Sunday, January 30, 2022

দৌড়ে লাভ নেই

যে কোনো সংসারী মানুষ দৈনন্দিন জীবনে achievement আর engagement শব্দ দুটির দ্যোতনা সঠিকভাবে যেদিন অনুধাবন করতে পারবেন, সেইদিনই তাঁর thought process-এ সর্বাঙ্গীন পরিবর্তন আসতে বাধ্য। কিন্তু আজকের এই cut throat দুনিয়ায় সেই রাস্তা শুরু থেকেই বন্ধ করে রাখা হয়। এখন আমাদের অধিকাংশকেই ছোটবেলা থেকে শেখানো হয় you got to be an achiever, তাতে আখেরে শরীর এবং মনের যে কি দৈন্যদশা হবে সেটা নিজেরা ভুক্তভোগী হিসেবে বড়রা খুব ভালো করেই জানেন অথচ ইঁদুর দৌড়ের করুণ পরিণতির হুঁশিয়ারী তাঁরা ইচ্ছা করেই আমাদের দেন না, ওটা আমাদের ঠেকে শিখতে হয়।


দৌড়োতে দৌড়োতে একসময় হাই স্ট্রেস, হাই এংক্সাইটি, হাই ব্লাড প্রেসার, হাই সুগার, হাই ক্লোরোষ্ট্রল, হাই ইউরিক এসিড - তারপর একদিন বুকে যন্ত্রণা, স্টেন্ট, ওপেন হার্ট সার্জারি, তারপর আবার দৌড়, তারপর একদিন ব্রেন স্ট্রোক, পার্শীয়াল প্যারালাইসিস, কিছুদিন পর সবার অবহেলা, শেষে বলো হরি, হরিবোল। ব্যাস শেষ, achievement-এর খেল খতম। বাড়ি, গাড়ি, সম্মান, প্রতিপত্তি, সামাজিক স্বীকৃতি সব এখানেই পড়ে রইলো, আমি যে আসলে কে, আমার আসল কর্তব্য যে কি ছিল, কিছুই বুঝলাম না, পঞ্চভূতে মিশে গেলাম। 


পরের জন্মে হয়তো আমারই বানানো বাড়িতে, আমারই কেনা দামি দামি ফার্নিচার আমারই ছেলেমেয়েরা কাবাড়ি ডেকে জলের দরে বিক্রি করে দিচ্ছে আর আমিই হয়তো সেই কাবাড়ির শরীর নিয়ে তাদের সঙ্গে চূড়ান্ত দর কষাকষি করছি - এখন দুপয়সা বেশি কামাতে পারলে সেটাই আমার এই মুহূর্তের achievement - এই তো অঙ্ক, নাকি অন্য কিছু? আর যাঁরা পুনর্জন্ম মানেন না তাঁদের কঙ্কাল বাক্সবন্ধি হয়ে মাটির নিচে পড়ে থাকবে, কবে পৃথিবী ধ্বংশ হয়ে last judgement day আসবে, সেই আশায়। মোদ্দা কথা হলো, ঈশ্বর যে কারণে মানুষের শরীর, মানুষের ব্রেন আর সোজা শিরদাঁড়া দিয়েছিলেন, সেটার ঠিকঠাক ব্যবহার কি আমরা করতে পারলাম?


তার মানে কি জাগতিক বিদ্যার প্রয়োজন নেই, জাগতিক জ্ঞান প্রয়োগের প্রয়োজন নেই, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রয়োজন নেই, কাজে পারদর্শিতার প্রয়োজন নেই, সংসার প্রতিপালনের প্রয়োজন নেই, নাকি দেশের ও দশের যাতে উপকার হয় সেরকম কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখার প্রয়োজন নেই - সবকিছুরই প্রয়োজন আছে। শরীর যখন আছে তখন শরীরের চাহিদাও আছে আবার মনের চাহিদাও আছে, তাকে না মিটিয়ে উপায় নেই। আমাদের শাস্ত্রেই বলেছে 'ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ', in that order চতুর্বিদ সাধনা পদ্ধতি। কিন্তু এইখানেই নির্লিপ্ততার শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাটা সবচেয়ে বেশি, যে শিক্ষাটা আমাদের বড়রা আজকাল আর আমাদের দেন না কারণ তাঁরা নিজেরাই ধর্মহীন, পথভ্রষ্ট। 


এখানেই engagement-এর প্রশ্ন আসে। আমি কাজে লেগে থাকবো, অবশ্যই থাকবো। কিন্তু কাজ আমাতে লেগে থাকবে, সেটা হতে দেবো না। Pressure নেবো, অবশ্যই নেবো, কিন্তু সেটা শুধুমাত্র হাতের কাজটিকে আরো সুষ্ঠভাবে করার জন্য, এই ভেবে যে তাতে কোনো না কোনো সময়ে কারো না কারো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপকারই হবে। এই ভাব নিয়ে এগোলে কি হয়, 'আমি কিছুই achieve করলাম না, আমার ভেতরে যিনি বসে আছেন, তিনিই পরিস্থতি সৃষ্টি করে আমাকে দিয়ে করিয়ে নিলেন, ফলাফলের ভার বাবা তাঁর জিম্মায়' - এরপর আর কোনো after effect-এর বোঝা ঘাড়ে চেপে থাকেনা। যেহেতু গোটা প্রক্রিয়াতে আমার কোনো stake নেই, ফলে আমার পাওয়ারও কিছু নেই, হারাবারও কিছু নেই, আমি নিমিত্ত মাত্র। 


আমার নিজের আসল কাজ হলো নিজের স্বরূপকে খোঁজা। এই জীবনে ওই জায়গাটায় যদি একটুও এগোনো যায়, সেটাই সত্যিকারের achievement কারণ তার ফল জন্মের পর জন্ম ধরে আমার সঙ্গেই থাকবে। বাকি, যা থাকবে না তার জন্য প্রাণপাত করে লাভ কি? ঠাকুর গল্পচ্ছলে শিক্ষা দিচ্ছেন, "ভাঁড়ারে একজন আছে, তখন বাড়ির কর্তাকে যদি কেউ বলে, মহাশয় আপনি এসে জিনিস বার করে দিন। তখন কর্তাটি বলে, ভাঁড়ারে একজন রয়েছে, আমি আর গিয়ে কি করব! যে নিজে কর্তা হয়ে বসেছে তার হৃদয়মধ্যে ঈশ্বর সহজে আসেন না"।

দাস আমি

 অহংকার বড় মারাত্মক বস্তু। একটু ভালো গান গাইলাম বা ভালো রাঁধলাম বা ভালো লিখলাম বা ভালো খেললাম বা একটু better than average কোনো গুণ আছে, লোকে একটু সুখ্যাতি করে, ব্যাস, অমনি মনের মধ্যে 'আমি' 'আমি' 'আমার' 'আমার' শুরু হয়ে গেল। আমাদের মতন যাঁরা সাধারণ সংসারী মানুষ, তাঁদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই এমনটা হয় - অহংবোধহীন হয়ে সুখ্যাতি handle করা বোধহয় পৃথিবীর কঠিনতম কাজ। আর না করতে পারলেই bloated ego তৈরি হয়ে সজ্জন ব্যক্তিকেও একেবারে পাষন্ড বানিয়ে ছাড়ে। একে avoid করার কি উপায় নেই? সাধুরা বলছেন উপায় আছে। এক, ঠাকুর কৃপা করে আমাকে দিয়ে একটা ভালো কাজ করিয়ে নিলেন যা ঠাকুরেরই সন্তানদের তৃপ্তি দিলো - এটা মনে করে ঠাকুরের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা, আর দুই, ঠাকুর নানাজনের মধ্যে দিয়ে ভোক্তারূপে আমার কাজের আস্বাদ গ্রহণ করে আমায় কৃপা করলেন - এই ভেবে অনন্দলাভ করা। মোদ্দা কথা হলো ঠাকুরের ইচ্ছা ছাড়া গাছের পাতাটিরও নড়বার যো নেই জেনে আমার মধ্যে constructive যা কিছু আছে, মানুষকে তৃপ্তি দেওয়ার যেটুকুই শক্তি আছে, সব ভগবানের ইচ্ছা এবং তাঁর অহেতুকি কৃপাতেই তৈরি হয়েছে, এতে অহংকারযুক্ত বা উপাধিযুক্ত 'আমি'-র বিন্দুমাত্র ভূমিকা নেই - ক্রমাগত এটা নিজেকে মনে করিয়ে যাওয়া। 


শুকনো জ্ঞান এক জিনিষ আর আত্মিক উপলব্ধি একেবারে অন্য এক জিনিষ, bookish knowledge and deep intellectual understanding-এর মধ্যে বিস্তর ফারাক। জানি যে এই দেহ-মন অনিত্য অর্থাৎ অসত্য আর ঠাকুরই একমাত্র নিত্য অর্থাৎ একমাত্র সত্য, জানি যে এই দেহভিত্তিক identity-র মৃত্যু অবধারিত - আগেও বহুবার মরেছি আর ভবিষ্যতেও বহুবার মরবো, তবু 'আমি'ভাব যায় কই? কেউ হয়তো একটু কটুকথা বললো, গায়ে না মাখলেই হয়, সেখান থেকে চুপচাপ হেঁসে সরে আসলেই ল্যাটা চুকে যায়, তা না, তার সঙ্গে চেঁচামেচি জুড়ে দিলাম আর রাতে স্বপ্নে কোথায় ঠাকুরের সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরের চাতালে ঘুরে ঘুরে দেবসান্নিধ্যে ধন্য হবো, না তার বদলে সকাল থেকে মাথায় সেই অপমানের ভারী বোঝাটা বয়ে বয়ে ঘাড়ে মাথায় ব্যাথা, ঘুমই আর আসতে চায় না! আমরা কি বুঝিনা যে নিজেকে কিভাবে conduct করলে আমাদের সবচেয়ে বেশি স্বস্তি হয়, সবধরনের equilibrium বজায় থাকে - সবই বুঝি কিন্তু অহংকার এসে অন্ধ করে দেয়। আসলে আমরা বেশিরভাগই খুব superfluous - তাই আমাদের সবটাই শুকনো জ্ঞান, আত্মিক উপলব্ধি আর ক'জনের?


ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব prescription দিচ্ছেন, “জ্ঞান কাকে বলে; আর আমি কে? ঈশ্বরই কর্তা আর সব অকর্তা — এর নাম জ্ঞান। আমি অকর্তা। তাঁর হাতের যন্ত্র। তাই আমি বলি, মা, তুমি যন্ত্রী, আমি যন্ত্র; তুমি ঘরণী, আমি ঘর; তুমি ইঞ্জিনিয়ার; যেমন চালাও, তেমনি চলি; যেমন করাও, তেমনি করি; যেমন বলাও, তেমনি বলি; নাহং নাহং তুঁহু তুঁহু”। বলছেন, "বিজ্ঞানী কেন ভক্তি লয়ে থাকে? এর উত্তর এই যে, ‘আমি’ যায় না। সমাধি অবস্থায় যায় বটে, কিন্তু আবার এসে পড়ে। আর সাধারণ জীবের ‘অহং’ যায় না। অশ্বত্থগাছ কেটে দাও, আবার তার পরদিন ফেঁক্‌ড়ি বেরিয়েছে"। আর একদিন আরো সহজভাবে বিশিষ্ঠ অদ্বৈত আর অদ্বৈতের পার্থক্য বুঝিয়ে বলেছেন, “রাম জিজ্ঞাসা করলেন, হনুমান, তুমি আমায় কিভাবে দেখ? হনুমান বললে, রাম! যখন ‘আমি’ বলে আমার বোধ থাকে, তখন দেখি, তুমি পুর্ণ, আমি অংশ; তুমি প্রভু, আমি দাস। আর রাম! যখন তত্ত্বজ্ঞান হয়, তখন দেখি, তুমিই আমি, আমিই তুমি।

“সেব্য-সেবক ভাবই ভাল। ‘আমি’ তো যাবার নয়। তবে থাক শালা ‘দাস আমি’ হয়ে।” 


আসলে আমাদের মতন জ্ঞানপাপীদের জন্য জ্ঞানের পথ বা যোগের পথ অত সহজ নয়। সেইজন্যই ঠাকুর ভক্তির ওপর ভয়ঙ্কর জোর দিতেন। বলতেন, "ভক্তের সাধ যে চিনি খায়, চিনি হতে ভালবাসে না।

“ভক্তের ভাব কিরূপ জানো? হে ভগবান, তুমি প্রভু, আমি তোমার দাস’, ‘তুমি মা, আমি তোমার সন্তান’ , আবার ‘তুমি আমার পিতা বা মাতা’। ‘তুমি পূর্ণ, আমি তোমার অংশ।’ ভক্ত এমন কথা বলতে ইচ্ছা করে না যে ‘আমি ব্রহ্ম'।”


আত্মবোধ বা ব্রহ্মজ্ঞান গভীর intellectual understanding এর বিষয়, ঠাকুরের অসীম কৃপা ছাড়া সম্ভবই নয়। কিন্তু 'আমি মায়ের সন্তান' - এটা ভাবতে তো আর কোনো কাঠখড় পোড়াতে হয়না। ইষ্টের সাথে সম্পর্ক পাতানোর তাই ভক্তি আর বিশ্বাসই বোধহয় সবচেয়ে সহজ উপায়। বিশ্বাস করতে হবে যে মায়ের কাছে ক্রমাগত আবদার করে গেলে মা একদিন না একদিন ঠিকই তা পূরণ করবেন। তাই ঠাকুর বলছেন, “তিনি মনকে আঁখি ঠেরে ইশারা করে বলে দিয়েছেন, ‘যা, এখন সংসার করগে যা।’ মনের কি দোষ? তিনি যদি আবার দয়া করে মনকে ফিরিয়া দেন, তাহলে বিষয়বুদ্ধির হাত থেকে মুক্তি হয়। তখন আবার তাঁর পাদপদ্মে মন হয়”। একজন সাধু বলেছিলেন যে রাতে শোয়ার সময় মনে মনে দৃঢ়ভাবে ভেবে নিতে যে বালিশে মায়ের চরণদুটি রয়েছে, আমি পায়ে মাথা ঠেকিয়ে শুলাম। খুব কাজে দেয় কিন্তু।

Thursday, January 20, 2022

প্রত্যাহার

রূপ রস শব্দ স্পর্শ আর গন্ধ, এ সবকটিই আমাদের জাগতিক আহারের রকমফের। যেই আমরা বুঝে যাই যে যথেষ্ট আহার হয়েছে, এর চেয়ে বেশি খেলে শরীর খারাপ করবে, আর খেয়ে কাজ নেই বাপু, তখনই প্রত্যাহার হয়। আহার হতে প্রত্যাহার। যেই প্রত্যাহার হলো অমনি আর পঞ্চ ইন্দ্রিয়র খাই খাই রইলো না, মানে উপভোগের প্রবৃত্তিই রইলো না আর প্রবৃত্তি না থাকলে প্রত্যাখ্যানও নেই, অর্থাৎ প্রত্যাশাপূরণ হওয়ার আকাঙ্খা বা না হওয়ার বেদনা কোনোটাই নেই - ব্যস মনও সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে শান্ত হয়ে যায়। ঠাকুর বলছেন, “মন নিয়ে কথা। মনেতেই বদ্ধ, মনেতেই মুক্ত। মন যে-রঙে ছোপাবে সেই রঙে ছুপবে। যেমন ধোপাঘরের কাপড়। লালে ছোপাও লাল, নীলে ছোপাও নীল, সবুজ রঙে ছোপাও সবুজ। যে-রঙে ছোপাও সেই রঙেই ছুপবে।"


তবে মনকে কিছু না কিছু নিয়ে তো থাকতে হবে যতক্ষণ না সে নিবৃত্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছচ্ছে, ফলে বাইরের দরজা বন্ধ পেয়ে উপায়ন্তর না দেখে সে তখন internal exploration-এ নেমে পড়ে। এটা একমাত্র গুরুর আশীর্বাদে আর ভগবৎ কৃপায় হয়। ঠাকুর বলছেন, "বদ্ধজীব হয়তো বুঝেছে যে, সংসারে কিছুই সার নাই; আমড়ার কেবল আঁটি আর চামড়া। তবু ছাড়তে পারে না। তবুও ঈশ্বরের দিকে মন দিতে পারে না!" আবার বলছেন,“সাধারণ লোক সাধন করে, ঈশ্বরে ভক্তিও করে। আবার সংসারেও আসক্ত হয়, কামিনী-কাঞ্চনে মুগ্ধ হয়। মাছি যেমন ফুলে বসে, সন্দেশে বসে, আবার বিষ্ঠাতেও বসে। (সকলে স্তব্ধ)

“নিত্যসিদ্ধ যেমন মৌমাছি, কেবল ফুলের উপর বসে মধুপান করে। নিত্যসিদ্ধ হরিরস পান করে, বিষয়রসের দিকে যায় না।” 

সেইজন্যই ভগবানের অহেতুকি কৃপা চাই, একমাত্র তিনিই নিরাশক্তির কাঁচি দিয়ে কুচ করে জীবের আসক্তির বন্ধনটি কেটে দিতে পারেন, সবই তো তাঁর খেলার বিষয়। তখন মন অন্তর্মুখী হয়।


যতক্ষণ surface-এ মন ঘোরাঘুরি করছিল ততক্ষণ সব ঠিক ছিল, সবটাই normal, relative আর superfluous ছিল, যেই সে অন্দরে ঝাঁপ দিলো, তখন সে আর তল খুঁজে পায়না। মন যেই বুঝতে পারে যে অচেনা terrain-এ সে dive মেরেছে, তখন বাঁচার জন্য হাতের কাছে যা পায় তাই আঁকড়ে ধরে freefall আটকাতে চায়, নানা রকম উদ্ভট চিন্তা উৎপন্ন করে জীবকে distract করতে চায় কারণ যতক্ষণ খিদে ততক্ষণই রাঁধুনির প্রয়োজন। এখানেই আসল খেলা, মনকে নিজের বশে আনা। এর technique-টিও গুরু শিখিয়ে দেন। দীর্ঘদিনের অন্তর্মুখী হওয়ার অনভ্যাসবশতঃ প্রথম প্রথম খানিকটা distraction হয়ও, রোক করে লেগে থাকলে ঠিক কেটে যায়। একটা সময় গিয়ে মন বোঝে যে সে যাকে এতদিন আহার জোটাতো, তিনিই নিজেকে প্রত্যাহার করেছেন, এখন আর সে driving force নয়, সে তাঁর subservient। তখন সে finally চুপ করে।


তিনি ততক্ষণে এমন এক স্বাদের সন্ধান পেয়েছেন যা মায়ার আবরণে ঢাকা মন এতদিন এত কান্ড করেও তাঁকে দিতে পারেনি। তখন মন surrender করে। তখন সে শান্ত হয় আর উপাধি চাপিয়ে চাপিয়ে যে মিথ্যে অহংকারের মূর্তি তৈরি করেছিল, গুরুর কৃপায় সেটা ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করে। তখন ভিক্ষা দেওয়ার বদলে ভিক্ষা চাইতে ইচ্ছে করে, আর মনে হয় প্রত্যাখ্যাত হলে দারুন সুখ হবে, গুমোর ভাঙবে, মাথা নুইবে। নাম-রূপধারী 'আমি' যত ধাক্কা খাবে তত অন্তর আনন্দে পরিপূর্ন হবে। ঠাকুর বলছেন, "আমি মলে ঘুচিবে জঞ্জাল"। তার মানে কি ভোগ শেষ হয়ে গেল? হয়তো না। তাহলে কিভাবে সংসারে থাকতে হবে? ঠাকুর বলছেন, "তারা নিষ্কামকর্ম করবার চেষ্টা করবে। হাতে তেল মেখে কাঁঠাল ভাঙবে। বড় মানুষের বাড়ির দাসী সব কর্ম করে, কিন্তু দেশে মন পড়ে থাকে; এরই নাম নিষ্কামকর্ম। এরই নাম মনে ত্যাগ। তোমরা মনে ত্যাগ করবে। সন্ন্যাসী বাহিরের ত্যাগ আবার মনে ত্যাগ দুইই করবে।"


যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধ্যান, ধারণা, সমাধি - এই অষ্টযোগের মধ্যে প্রত্যাহারই হলো key element, তবে একজন সংসারীর পক্ষে তার জন্য আগে ধর্মপথে থেকে যথেষ্ট অর্থ আর কামনা উপভোগ করার experience থাকলে খেলা একটু বেশিই জমে, নইলে আর প্রত্যাহারের মজা কই? বাকি ধর্মপথে থাকার criterion ইত্যাদি হলো নার্সারী ক্লাসের সিলেবাস, ওসব করেটরেই মন এই অবস্থার জন্য প্রস্তুত হয়। ঠাকুর শ্রীমকে বলছেন,

“ব্রাহ্মণ ভোজনের সময় দেখ নাই? প্রথমটা খুব হইচই। পেট যত ভরে আসছে ততই হইচই কমে যাচ্ছে। যখন দধি মুণ্ডি পড়ল তখন কেবল সুপ-সাপ! আর কোনও শব্দ নাই। তারপরই নিদ্রা  - সমাধি। তখন হইচই আর আদৌ নাই।...

“ঈশ্বরের যত নিকটে এগিয়ে যাবে ততই শান্তি। শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ প্রশান্তিঃ। গঙ্গার যত নিকটে যাবে ততই শীতল বোধ হবে। স্নান করলে আরও শান্তি।...

“মন আসক্তিশূন্য হলেই তাঁকে দর্শন হয়। শুদ্ধ মনে যা উঠবে সে তাঁরই বাণী। শুদ্ধ মনও যা শুদ্ধ বুদ্ধিও তা - শুদ্ধ আত্মাও তা। কেননা তিনি বই আর কেউ শুদ্ধ নাই।

“তাঁকে কিন্তু লাভ করলে ধর্মাধর্মের পার হওয়া যায়।”

এই বলিয়া ঠাকুর সেই দেবদুর্লভকন্ঠে রামপ্রসাদের গান ধরিলেন:

আয় মন বেড়াতে যাবি।

কালী-কল্পতরুমূলে রে, চারি ফল কুড়ায়ে পাবি ৷৷

প্রবৃত্তি নিবৃত্তি জায়া নিবৃত্তিরে সঙ্গে লবি।

বিবেক নামে তার বেটারে তত্ত্বকথা তায় শুধাবি ৷৷


ঠাকুর বলছেন, "মায়া দুই প্রকার - বিদ্যা এবং অবিদ্যা। তার মধ্যে বিদ্যা মায়া দুই প্রকার - বিবেক এবং বৈরাগ্য। এই বিদ্যা মায়া আশ্রয় ক'রে জীব ভগবানের শরণাপন্ন হয়। আর অবিদ্যা মায়া ছয় প্রকার - কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ এবং মাৎসর্য। অবিদ্যা মায়া 'আমি' ও 'আমার' জ্ঞানে মনুষ্যদিগকে বদ্ধ করে রাখে। কিন্তু বিদ্যা মায়ার প্রকাশে জীবের অবিদ্যা একেবারে নাশ হয়ে যায়।" যাঁকে বলছেন সেই শ্রীমর জীবনীকার লিখেছেন, 'তিনি ঘরেই থাকতেন - কিন্তু গবাক্ষপথে দেখতেন অনন্তকে। আশ্রয়ের মধ্যে নিরাশ্রয়ের সাধনা করতেন। তাই মাঝে মাঝে মধ্য রাত্রে যখন গোটা শহর ঘুমিয়ে পড়ত, চারদিকে নেমে আসত রহস্যময় নীরবতা তখন তিনি ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতেন হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতেন সেনেট হলের খোলা বারান্দায়। সেখানে আশ্রয়হীন ভিক্ষুকদের সঙ্গে রাত্রি যাপন করতেন। আবার ভাবতেন, আমি একা এই পৃথিবীতে। তিনি চলে যেতেন গঙ্গাতীরে, ঈশ্বর-জ্যোতি দেখার জন্য তাকিয়ে থাকতেন সাধুদের দিকে। আবার তীর্থযাত্রীদের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করতেন, তাদের মুখে কোথায় লেখা আছে আনন্দের বার্তা।' এই হলো কালী-কল্পতরুমূলে বেড়াতে গিয়ে চারটি বেদের জ্ঞান কুড়িয়ে নেওয়া। দেখি প্রিয় কন্যার মৃত্যুসংবাদ বহনকারী টেলিগ্রাম পড়ে চুপচাপ মুড়ে পকেটে রেখে দিয়ে কাশীর অদ্বৈত আশ্রমে যথারীতি ভাগবতের ক্লাস নিচ্ছেন। আহা, কি দিব্য জীবন!

Wednesday, January 19, 2022

আফগানিস্তান ও অন্যান্য

পাকিস্তানের NSA ডঃ মঈদ ইউসুফের আজ আফগানিস্থান যাওয়ার কথা ছিল, যাত্রা পিছিয়ে গেছে। সরকারিভাবে জানানো হয়েছে যে কাবুলে আবহাওয়া খারাপ কিন্তু কাবুল এয়ারপোর্টে আমেরিকানরা একেবারে অত্যাধুনিক ILS লাগিয়ে গিয়েছিল, ফলে এই বাহানা ধোপে টেকে না, এটা নেহাতই মুখরক্ষার জন্য বলা হচ্ছে। আসল খবর ইরানের গোয়েন্দা সূত্র দিয়েছে। 


বাইডেনসাহেব অবশেষে বুঝেছেন যে হটাৎ করে সরে গিয়ে তিনি চীন এবং রুশের জন্য ফাঁকা মাঠ উপহার দিয়ে দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের মধ্যে পাস আদানপ্রদান করতে করতে দিব্যি ফাঁকা গোলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তালিবানকে চাপে রাখতে একদিকে রুশ আপাতত তালিবান বিরোধী পাঞ্জশের ঘাঁটির যোদ্ধাদের সৈনিক মদত দিচ্ছে, অন্যদিকে চীন পাকিস্তানকে commission agent বানিয়ে, ডুরান্ড লাইনের ঝামেলাকে backburner-এ রাখিয়ে, পয়সার বিনিময়ে আফগানিস্তানের লিথিয়াম মাইনগুলো হাতানোর ধান্দা করছে। এদিকে ইরান আবার তালিবান আর আহমেদ মাসুদদের মধ্যে একটা working relationship তৈরি করাবার চেষ্টা করছে আর গতবছর আগস্টের শেষে তেহেরানে দুইপক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনাও হয়েছে। 


এই খেলায় সবকটা দেশের চাহিদা কিন্তু আলাদা আলাদা। ইরান চাইছে তালিবানের সাথে Northern Alliance-এর একটা সমঝোতা করিয়ে দিয়ে goodwill create করে যদি চাবাহার থেকে সেন্টাল এশিয়ার দেশগুলি অবধি অবাধ বাণিজ্য চালানো যায়, পাকিস্তান চাইছে চীনের সঙ্গে তালিবানের একটা বাণিজ্য চুক্তি করিয়ে দিয়ে চীনা ডলার পাইয়ে দেওয়ার বদলে যদি তালিবানকে দিয়ে ডুরান্ড লাইনের লড়াই postpone করানো যায়, রুশ চাইছে Northern Allienceকে তোল্লা দিয়ে আফগানিস্থানের ভেতরে হওয়া গরম করে তালিবানকে চীনের দিকে ঝুঁকিয়ে যদি ঋণদাতাকে মদত করা যায়, আর চীন চাইছে কিভাবে এর ওর তার ঘাড়ে বন্দুক রেখে নিজের কাজ সস্তায় হাসিল করা যায়। 


মঈদ ইউসুফ চীনের দালালি করতেই আফগানিস্তান যাচ্ছিলেন, তাহলে হটাৎ আটকে গেলেন কেন? আসলে অকস্মাৎ ১৫ই জানুয়ারি ইমরান খান আর পুতিনের টেলিফোনালাপের পরেই রুশি বিদেশমন্ত্রক পাঞ্জশেরে তাদের কোনো interest নেই বলে বয়ান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের মনে হয়েছিল খেলা ঘুরছে। আজ বোঝা গেল পর্দার পেছনে আসলে কি হচ্ছিল। তালিবানের বিস্তর টাকা চাই, আর এখন যে তাদের ডলার দেবে, তালিবান তারই গুণ গাইবে। ইরানি এজেন্সি বলছে আমেরিকা তলায় তলায় তালিবানকে টাকা দিতে রাজি হয়ে গেছে, কারণ ISIS, চীন আর রুশকে আটকাতে আফগানিস্তান আবার তাদের কাছে important হয়ে উঠছে। আজ তেহেরিক এ তালিবান এ পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী ইসলামাবাদে ঢুকে পুলিস মেরেছে, কাল যদি অন্য এক faction জিন জিয়াং-এ ঢুকে উগুরদের তাতাতে থাকে, আশ্চর্য্যের কিছু নেই।


দোহাতে বহুদিন ধরেই তালিবান আর আমেরিকার মধ্যে কথাবার্তা চলছে, সেটা গতবছর ১৫ই আগস্টের আগেও অনেকদিন ধরে চলেছিল। এই যে ভারত ইরানের মাধ্যমে কখনো আফগানিস্তানে ওষুধ পাঠাচ্ছে, কখনো গম, কখনো ভ্যাক্সিন, সেও আগের মতোই আমেরিকার দেখানো রাস্তাতেই হেঁটে। এখন, ইরান কেন ভারতকে সাহায্য করছে? আমেরিকা আর ইরানের মধ্যে সমঝোতা হয়ে গিয়ে sanctions withdrawn হয়ে গেলে দুদেশের মধ্যে তেল ও অন্যান্য বাণিজ্য সহজতর হয়, সেই কথা মাথায় রেখে ভারত দুইদেশেরই বন্ধু হিসেবে এক unofficial মধ্যস্থতাকারীর সদর্থক ভূমিকা পালন করতে পারে, সেই আশায়। 


দুনিয়ার অন্যপারে রুশ যতই ইউক্রেনকে ভয় দেখাক, পুতিনের সাধ্য নেই attack করার। করলে পুতিনের অবস্থা হিটলারের চেয়েও খারাপ হবে আর ইউরোপে যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে চীন যদি তাইওয়ানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, বিশ্বযুদ্ধ এড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়বে, সেটা পুতিন খুব ভালো করেই জানেন। এই বোকামি উনি করবেন না, যদিও আমেরিকা আর NATO-কে multifront war-এ ফাঁসিয়ে দেওয়ার আবহাওয়া সৃষ্টি করে উনি একদিকে চীনের ভূরাজনৈতিক সুবিধা করে দিচ্ছেন আর অন্যদিকে NATO-কে রুশের সীমানা থেকে কিছুটা দূরে রাখার দরও কষছেন। আর সেই সাথে যদি ফ্রান্সের সাথে Nord Steam 2 গ্যাস পাইপলাইনটা এই ধাক্কায় operationalise করিয়ে নেওয়া যায় তো সোনায় সোহাগা।


এতসবের মধ্যে ভারত কি করবে? ভারত wicket to wicket খেলবে, কোনো চৌকা ছক্কা হাঁকাবে না। ভারতের পাখির চোখ $৫ ট্রিলিয়ন economy; যা করার আমেরিকা করবে, ভারত কেবল নিজের আখের গোছাবে। সাউথ চায়না সি জুড়ে চীনের শত্রুদের ব্রাহ্মস আর অন্যান্য মিসাইল সিস্টেম বেচে মুনাফাও কামাবে আবার চীনের সাথে $১২৫ বিলিয়নের trade-ও করবে - আমরা বানিয়া, আপত্তি আছে?

Tuesday, January 18, 2022

গুরুমন্ত্র জপের ফল

ঠাকুর যখন সূক্ষ্মশরীরে ইষ্ট হয়ে হৃদয়ে বাস করেন তখন তাঁর কৃপা ছাড়া তাঁকে হয়তো স্থূলচোখে দেখা যায়না। কিন্তু ঠাকুর যখন গুরুমহারাজরূপে ইষ্টমন্ত্র দান করেন আর আমরা মন প্রাণ দিয়ে তা ধারণ করার চেষ্টা করি, তখন গুরুরূপী সশরীরী ঠাকুরকে আমরা পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করি, তিনি আমাদের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেন, তিনি তাঁর শ্রীমুখ দিয়ে মন্ত্র দান করেন আর কানে কানে আমাদের মন্ত্র উচ্চারণ শোনেন, তাঁকে আমরা দর্শন, স্পর্শন, শ্রবণ, মনন সবকিছু করতে পারি, তাও স্থূল শরীরে। তাই ঠাকুর শুধুই ধ্যানগম্য, এই কথাটি বোধহয় সঠিক নয়। আর ঠাকুর ও শ্রীশ্রীমা যেহেতু অভিন্ন, ফলে সঙ্ঘগুরুর মধ্যে আমরা অদ্বৈত মহাশক্তির উপস্থিতি টের পাই।


আমরা যারা ঠাকুরের আশ্রিত সন্তান, আমরা প্রত্যেকেই আমাদের দীক্ষাগুরু এবং সমস্ত সঙ্ঘগুরুর মধ্যেই শ্রীশ্রীমা ও ঠাকুরকে প্রত্যক্ষরূপে সামনে পাই এবং তাঁদের মাধ্যমেই ঠাকুর-মা বিভিন্ন শরীর ধারণ করে আমাদের নিরন্তর দর্শন দেন। গুরুরূপে ঠাকুর যে বীজমন্ত্র দান করেন, তার মধ্যে এবং মাধ্যমেই তাঁর ইষ্টরূপে প্রকাশ। শ্রীম বলতেন, 'তপস্যা কি আর আমরা করি, গুরুই করেন, আমাদের মধ্য দিয়ে। এও তাঁর একটা লীলা'। মন্ত্র জপতে জপতে একসময় তিনি স্বরূপে ভক্তের অন্তরটিকে বোধে আলোকিত করে দেন, ফলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে ঠাকুর স্বয়ং এবং তাঁর পুণ্য নাম এক এবং অভিন্ন। জপে মন বসে গেলে আমাদের যে আনন্দবোধ হয়, যার রেশ ধ্যান জপ শেষে উঠে যাওয়ার পরেও বেশ কিছুক্ষণ আমাদের মাতিয়ে রাখে, সেই আনন্দ অন্তরে বসবাসকারী ওঁর কাছ থেকেই আসে কারণ আনন্দ, প্রেম, করুণা, বাৎসল্য ইত্যাদি কোনোটাই জাগতিক অনুভূতি নয়, ঐশ্বরিক। 


পরম পূজ্যপাদ স্বামী বিরজানন্দজী এই প্রসঙ্গে বলছেন, "জপের সময় নাম-নামী অভেদ ভেবে তাঁরই চিন্তা করতে হয়। যে নাম, সেই নামী, অর্থাৎ নাম করলেই যাঁর নাম তাঁকে বোঝায়। কোনো কাজের জন্য যদি কাউকে নাম ধরে ডাকো তো সঙ্গে সঙ্গে তার মুর্তিটাও মনের সামনে ভেসে ওঠে এবং সে সাড়াও দেয় বা আসে। জপও ঠিক তাই, যদি ঠিক হয়, তাতেই মন লেগে থাকে। আর এটুকু বিশ্বাস থাকা চাই যে, আমার ডাক তাঁর কাছে পৌঁছুচ্ছে, তাঁর সাড়া পাবোই।" (পরমার্থ প্রসঙ্গ, উপদেশ সংখ্যা ১৩৭)


জপের মুক্তিদায়িনী শক্তি সম্পর্কে জগজ্জননী শ্রীশ্রীমা তো একেবারে স্পষ্ট করে বলছেন, "অভ্যাসের কত শক্তি! জপ অভ্যাস করতে করতে মানুষ সিদ্ধ হয়। জপাৎ সিদ্ধি, জপাৎ সিদ্ধি, জপাৎ সিদ্ধি! সংখ্যার দিকে মন রেখে জপ করলে সংখ্যার দিকে মন থাকে, এমনি জপ করবে।"

"জপ ধ্যান করতে করতে দেখবে ঠাকুর কথা কবেন। মনে যে বাসনাটি হবে, তখুনি পূর্ণ করে দেবেন। কি শান্তি প্রাণে আসবে।"

(শ্রীশ্রীমায়ের পদপ্রান্তে)


আর শ্রীমর মাধ্যমে স্বয়ং ঠাকুর জপের ফল সম্পর্কে আমাদের মতন সংসারীদের সরাসরি উপদেশ দিচ্ছেন, "জপ করা কি - না নির্জনে নিঃশব্দে তাঁর (ভগবানের) নাম করা। একমনে নাম করতে করতে - জপ করতে করতে, তাঁর রূপ দর্শন হয় - তাঁর সাক্ষাৎকার হয়। শিকলে বাঁধা কড়িকাঠ গঙ্গার গর্ভে ডুবানো আছে - শিকলের আরেক দিক তীরে বাঁধা আছে। শিকলের এক একটি পাব ধরে ধরে গিয়ে ক্রমে ডুব মেরে শিকল ধরে যেতে যেতে ঐ কড়ি কাঠ স্পর্শ করা যায়। ঠিক সেই রূপ জপ করতে করতে মগ্ন হয়ে গেলে ক্রমে ভগবানের সাক্ষাৎকার হয়।.......জপ থেকে ঈশ্বর লাভ হয়। নির্জনে, গোপনে তাঁর নাম করতে করতে তাঁর কৃপা হয়। তারপর দর্শণ।"


রামপ্রসাদের একটি বিখ্যাত গান আছে, পরম পূজ্যপাদ স্বামী শিবানন্দজী মহারাজ এটি খুব বলতেন:

মন বলি ভজ কালী ইচ্ছা হয় তোর যে আচারে,

গুরুদত্ত মহামন্ত্র দিবানিশি জপ করো।।

শয়নে প্রণাম জ্ঞান, নিদ্রায় কর মাকে ধ্যান,

নগর ফের মনে কর প্রদক্ষিণ শ্যামা মারে।।

যত শোন কর্ণপূটে, সবই মায়ের মন্ত্র বটে,

কালী পঞ্চাশবৎবর্ণময়ী বর্ণে বর্ণে নাম ধরে।।

চর্বচোষ্য লেহ্য পেয়, যত রস এ সংসারে

আহার কর মনে কর আহুতি দিই শ্যামা মারে।।

আনন্দে রামপ্রসাদ রটে, মা বিরাজেন সর্বঘটে,

রূপে রূপে যতরূপ, মা আমার সে-রূপ ধরে।।


মহারাজ আরও বলতেন, "ঠাকুর নিজেই বলে গেছেন, 'হেলায়, শ্রদ্ধায় যে আমার নাম করবে, তাকে হাত ধরে আমি মুক্তিধামে নিয়ে যাবো'। তাঁর বাক্য কখনো মিথ্যা হয় না।"




Sunday, January 16, 2022

মায়া ও প্রেম

যমুনার দুই কূল - যেন অনুকূল আর প্রতিকূল। তার একদিকে শ্রীকৃষ্ণ সন্তান, সখা, সংসারী আর অন্যদিকে সহায়, সম্বল, সম্রাট। যা একসময় অনুকূল তাই পরে প্রতিকূল হয়ে যায় - তিনি সেই যে ব্রজভূমি ছেড়ে চলে যান আর ফেরেন না। যেন যমুনার একদিকে শ্রীরাধা, অন্যদিকে রুক্মিণী। একজন শ্রীকৃষ্ণে সমাগতা, অন্যজন শ্রীকৃষ্ণের সহায়িকা। দুজনেই প্রেমিকা, দুদিকেই সম্পুর্ন সমর্পণ, কিন্তু দুজনের আত্মনিবেদনের পথ একেবারে আলাদা - একদিকে মধুরভাব আর অন্যদিকে দাস্যভাব। 


যেন যমুনার এককূলে অনুরাগ, অন্য কূলে আনুগত্য। এ যেন দুইপাশে দুটি স্পম্পূর্ণ আলাদা জগৎ, তাদের ধ্যেয় এক হলেও ধ্যানালোক আলাদা, মাঝে মনরূপী যমুনা জন্মজন্মান্তর ধরে বহতি। আসলে সবটাই মায়া, আর সেই মায়ার চিদাকাশ জুড়ে মায়াতীত সচ্চিদানন্দস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ। আসলে 'শূন্য' এবং 'পূর্ণ' যে একই বস্তু,  'অশব্দমস্পর্শমরূপমব্যয়মেকমেবাদ্বিতীয়ম্', এবং মায়া ছাড়া জগতের অস্তিত্ব নেই, ফলে ধর্মাধর্ম নেই আর মুক্তির অবকাশও নেই, সেই কথাই যেন যমুনার দুই তীরে প্রতীয়মান। এ যেন শুদ্ধ বাসনা আর অবাসনার মধ্যে সীমারেখা মিলিয়ে যাওয়ার খেলা। পরবর্তী অবতারে শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁর পার্ষদদের বারবার বলতেন “ছোট ছোট এক-আধটা বাসনা জোর করিয়া রাখিয়া তদবলম্বনে মনটাকে তোদের জন্য নিচে নামাইয়া রাখি! নতুবা উহার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি অখণ্ডে মিলিত ও একীভূত হইয়া অবস্থানের দিকে।” (লীলাপ্রসঙ্গ, ত্রয়োদশ অধ্যায়: মধুরভাবের সারতত্ত্ব)


ঠাকুরের পার্ষদ মায়ের দ্বারী পূজ্যপাদ স্বামী সারদানন্দজী মহারাজ প্রেমে ঐশ্বর্যজ্ঞানের লোপসিদ্ধির বিষয়ে লিখেছেন, 'প্রেমের স্বভাব পর্যালোচনা করিয়া একথা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, উহা প্রেমিকদ্বয়ের ভিতরে ঐশ্বর্যজ্ঞানমূলক ভেদোপলব্ধি ক্রমশঃ তিরোহিত করিয়া দেয়। ভাব-সাধনায় নিযুক্ত সাধকের মন হইতেও উহা ক্রমে ঈশ্বরের অসীম ঐশ্বর্যজ্ঞান তিরোহিত করিয়া তাঁহাকে তাঁহার ভাবানুরূপ প্রেমাস্পদমাত্র বলিয়া গণনা করিতে সর্বথা নিযুক্ত করে। দেখা যায়, ঐজন্য এই পথের সাধক প্রেমে ঈশ্বরকে সম্পূর্ণভাবে আপনার জ্ঞান করিয়া তাঁহার প্রতি নানা আবদার, অনুরোধ, অভিমান, তিরস্কারাদি করিতে কিছুমাত্র কুণ্ঠিত হন না। সাধককে ঈশ্বরের ঐশ্বর্যজ্ঞান ভুলাইয়া কেবলমাত্র তাঁহার প্রেম ও মাধুর্যের উপলব্ধি করাইতে পূর্বোক্ত ভাবপঞ্চকের মধ্যে যেটি যতদূর সক্ষম, সেটি ততদূর উচ্চভাব বলিয়া ঐ পথে পরিগণিত হয়।'


আর মায়ার বিষয়ে স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলছেন, “বেলের সার বলতে গেলে শাঁসই বুঝায়, তখন বীচি আর খোলা ফেলে দিতে হয়। কিন্তু বেলটা কত ওজনে ছিল ব’লতে গেলে শুধু শাঁস ওজন করলে হবে না। ওজনের সময় শাঁস, বীচি, খোলা সব নিতে হবে। যারই শাঁস, তারই বিচি, তারই খোলা।


“যাঁরই নিত্য, তাঁরই লীলা।


“তাই আমি নিত্য, লীলা সবই লই। মায়া ব’লে জগৎ সংসার উড়িয়ে দিই না। তা হ’লে যে ওজনে কম পড়বে।”

(শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত : শ্রীম-কথিত : সমগ্র সংস্করণ। পৃ: ১৪৪)

নরেন্দ্র মোদি

 আসলে কারো কারো ওনাকে বুঝতে ভুল হচ্ছে, ফলে একটা মিষ্টি অনিশ্চয়তার দোলাচলে পড়ে কেউ কেউ অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্যও করে ফেলছেন। দোষটা তাঁদের নয়। এতসব কান্ড হচ্ছে, কারণ উনি কোনো conventional 'ism' মেনে চলছেন না - না অর্থনীতিতে, না সমাজনীতিতে, না বিদেশনীতিতে আর না সুরক্ষানীতিতে। ফলে যাঁরা বাঁধাধরা ছকে শ্রী নরেন্দ্র মোদিকে evaluate করতে চাইছেন, তাঁদের সাথে দেশের অধিকাংশ মানুষের perception আর মিলছে না।


আগামী ৬ই জানুয়ারি উনি চতুর্থবার UAE যাচ্ছেন, ২০১৪তে ওনার প্রথমবার যাত্রার আগে শেষবারের মতো ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রী আমিরশাহীতে গিয়েছিলেন ৩১ বছর আগে। একদিকে দুনিয়াভরের বাম মিডিয়ার তৈরি করা image - রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রচারক, মুসলিমবিদ্বেষী দাঙ্গাকারীদের সর্দার অর্থাৎ একজন ঘোর অসহিষ্ণু নৃশংস হিন্দুত্ববাদী, আর অন্যদিকে আরব দুনিয়ায় যে আমূল পরিবর্তনের হওয়া বইছে, Abraham Accord এর পেছনে পেছনে হেঁটে তিনিই আজ মক্কা-মদিনার দেশের পরম মিত্র - গোটা আরব দুনিয়া আজ ওনাকে নিজেদের দেশের সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে অলংকৃত করছেন - দুটো ছবি মিলছে কই?


আবার এমন একটি রাজনৈতিক দলের তিনি অবিসংবাদী নেতা যা ওই বামপন্থী মিডিয়া, academic ও বুদ্ধিজীবীদের মতে ঘোর right wing, অর্থাৎ পুঁজিপতিদের দালাল। অথচ জনধন একাউন্ট খোলা থেকে নিয়ে open defecation ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব রুখতে স্বচ্ছতা অভিযান, প্রধানমন্ত্রী আওয়াস যোজনায় সমস্ত গরিবের জন্য পাকা বাড়ি থেকে নিয়ে মুদ্রা যোজনায় গরিব ছোট ব্যবসায়ীকে বিনা collateral রেখে অল্প সুদে loan, করোনাকালে বিনি পয়সায় রেশন থেকে নিয়ে প্রত্যেক কৃষকের ব্যাংক খাতায় বছরে ৬০০০ করে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া, গরিব মহিলাদের অর্থনৈতিক সশক্তিকরণ থেকে নিয়ে তালাক-এ-বিদদতকে আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ বানিয়ে দেওয়া, প্রত্যেক জেলায় মেডিক্যাল কলেজ তৈরি করা থেকে নিয়ে প্রত্যেক গরিবের জন্য ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা করে দেওয়া, চতুর্দিকে dedicated freight corridor তৈরি করা যাতে শহরের produce-এর সাথে সাথে গরিব কৃষকের গ্রামীন ফসল এবং অন্যান্য গ্রামীন উৎপাদন সহজে এবং সস্তায় সারা দেশে বাহিত হতে পারে, সারা দেশজুড়ে চওড়া চওড়া highway তৈরি করা, রেলকে বিশ্বস্তরে নিয়ে যাওয়া যাতে সাধারণ মানুষের চলাচলের গতি বাড়ে, বড় এবং মাঝারি শহরে মেট্রো সহ public transport এর খোল-নোলচে বদলে ফেলা, public asset creation আর public utility services তৈরি করাতে স্বাধীনতাযাবৎ সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করা, গরিব শিশুর অপুষ্টি রোধ করা থেকে নিয়ে বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও, ইত্যাদি ইত্যাদি যা কিছু ওনার সরকারকে করতে দেখা যাচ্ছে - সবকটিই একটি Welfare State-এর আদর্শ মডেল, অর্থাৎ নিখাদ সমাজবাদী মডেল। 


অন্যদিকে, সত্যিকারের capitalist হলে তো ওনার আমেরিকার অধিকাংশ রাষ্ট্রপ্রধানদের মতন crony capitalistদের বন্ধু হওয়া উচিত ছিল - উনি তাও না। যেভাবে নোটবন্ধি করে direct tax base বহুগুণ বাড়িয়ে নিয়েছেন বা বেনামি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইন এনেছেন, যেভাবে GST লাগু করে ট্যাক্স ফাঁকি অনেকটা রুখে দিয়েছেন, অথবা bankruptcy আইন এনে ব্যাঙ্ক লুট করার খুড়োর কল বন্ধ করে দিয়েছেন, তাতে ওনার ঠিক ঠিক capitalist হওয়া আর হলো কই, যতই বামপন্থীরা আদানি আম্বানি বলে নাচুন না কেন। আবার রাষ্ট্রের সর্বশক্তি নিয়ে উনি entrepreneurship আর innovation-এর পেছনে ঢালের মতন দাঁড়িয়ে, বেশ কিছু যুদ্ধাস্ত্র তৈরির কারখানা আর এয়ার ইন্ডিয়ার মতন অব্যবস্থার শিকার সরকারি সম্পত্তিকে ব্যক্তি মালিকানায় transfer করে অথবা এয়ারপোর্ট, সিপোর্ট, PPP মডেলে রাস্তা, কিছু ট্রেন ইত্যাদি কর্পোরেট ব্যবসাদারদের হাতে ছেড়ে দিয়ে, efficiency বাড়িয়ে exchequer-এর ওপর বোঝা কমিয়ে একদম ideal ব্যবসায়িক আবহাওয়াও তৈরি করছেন, যা মূলত মার্গারেট থ্যচারকে মনে করিয়ে দেওয়া পুঁজিবাদী মডেল। 


বিদেশনীতিতে মুসলমান দেশগুলির সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে নিজের হিন্দু পরিচয়কে জলাঞ্জলি দিতে হবে, সেই ধারণাও উনি ভেঙে দিয়েছেন। নিজের দেশের প্রাচীন ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের মধ্যে ভবিষ্যতের প্রগতির ইন্ধন লুকিয়ে আছে - যে সভ্যতা এই কথা ভুলে গেছে তাদের সভ্যতার অন্তরাত্মার নাশ হয়েছে - তা সে মায়া থেকে ব্যবিলনীয়, মিশরীয় থেকে পারশিক, যেদিকেই তাকানো যাক না কেন। আমাদের দেশও সেই পথে হাঁটতে শুরু করেছিল - উনি এসে আটকালেন। তাই মা গঙ্গায় ডুব দিয়ে বাবা বিশ্বনাথের মাথায় জলাভিষেক করার মধ্যে কেউ কেউ হয়তো রাজনৈতিক অভিসন্ধি দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু সোমনাথের মন্দিরচত্বরের সংস্কার থেকে নিয়ে কেদারনাথের কায়াকল্প, কাশীর বিশ্বনাথ করিডোর নির্মাণ থেকে নিয়ে অযোধ্যায় রামমন্দিরের ভূমিপূজন - এইসবই কোটি কোটি ভারতীয়দের আস্থার সম্মানসূচক এবং সময়ের দাবি মেনে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার অন্তরাত্মার প্রতীকগুলির বহু প্রতীক্ষিত আধুনিকীকরণও বটে। 


কারো বন্ধু হতে গেলে এবং সবার মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে গেলে সবসময় মুখোশ পরে থাকতে হবে, ক্রমাগত ভরাপেটে ইফতারের মতন ভণ্ডামি করে যেতে হবে - এই দুষ্প্রথা ভেঙে উনি শুধু নিজের আস্থা ও সংস্কারের প্রতি নয়, সমস্ত মতের প্রতি নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন। ওনার আচার-ব্যবহার, মানসিকতা, confidence ও commitment দেখে সারা পৃথিবী বুঝতে পারছে যে ভারত তার সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে পেয়েছে, ফলে বিশ্বের দরবারে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা অবিশ্বাস্য হারে বেড়েছে। একদিকে unprecedented scale-এ দেশের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে আর অন্যদিকে massive scale-এ infrastructural development-এর সাথে সাথে আধুনিক Central Vista এবং প্রাচীন heritage-এর সংস্কারের মাধ্যমে নতুন ভারতের architectural footprint তৈরি হচ্ছে। সর্বোপরি, আত্মনির্ভর হওয়ার লক্ষ্যে আমদানি কমিয়ে Make in India-র দৌলতে নিজস্ব production বহুগুণ বাড়িয়ে রফতানির দিকেও দ্রুতগতিতে দেশের অর্থব্যবস্থা ছুটে চলেছে। নিজের আস্থার প্রতি unwavering আস্তা রেখে এবং কোনো ভনিতা না করেও কিভাবে যে মত-পন্থ-নির্বিশেষে সকলের মঙ্গলের জন্য একের পর এক অত্যাধুনিক AIIMS-এর উদ্বোধন করা যায় বা ২০৩০এ অন্তরীক্ষে space station পাঠানোর নির্ণয় নেওয়া যায়, এটাই অনেকে বুঝে উঠতে পারছেন না কারণ ওঁরা এমনটা যে আগে কখনো দেখেননি।


আসলে এরকম আরো অনেক উদাহরণ দেওয়া যায় কিন্তু তাতে লেখাটা বড্ড বড় হয়ে যাবে, পাঠকের অত সময় নষ্ট করে লাভ নেই। মোদ্দা কথা হলো এটাই সত্যিকারের হিন্দু way of life, সে কারো পছন্দ হোক বা নাই হোক। হিন্দু মানেই tolerent, হিন্দু মানেই maleable আর হিন্দু মানেই সংস্কারিত, শীল, সুজন। আবার হিন্দু মানে পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার ধারক এবং বাহক - শত আঘাতেও যখন হিন্দুর হিন্দুত্বকে শেষ করে দেওয়া যায়নি তখন একথা মানতেই হবে যে হিন্দু অসম্ভব resilient, মানসিকভাবে অসম্ভব শক্তিমান আর মারাত্মক প্রত্যয়ীও বটে। তাই উনি আমেরিকার সাথে QUAD মিটিং করেন, চীনের সাথে বর্ডারে প্রচুর সৈন্য সমাবেশ করেও নির্বিঘ্নে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য চালিয়ে যান আর রাশিয়ার থেকে S400 কিনেও কোনো মার্কিনি প্রতিবন্ধন face করেন না।


শ্রী নরেন্দ্র মোদি একজন প্রকৃত হিন্দু। আর হিন্দু বলেই নির্ভেজাল কম্যুনিস্ট, ক্যাপিটালিস্ট, কাসটিস্ট, রিফরমিস্ট, কনজারভেটিভ, ডগমাটাইসড - পুরোপুরি কোনোটাই নন আবার সবকিছুরই ভালো অংশ কিছু থেকে থাকলে, তার আগ্রহী গ্রহীতা। ফলে ওনাকে ছকে ফেলা যাচ্ছে না, আর সেখানেই বাকি সকলের মহাসমস্যা কারণ তাঁদের সব agenda-ই হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। হিন্দুর প্রধান শক্তি যে জাতিটি stereotyped নয় - সে উদার। হিন্দুকে যারা typecast করতে চাইবেন, তাঁদের এই ধরণের সমস্যায় পড়তেই হবে। কিছু করার নেই ভাই, অনেকদিন পর নিশ্চিন্তে নিজেদের হিন্দুত্ব জাহির করতে পারা যাচ্ছে কিনা, তাই দেশটি এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নানা স্তরে নানা জায়গায় নানা সময়ে নানান ভোট আসবে যাবে, তাতে ওনার কিছু আসে যায়না। উনি ওনার পথেই এগিয়ে যাবেন কারণ দেশ আজ নিজেকে চায়।