্চাশেক মানক আছে আধ্যাত্মিক জীবনে অগ্রগতির জন্য কিন্তু আমি নিজের মতো করে তার মধ্যে থেকেই শুধুমাত্র স্বভাবগত কয়েকটিকে আলাদা করে নিয়েছি নিজের ও অপরের আচরণকে সহজে analyse করার জন্য। এখন এই একই মানকগুলি ধরে ধরে যদি আমরা দুটি আলাদা আলাদা field এর আলাদা আলাদা দুজন বিখ্যাত ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের পর্য্যালোচনা করি - ধরা যাক শ্রী নারায়ণমূর্তি এবং শ্রী রাহুল গান্ধীর, তাহলে মানুষ হিসেবে তাঁদের অগ্রগতি কতটা, তাও খানিকটা বোঝা যাবে আবার নিজে কতটা পিছিয়ে আছি সেটাও বোঝা যাবে। আমার দুর্ভাগ্য যে এই ক্ষীণ দৃষ্টি নিয়ে আমি এই শরীরে আর মনু সংহিতা পড়তে পারলাম না, পারলে হয়তো আরো কিছু শিখতে পারতাম।

মানকগুলি হলো:
কর্মযোগী বনাম ফলপ্রত্যাশী
বিশ্বাসী বনাম বোধহীন
প্রত্যয়ী বনাম নিয়তিবাদী
উৎসাহী বনাম উদাসীন
ত্যাগী বনাম অহঙ্কারি
বিবেকি বনাম ভয়ার্ত
সেবাব্রতী বনাম শ্লাঘাপূর্ণ
সংস্কারী বনাম অভব্য
সমাবেশী বনাম বিভাজনী
ধর্মবোধী বনাম অধার্মিক
আধ্যাত্মিক বনাম ভৌতিক
যে কাউকে, তা তিনি আধাত্মপথের যাত্রী হন বা নাই হন, কেবল মানুষ হিসেবে কেমন তা এই মানকগুলি ধরে ধরে চরিত্র বিশ্লেষণ করলে বুঝতে সুবিধা হবে এবং কার সঙ্গ কাম্য আর কোন ধরণের সঙ্গ ত্যাজ্য, সে বিষয়ে নির্ণয় নেওয়াও সহজতর হবে।

কেবল প্রথম মানকটি বুঝিয়ে ছেড়ে দিচ্ছি - যিনি কর্মযোগী তিনি তাঁর সম্পুর্ন ফোকাসটি নিজের কাজের ওপরেই রাখেন যেমন ইনফসিস গড়ে তোলার সময় শ্রী নারায়ণমূর্তি নিজে বছরে ৩০০ দিন বাড়ির বাইরে থাকতেন অথচ ত্রিশ বছর নিজের পরিবারকে নিয়ে ব্যাঙ্গালোরের বাইরে কোথাও ঘুরতে যাননি। এই ধরণের মানুষ resultএর ওপর ফোকাস করেন না - ওটা by product - বৃহত্তর selfless goal থাকে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও তাই - যবে থেকে দলীয় বা সাংবিধানিক দায়িত্বে এসেছেন, তাও প্রায় ত্রিশ বছর হয়ে গেল, একদিনও ছুটি নেননি কারণ ওনার কাছে দেশের জন্য কাজ করে যাওয়াটাই জীবনের লক্ষ্য।

কোনো ফললাভ লক্ষ্য থাকলে এমন নিরবিচ্ছিন্ন পরিশ্রম এঁরা করতে পারতেন না কারণ একজন সাধারণ মানুষ যে সামাজিক সন্মান, প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার কথা কল্পনাও করতে পারেন না, সেটা তো অনেক আগেই ওঁরা পেয়ে গেছেন, তারপর এখনো এত খাটনির কি প্রয়োজন? আচ্ছা, মজার ব্যাপার হলো কেবল শাস্ত্রপথে থেকেও যে উচ্চতম জাগতিক সুখ ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে, এঁরা তারও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বটে। এঁদের দুজনকে চোখের সামনে দেখছি তাই এঁদের কথা বললাম নাহলে সফলতম কর্মযোগী হিসেবে আদি শঙ্করাচার্য্য থেকে নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে পরম পূজনীয় ডাক্তারজি - অনেকের কথাই বলা যেত। একইভাবে যদি এক এক করে বাকি মানকগুলোর নিরিখেও নিজের ও মানুষের স্বভাব বিশ্লেষণ করা যায়, আপনেআপ দুধ কা দুধ ঔর পানি কা পানি হো জায়গা।

Saturday, September 2, 2023

মিথ্যেকথা

দেশে রাজনৈতিক পারদ যত চড়ছে তত চতুর্দিকে নেতাদের গলায় মিথ্যে কথার ফুলজুরি ফুটছে। আসলে আমাদের দেশে রাজনীতি বস্তুটাই এখনো একটা বিরাট বড় মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে - "গরিবের দুঃখে আমার বুক ফাটে" - সত্যি সত্যিই ক'জনের ফাটে ভাই? যাইহোক, যারা বলার তারা বলুক, আমরা সাধারণ মানুষ কি ব্যক্তিগত জীবনে মিথ্যাকথা না বলার অভ্যেস করতে পারি না? আমি চেষ্টা করে দেখেছি, খুব খুব কঠিন জিনিস। চতুর্দিকে মিথ্যে শুনতে শুনতে আর ছেলেবেলা থেকে অকারণে "খুচরো নেই", "বাড়িতে নেই", "টেলিফোন খারাপ", "পেট খারাপ", ইত্যাদি মিথ্যেকথাগুলোকে পারিবারিক স্বীকৃতি পেতে দেখে আমাদের এমন মানসিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে আমরা বেশিরভাগ মানুষই আদতে এক একটি compulsive lier তৈরি হয়ে গিয়েছি। কাউকে খুশি করার জন্য মিথ্যা বলছি, কাউকে দুঃখ না দেওয়ার জন্য মিথ্যা বলছি, তাও নাহয় বোঝা গেল, কিন্তু অকারণে কেন? কোনো ট্রেনের অচেনা সহযাত্রীকে "আচ্ছা আবার দেখা হবে" বলে বিদায় দেওয়ার মধ্যেও যে মিথ্যে আছে, সেটা আমরা হয়তো বুঝতেও পারিনা, ওটাকে সামাজিকতা বলে সহজেই স্বীকার করে নিই। আর স্বার্থসিদ্ধির জন্য ইচ্ছে করে মিথ্যে কথা বলা তো আছেই, সারাদিন ধরে ক্রমাগত বলেই চলেছি। আমি একদিন চেষ্টা করলাম একটাও মিথ্যে বলবো না, পারলাম না। আবার পরদিন চেষ্টা করলাম, পারলাম না। আবার একদিন করলাম, আবার ব্যর্থ। তারপর লিখতে শুরু করলাম - যেই মিথ্যে বলি অমনি কি বললাম আর কেন বললাম লিখে রাখি। কিছুদিন পর পড়তে গিয়ে দেখলাম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মিথ্যে কথা বলার প্রয়োজনই ছিল না, চুপ করে থাকলে বা সরে গেলেই হতো। সেদিন থেকে আমি বাকসংযমের উপকারিতা উপলব্ধি করতে পেরেছি। এখনো মাঝে মাঝে মিথ্যেকথা বলি, তবে আগের তুলনায় অনেক অনেক কম। হয়তো লুকিয়ে মিষ্টি খেয়ে ধরা পড়ে গেলে এখনো হাবেভাবে না জানার ভান করি আর মনেপ্রাণে চেষ্টা করি যাতে স্পষ্টভাবে "আমি খাইনি" বলতে না হয়, তবে বকুনি খাবার ভয়ে অনেকসময় বলেও ফেলি, which I regret later, এইরকম আরো কত কিই। অন্যের ক্ষতি করে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মিথ্যে কথা বলা আর ক্ষমতা, যশ ও অর্থলাভের লোভের বশে রাজনীতি করা সমগোত্রীয় - যে কোনো ভদ্রলোকের জীবনে একেবারেই unacceptable - ওটা বর্জন করা গেছে অনেকদিন আগেই। কিন্তু মিথ্যেকে এখনো যাপন থেকে পুরোপুরি বর্জন করা যায়নি - তবে চেষ্টা চলছে।

Thursday, August 31, 2023

শি জিন পিং এবং জি২০

চীনের ১৮ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির গল্পটা কেবল গল্পই, আসলে ওটা খুব বেশি হলে ৭.৭৫ট্রিলিয়ন, তাতেও কিঞ্চিৎ জল মেশানো থাকতে পারে। দেঙ্গ জিয়াও পেং যে রাস্তায় হেঁটেছিলেন তাতে সত্যি সত্যিই চীন একদিন ১৮ট্রিলিয়নে পৌঁছত কিন্তু তাতে ধীরে ধীরে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র সিসিপির হাত থেকে টেক জারদের হাতে চলে যেত। মুস্কিল হলো কম্যুনিস্ট একনায়করা ক্ষমতা হারানোর ভয়ে চিরকাল সিঁটিয়ে থাকেন কারণ ওটাই ওঁদের এলিট বিলাসবহুল জীবনযাপনের একমাত্র চাবিকাঠি।

ফলে শি জিন পিং দেশের অগ্রগতির সর্বনাশ করে চীনকে আবার মাওয়ের রাস্তায় নিয়ে চলেছেন, অর্থনীতিতে যার ভয়ঙ্কর প্রতিফলন ইতিমধ্যেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চীনের ৭.৭৫ট্রিলিয়নের অর্থিনীতির তুলনায় রাষ্ট্রীয় ঋণ সাড়ে পাঁচ গুণ বেশি, তার ওপর জিরো কোভিড পলিসির জন্য সাপ্লায়ার হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতাও তলানিতে এসে ঠেকেছে, ফলে ভবিষ্যতে চীনের আবার উঠে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম। 

এমত অবস্থায় শি বা এই ধরণের অটোক্র্যাটদের হাতে ব্রাভাডো ছাড়া করে দেখানোর মতন খুব একটা কিছু থাকে না। তাই 'বসুধৈব কুটুম্বকম' শব্দের ওপর আপত্তি জানানো থেকে নিয়ে সম্ভাব্য জয়েন্ট স্টেটমেন্টের শব্দবন্ধ নিয়ে নানা ব্যাগড়া দেওয়া থেকে নিয়ে দালাল বুড়োখোকাকে লাদাখে পাঠিয়ে ভারতের কতটা জমি চীন কব্জা করে রেখেছে সেটা তার মুখ দিয়ে বলিয়ে কৌশলে নেহেরু, ইন্দিরা আর রাজীবের অপদার্থতাকে সেনা ও মোদীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করার পর ঠিক জি২০ শুরুর আগেই একটা মনগড়া ম্যাপ জারি করে খানিকটা হওয়া গরম করার চেষ্টা করে ভারত এবং আসিয়ান দেশগুলি থেকে চূড়ান্ত ঝাড় খেয়ে শেষে মিটিং ছেড়েই পালিয়ে গেলেন। 

এমনিতেও ভারতে চীনের ডাল আর গলছে না। দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিক্সের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মোদীজি শিকে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে যতক্ষণ না চীন গোটা ৩৪৪০ কিমি লম্বা এলএসি জুড়ে ২০১৩র আগের অবস্থানে ফিরে না যায়, ততক্ষন অন্য কোনো বিষয়ে আলোচনা হবে না। ইতিমধ্যে আদানি নিঃশব্দে বিশ্বজুড়ে ভারতের হয়ে ভারতীয় বেল্ট এন্ড রোড তৈরি করে চলেছেন, যা আটকাতে সোরস এবং চীন মরিয়া কিন্তু অপারগ। চীন আমাদের শত্রু নয়, সিসিপি আমাদের শত্রু - এটা যেন আমরা না ভুলি। যেদিন সিসিপির অবসান হবে সেদিন শত্রুতাও শেষ হয়ে যাবে। 

দেঙ্গের পরবর্তী প্রজন্মের নেতারা চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি থেকে নিজেদের ক্ষমতা আহরণ করতেন কারণ অবশেষে দুটো পয়সার মুখ দেখতে পেয়ে সাধারণ গরিব মানুষ খুশি ছিলেন। শি-এর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো হয়ে গেছে, কারণ ওঁর ভ্রান্ত পলিসির জন্য চীন এখন অর্থনৈতিক অবনতির শিকার এবং দেশজুড়ে ডিফ্লেশনের সাথে পাল্লা দিয়ে বেকারত্বও মাত্রাছাড়া। এই অবস্থা বেশিদিন চলতে পারেনা, শি বা সিসিপির পতন অনিবার্য। 

আসলে সর্বক্ষেত্রে বিফল শি জিন পিং আর বিশ্বনেতৃত্বের সামনে মুখ দেখানোর মতন অবস্থায় নেই, বিশেষত ৭.৮% হারে জিডিপি বৃদ্ধির সুফল ভোগকারী ভারতীয় জনগণের সামনে তো নয়ই, আমেরিকা এবং ইউরোপের সামনেও নয়। মাওবাদী কম্যুনিস্ট শি স্রেফ লজ্জায় ভারতে আসছেন না। একদিকে কম্যুনিসমের ব্যর্থতা আর অন্যদিকে গণতন্ত্রের সাফল্যের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত আজকের ভারত - জি২০ থেকে পালিয়ে গিয়ে না চাইতেও বিশ্বকে শি জিন পিং দুটি বিপরীতধর্মী মতাদর্শের ব্যর্থতা বনাম সাফল্যের বার্তাই দিয়ে গেলেন।

Friday, August 4, 2023

তিনটি শব্দ

ভারতকে ইন্ডিয়া বলা বন্ধ হোক;
পূজাকে প্রার্থনা বলা বন্ধ হোক;
পন্থকে ধর্ম বলা বন্ধ হোক।

- ভারত এক প্রাচীন রাষ্ট্র, ইন্ডিয়া একটি দেশ;
- পূজা মানে দেবার্চনা, প্রার্থনা মানে আবেদন;
- পন্থ মানে মতবাদ, ধর্ম মানে আদর্শ জীবন যাপনের জন্য মূল্যবোধভিত্তিক সনাতন দার্শনিক মানদণ্ড।

প্রতিদিনের ব্যবহারিক প্রয়োগে এক্ষুনি এই তিনটি শব্দের পরিবর্তন না হলে শাশ্বত ভারত খুব শিগগির শিগগির আবার জেগে উঠবে না।

এই পরিবর্তন হলে কি হবে?

১. ভারত মানে এক বিরাট ইতিহাস : ইতিঃ হ আস্ : 'ইতিঃ' মানে এই রকম, 'হ' মানে নিশ্চয়, 'আস্' মানে ছিল - ভারত বললেই জনমানসে তাঁদের পূর্বপুরুষের সত্যিকারের অতুল কীর্তি পুনর্জাগরিত হবে। সেই ইতিহাস কি রকমের? 'ধর্মার্থকামমোক্ষাণাম উপদেশ সমন্বিতম্, পূর্ববৃত্তকথোপিতম্, ইতিহাসম্ প্রচক্ষ্যতে' - ধর্ম অর্থ কাম ও মোক্ষলাভের উপদেশ সমন্বিত, পূর্বের বৃত্তান্ত যেখানে বলা আছে, সেটাই আসল ইতিহাস। অর্থাৎ ইংরেজ আর বামপন্থীদের দ্বারা তৈরি করা ইন্ডিয়ার দাসত্বের মেকি ইতিহাস নয়, প্রাচীন ভারতের ধর্ম আধারিত জীবনযাপনকারী জনগণের সত্যিকারের উপলব্ধি ও গৌরবগাথা, যা ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা ও databaseএর কাজ করবে। কোথাকার কোন আরাকোশিয়ার বাসিন্দা (বর্তমানে কান্দাহারের উত্তরপশ্চিম কোণে অবস্থিত আর্ঘ্যান্দব) মূলগ্রীকদেশীয় রাজদূত মেগাস্থেনিস পাটুলিপুত্রে (বর্তমানে পাটনা) সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের রাজসভায় এসে সম্রাটকে স্যান্ড্রকোটাস আর ভারতকে ইন্ডিয়া নাম দিয়ে দিলেন আর আমাদের সমস্ত পূর্বইতিহাস মুহূর্তের মধ্যে myth বা গল্প হয়ে গেল - মজা নাকি?

২. পূজাস্থল আর প্রার্থনাস্থল এক নয়, ফলে হিন্দুর মন্দির আর অন্য প্রার্থনাগৃহসমূহ সমগোত্রীয় নয়। প্রার্থনা তো এয়ারপোর্ট, হোটেল, রাস্তাঘাটে - যেখানে ইচ্ছা করা যায়, পূজা একমাত্র বিধিবদ্ধভাবে বিধিসম্মত উপায়ে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহেরই করা যায় এবং যতক্ষণ বিধিসম্মতভাবে তাঁর বিসর্জন না হচ্ছে, সেই পূজাস্থলের মালিক তিনিই থাকেন (আইনি ভাষায় বলে তিনি forever minor), তাতে মন্দিরের stucture থাকলো কি না থাকলো, মায় বিগ্রহ স্বয়ং সেখানে থাকলেন কি না থাকলেন, কিছু আসে যায় না। হিন্দুদের পূজা এবং বাকি মতাবলম্বীদের প্রার্থনার মধ্যে মূল পার্থক্যকে গুলিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রটি বুঝতে হলে হিন্দুদের মন্দিরের বিশেষত্বকে বুঝতে হবে, যা অন্য মতাবলম্বীদের প্রার্থনাগৃহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্যই নয়। মন্দির এমন একটি উর্যাক্ষেত্র যেখানে স্বয়ং ঈশ্বর বাস করেন, যেখান থেকে সেই উর্যা আহরণ করে মানুষ আধ্যাত্মপথে অগ্রসর হতে পারেন, সেটি ঈশ্বরের কাছে সুখ শান্তি সমৃদ্ধি ইত্যাদির জন্য আবেদনস্থল ও সামাজিক কর্মাদির জন্য মণ্ডপমাত্র নয়।

৩. সারা বিশ্ব জুড়ে বহু পন্থ অর্থাৎ religion এসেছে আর গেছে, পন্থ অর্থাৎ পথ চিরস্থায়ী নয়। আজকের পরিবেশে অনুসন্ধিৎসুর যেটিকে আদর্শ পথ বলে মনে হচ্ছে, কয়েক হাজার বছর পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অন্যদের তা নাও মনে হতে পারে; পারস্য, মেশোপটেমিয়া, আরব, গ্রীস, মিশর বা পেগানদের ইতিহাস ঘাঁটলেই এর প্রচুর উদাহরণ পাওয়া যায়। কিন্তু ধর্ম সনাতন, আদি এবং অন্তহীন, চিরসত্য, চিরনির্ভর। ধর্ম সেই সনাতন মূল্যবোধ যা সর্বযুগে সমাজকে ধারণ করে। তাই ধর্মের ওপর যদি আঘাত আসে তখন সর্বশক্তি দিয়ে তাকে রক্ষা করতে হয়, কারণ ধর্মহীন জীবন পাপের, জন্তুরও অধম। ধর্ম নষ্ট হলে সে ধর্মনষ্টকারীকেও নাশ করে তাই ঋষিরা বলছেন, 'ধর্ম এব হতো হস্তি ধর্মে রক্ষতি রক্ষিত:, তস্মাৎ ধর্মে ন হস্তব্যে মা নো ধর্মে হতো বধীৎ' - ধর্মকে যদি তুমি রক্ষা করো তাহলে ধর্মই তোমাকে রক্ষা করবে। আর যদি তুমি ধর্ম থেকে বিচ্যুত হও, ধর্মই তোমার নাশ করবে। পথ বদলায় কিন্তু ধর্ম বদলায় না, ঠিক যেমন খাদ্যাভ্যাস পাল্টায় কিন্তু ক্ষুধা বদলায় না।

হিন্দুস্থান প্রাচীনকাল থেকে হিন্দুদের বাসভূমি, সনাতন ধর্মের সূত্রগুলি অর্থাৎ পাপ-পুণ্য, ন্যায়-অন্যায়, সঠিক-বেঠিক, অধিকার-অনধিকার, কর্তব্য-অকর্তব্য, ভালো-মন্দ, গ্রহণযোগ্য-ত্যাজ্য ইত্যাদির মানদন্ড এখানেই উন্মোচিত হয়েছে এবং ব্যবহারিকরূপে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এই হিন্দু সংস্কৃতিতে মতান্তর কখনোই মনান্তরের কারণ হতে পারেনা এবং এখানে যত্র জীব তত্ৰ শিব। বেদ বলছেন "একং সৎ বিপ্রা বহুদা বদন্তি"(যা সৎ তা এক, পন্ডিতেরা তা নানা নামে অভিহিত করেন)। , যে পন্থ সনাতন ধর্মাশ্রয়ী নয়, অর্থাৎ পরপন্থদ্বেষী, সেই পন্থগুলির এই ভারতরাষ্ট্রে কোনো স্থান নেই।

Thursday, August 3, 2023

কে জানে কালী কেমন

মান্না দের অনবদ্য কণ্ঠে সাধক রামপ্রসাদের লেখা একটি কালীকীর্তন শুনছিলাম, 'কে জানে কালী কেমন? ষড়দরশনে না পায় দরশন ৷৷ মূলাধারে সহস্রারে সদা যোগী করে মনন ।' বড় সুন্দর, বড়ই সুন্দর এই গান। যোগের দিকটা ছেড়ে আমার কেবল মনে হলো সত্যিই তো, মা কালী আসলে দেখতে কেমন? তিনি কালো না নীল, তাঁর গলায় মুন্ডমালা না জবার মালা, তাঁর হাত দুটি না চারটি, তাঁর পরণে লাল বেনারসি না তিনি বস্ত্রহীনা, তাঁর পায়ে কি মল থাকে আর সেগুলি কি ঝম ঝম করে বাজে, ইত্যাদি। 

কালী কেমন জানতে গেলে তো সাধনায় অনেক দূর যেতে হবে, যেটা তাঁরই কৃপা ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি দেখতে কেমন, সেটি তো যাঁর যাঁর তাঁর তাঁর বিষয়। রামপ্রসাদের কাছে তিনি ছোট একটি মেয়ে হয়ে এসেছিলেন, যিনি তাঁকে বেড়া বাঁধতে সাহায্য করতেন। শ্রীশ্রীমায়ের কাছে তিনি এক আদিবাসী যুবতী কন্যা হয়ে এসেছিলেন, যিনি মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে অসুস্থতা চলে যায় আর শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে তিনি মাতৃরূপা, বোধে সদাজাগ্রতা, একাধারে জননী এবং জগ্গজননী। ভাবছিলাম আমাকে যদি মা কালী কোনোদিন কৃপা করে দর্শন দেন, কি রূপে তিনি আমার সামনে আসবেন, বা বলা ভালো কোন রূপে আমি তাঁকে দেখতে চাইবো, এইসব আরকি। 

যতক্ষণে এইসব ভাবছি ততক্ষণে রামপ্রসাদী শেষ হয়ে আমার হেডফোনে শ্রীমৎ স্বামী সর্বজ্ঞানন্দজি মহারাজের গাওয়া অন্য গান বাজতে শুরু করেছে,
'দেবী প্রসন্নবদনে করুণাবতারে দিব্যোজ্জ্বলদ্যুতিময়ী ত্রিজগজ্জনিত্রি।'
ব্যাস, যেই দেবীর এই অপূর্ব বর্ণনা কানে গেল, ঝপ করে ১৯১৩ সালে ব্রহ্মচারী গণেন্দ্রনাথের তোলা শ্রীশ্রীমায়ের সেই ছবিটা মনের মধ্যে বিদ্যুতের মতন জ্বলে উঠলো, যেখানে জয়রামবাটিতে পুরানো বাড়ির দাওয়ায় তিনটি কাঠের খুঁটির মাঝামাঝি জায়গায় তিনি বসে আছেন, পাদুটি উঠোনে পাতা, তার পায়ের দুই তর্জনীতে দুটি লোহার আঙ্গট, হাতদুটি কোলের উপর জোড় করা, দুহাতে ঠাকুরের উপহার দেওয়া গঙ্গাপাড়ে সীতামাঈর হাতে দেখা ছিলেকাটা বালাজোড়া, পরণে সরু লালপেড়ে সাদা শাড়ি, মাথায় ঘোমটা, গলায় দুছড়া রুদ্রাক্ষের জপমালা, মুখে স্মিত হাসি, দাওয়ায় মায়ের পেছনদিকে একটা খুঁটের ওপর গোটাকয়েক ধানের বস্তা। 

এই তো আমার মা কালীর সত্যিকারের রূপ, কল্পনা নয়, একেবারে জলজ্যান্ত, যাঁর পাদপদ্মে মাতৃময় শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর সমস্ত সাধনার ফল, মায় নিজের জপমালাটি পর্য্যন্ত নিবেদন করেছিলেন! জ্ঞানপথে এঁকে বুঝতে গেলে মুলাধার থেকে সহস্ররার পর্য্যন্ত উঠতেই হবে আর সহজে পেতে গেলে একবার সর্বশক্তি দিয়ে 'মা' বলে ডাকলেই হলো, কিছুতেই দূরে দূরে থাকতে পারবেন না, একেবারে দুহাত বাড়িয়ে আগলাতে চলে আসবেন। আহা, কি সুন্দরই না গানটা! তিনি ত্রিজগতের জননী, তাঁর শরীর থেকে এক দিব্য উজ্জ্বল দ্যুতি নির্গত হয়ে চারপাশে এক জ্যোতিবলয় সৃষ্টি করেছে (যা ওই ছবির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেও স্পষ্ট দেখা যায়), তিনি করুণার প্রতিমূর্তি আর শ্রীমুখমন্ডল জুড়ে যেন এক অপার্থিব প্রসন্নতা। আমার মন জানে কালী কেমন। 

মা আসলেই শক্তির বিভিন্ন রূপ ধারণ করে বিভিন্ন সময়ে হাতেগোনা কয়েকজন ভক্তকে কৃপাদর্শন দিয়েছেন, এটা কোনো কল্পনার বিষয় নয়, যদিও তিনি নিজের দৈবী স্বরূপকে ঢেকে রাখতে প্রাণপন চেষ্টা করতেন। এমনই একটি ঘটনা একবার শারদীয় দুর্গোৎসবের সময়কার। মা সেবার পুজোর ঠিক আগে বিষ্ণুপুরের সেনবাড়ি হয়ে কলকাতা যাত্রা করবেন। সঙ্গে বাঁকুড়ার বিভূতি ঘোষ, ডাক্তার মহারাজ প্রমুখ। এমন সময় সেন বাড়িরই অধীরেশ্বর নামের এক কিশোর বায়না ধরলে মায়ের সাথে কলকাতা যাবে। সে কখনো কলকাতার দুর্গাপ্রতিমা দেখেনি, এবারে প্রাণভরে দেখতে চায়। নানাভাবে ছেলেকে বোঝানো-ভোলানোর চেষ্টা হল। বাড়ির কর্তারা নানারকম সুখাদ্যের লোভ দেখালেন। তাতেও কাজ না হলে কড়া ধমক দেওয়া হলো কিন্তু অধীরেশ্বর একেবারেই নাছোড়বান্দা। তখন মা নিজেই তাকে অন্য একটি ঘরে নিয়ে গেলেন।

কিছুক্ষণ পরে মা বেরিয়ে এলে সবাই তো থ। যে কিনা তিষ্ঠোতে দিচ্ছিল না কাউকে, এরই মধ্যে একেবারে সুবোধ বালক হয়ে গেছে! মা হেসে বললেন, “ছেলেমানুষকে কি বকতে আছে? ওরা তো বায়না করবেই… আদর করে ভোলাতে হয়।” এর বেশ কয়েক বছর পর, মা তখন আর নশ্বর দেহে নেই, এক দুর্গাপুজোয় আবার সেই অধীরেশ্বর বিভূতিবাবুর গৃহে এসেছেন। তাঁকে প্রতিমা দর্শনের জন্য ডাকা হলে তিনি বললেন, “জ্যাঠামশাই, আমি আর দুর্গাপ্রতিমা দর্শন করি না। শ্রীশ্রীমা যে জ্যান্ত দুর্গা দর্শন করিয়েছিলেন, সে মূর্তির পর আর কোনো মূর্তিই মনে ধরে না।”