Wednesday, November 16, 2022

আমিই সেই

ঈশা বাস্যমিদৃং সর্বং যত্‍কঞ্চ জগত্যাং জগত্‍ ।
তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্য স্বিদ্ধনমৃ ।।
(ঈশ উপনিষদের প্রথম শ্লোক)
এখানে তিনটি জিনিষ বলা হচ্ছে:
১/ অখিল ব্রহ্মান্ডে জড় বা চেতন সব কিছুতেই ঈশ্বর ব্যাপ্ত ।
২/ অহং ত্যাগ করে ভোগ কর ।
৩/ লোভ কর না ।
ঠাকুর বলতেন 'জগৎ চৈতন্যময়'। অর্থাৎ ব্রহ্ম সত্য, জগৎও সত্য। মায়া নয়, লীলা। ঠাকুরের ভাষায় 'লীলাপোষ্টাই'। ঠাকুরের 'জ্ঞান-বিজ্ঞান' দর্শন শঙ্করের মায়াবাদকে ছাড়িয়ে অনেকটা এগিয়ে গেছে। আমার মধ্যে যদি ঈশ্বর স্বয়ং অবস্থান করেন তাহলে আমি বাস্তব তো বটেই, নিছক স্বপ্ন হৈ কিভাবে? এটা ইশ উপনিষদেরই কথা। গুরুর কথা ধরেই স্বামীজী তাঁর দ্বিতীয় Practical Vedanta বক্তৃতায় বলছেন, 'And this is the real, practical side of Vedanta. It does not destroy the world, but it explains it; it does not destroy the person, but explains him; it does not destroy the individuality, but explains it by showing the real individuality. It does not show that the world is vain and does not exist, but it says, "Understand what this world is, so that it may not hurt you.".... The theme of the Vedanta is to see the Lord in everything, to see things in their real nature, not as they appear to be.' (CW 2:312)

Saturday, October 1, 2022

বাঙালি শৃঙ্খলামুক্ত হোক

পশ্চিমবঙ্গে যদি কোনোদিন সত্যিকারের বুকের পাটাওয়ালা সরকার ক্ষমতায় আসেন তাহলে অরবিন্দ ঘোষ, রাসবিহারী বসু, শচীন্দ্রনাথ সান্যাল, রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী, যতীন্দ্রনাথ দাস, সূর্য সেন, যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, বারীন্দ্র কুমার ঘোষ, বটুকেস্বর দত্ত, প্রফুল্লচন্দ্র চাকী, ক্ষুদিরাম বসু, বিনয় কুমার বসু, গণেশ ঘোষ, মাতঙ্গিনী হাজরা, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, বীণা দাস, লীলা রায়, শোভারানী, কল্যাণী দাস (ভট্টাচার্য্য) প্রমুখ অসংখ্য বীরশ্রেষ্ঠ বিপ্লবীদের স্মৃতি মাথায় করে রাখবেন। এঁদের বিষয়ে বাঙালিকে বিশদে পড়ানো হবে, এঁদের জন্মস্থান তীর্থক্ষেত্ররূপে চিহ্নিত হবে, এঁদের দেশপ্রেম ও রাষ্ট্রবোধকে জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সবরকম প্রয়াস হবে। 

চরখা কেটে এ দেশ স্বাধীন হয়নি। এই বীর বিপ্লবীদের অপরিসীম আত্মত্যাগ না থাকলে এবং রাসবিহারী বসু ও বিনায়ক দামোদর সভারকারের অনুপ্রেরণায় নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ পরাধীন ভারতকে আক্রমণ না করলে ও ফলস্বরূপ ইংরেজ অধীনস্ত ভারতীয় নৌবাহিনীতে বিদ্রোহ না হলে, ভারত হয়তো ১৯৪৭এ স্বাধীন হতো না। 

অস্বীকার করার উপায় নেই যে ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে গান্ধীজির একটা ভূমিকা আছে কিন্তু সেটা যত বড় করে দেখানো হয়, আসলে তার ধারেকাছেও না। ভারতের স্বাধীনতার জন্য যদি কোনো একটি ভারতীয় জাতির সর্বোচ্চ অবদান থেকে থাকে, তাহলে সেটা হিন্দু বাঙালির, সেলুলার এবং অন্যান্য জেল যার সাক্ষ্য আজও বহন করে চলেছে। এই রাষ্ট্রবোধের ইতিহাস, বস্তুতঃ হিন্দু বাঙালির বীরত্বগাথা, তার গৌরবময় জাতিস্বত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। হিন্দু বাঙালি বিপ্লবীদের অবদান ছোট করে দেখানো আসলে একটা গভীর ষড়যন্ত্রের ফল কারণ শৌর্যে, বীর্যে, বিদ্যায়, বুদ্ধিতে, অনুভবে, অনুরাগে, শিল্পে, সাহিত্যে, উদ্ভাবনীশক্তিতে, সৃজনশীলতায় - সবকিছুতে যে জাতি সারা দেশের মধ্যে প্রমুখতম ছিল, তাকে তার মূল থেকে বিচ্ছিন্ন না করতে পারলে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করা যেত না যে। কংগ্রেসের সক্রিয় সহযোগিতায় দোসর বামপন্থীরা পাঁচ দশক ধরে ঠিক সেই চেষ্টাটাই করে গেছে। 

বাবর যেমন ভারতীয় ভাবধারাকে ছোট করার জন্য রামজন্মভূমির মন্দির ভাঙিয়েছিল, ঠিক তেমনই কংগ্রেসি সিস্টেম সুপরিকল্পিতভাবে বাঙালিকে হেয় করে কৃত্রিমভাবে অন্যদের বড় করে দেখাবার চেষ্টা করে গেছে। সবুজ বিপ্লব গমে হয়েছে কিন্তু ধানে হয়নি, স্যার বীরেন মুখার্জির ইস্কো জাতীয়করণ হয়েছে কিন্তু টাটাদের টিস্কো হয়নি, এককালে নর্থ ও সাউথ ব্লক কাঁপানো বাঙালি সিভিল সারভেন্টের সংখ্যা কমতে কমতে তলানিতে এসে ঠেকেছে, বাঙালির ভবিষ্যৎ লাটে ওঠানোর জন্য নকশাল আন্দোলন এখানেই শুরু করা হয়েছে। এগুলো অতীত। অবশেষে দেশে নতুন করে হিন্দুত্বের জোয়ার এসেছে, তাই আমাদের দেশকে আক্রমণকারী বর্বর বাবরের সেনাপতির দ্বারা ভেঙে দেওয়া শ্রীরামজন্মভূমিমন্দির আবার নতুন করে তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে সময় এসেছে হিন্দু বাঙালি জাতিস্বত্তাকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার। সময় এসেছে হিন্দুবিরোধী ইকোসিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ জানাবার। আর সময় এসেছে আবার হিন্দু বাঙালিকে ভারতের সম্মিলিত তেজপুঞ্জের চালিকাশক্তি করে তোলার। আমাদের মননে আজও অতীতের ভারতগৌরব অতীশ দীপঙ্কর যেমন বেঁচে আছেন, তেমনই বেঁচে আছেন আধুনিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পিতামহ ভীষ্ম ঋষি রাজনারণ বসু। একবার শৃঙ্খলমুক্ত হতে পারলে আমাদের আটকানো মুশকিল আছে।

Monday, September 19, 2022

রানী ও আমরা

আজ ব্রিটেনের প্রয়াত রানীর রাষ্ট্রীয় অন্তেষ্টিতে চার্চে যে সব ভাষণ হলো তাতে তাঁকে এক বিশেষ ধারার খ্রিষ্ট পন্থাবলম্বীদের রক্ষাকর্ত্রী এবং একজন পরম খ্রিষ্টান বলে বারেবারে সম্বোধিত করা হলো। দিন দশেক আগে যখন রাজা তৃতীয় চার্লস দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন তখন গোটা প্রিভি কাউন্সিলের সামনে দাঁড়িয়ে তিনিও নিজেকে defender of the faith বলেই অবিহিত করেছিলেন এবং স্কটল্যান্ডের চার্চের রক্ষক হিসেবেও শপথ নিয়েছিলেন। বলাবাহুল্য faiths নয় কিন্তু, faith এবং সেই faith অবশ্যই খ্রিষ্টান পন্থের একটি ধারাবিশেষ, যাকে protestant বলে। 

অর্থাৎ ব্রিটেনের রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি অন্যান্য এমন কিছু দেশেরও রাষ্ট্রপ্রধান যেখানকার মূল জনজাতিরা খ্রিষ্ট পন্থাবলম্বী নন, তিনি সমস্ত পন্থ তো দূর, খ্রিষ্টানদেরই অন্য ধারাগুলির রক্ষক নন। এত কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে রাজা এবং তাঁর দৌলতে রাষ্ট্রের একটি বিশিষ্ট পন্থীয় ধারা থাকা স্বত্তেও ব্রিটেনকে কি কেউ theocratic রাষ্ট্র বলে? বলে না তার কারণ রাষ্ট্রশক্তি বিভিন্ন পন্থাবলম্বীদের মধ্যে কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ করে না, দুর্ভাগ্যজনকভাবে যা অনেক ইসলামিক দেশেই সরকারিভাবে করা হয়ে থাকে। 

এখন প্রশ্ন হলো যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান স্বয়ং নিজেকে একটি মাত্র পন্থের রক্ষাকর্তা হিসেবে সরকারিভাবে শপথ নেওয়া স্বত্তেও রাষ্ট্র পন্থনিরপেক্ষ থাকতে পারে, সেখানে ভারতবর্ষের বেলায় শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব ইত্যাদি পন্থাচারের প্রাধান্যকে বাদ দিয়ে কেবলমাত্র প্রাচীনকাল থেকে প্রবাহমান ধর্মবোধ এবং একীভূত সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা করলে সর্বনাশ হয়ে যাবে কেন? প্রবঞ্চনার মাধ্যমে সংবিধানে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া socialist আর secular শব্দগুলির জেরে এখন কি আমরা খুব ভালো আছি? ওগুলোর মধ্যে কি আমাদের existential ethos আছে?

এই যে এত মারামারি কাটাকাটি - সেসব কিসের জন্য? মতবাদ-অসহিষ্ণুতার জন্য, যা ভারতীয় সংস্কৃতিতে কস্মিনকালে ছিল না, পুরোটাই বিজাতীয় পন্থের সাথে সাথে আমদানিকৃত। অর্থাৎ, অন্য অপসংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যত আমরা আমাদের সহিষ্ণু, সংস্কারমুক্ত, সদাচারী জীবনবোধ থেকে সরে গেছি, তত আমাদের অনেকের মধ্যে অন্যের মতকে সন্মান দেওয়ার প্রবণতা কমেছে এবং সেই সাথে নিজের মতকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। 

পন্থ যার যার কিন্তু ধর্ম সবার। অর্থাৎ ভারতীয় সমাজে থাকতে গেলে এবং সততার সাথে নিজের নিজের কর্তব্য নির্বাহ করতে গেলে গোটা সমাজে ভালো-মন্দের মাপদন্ড একটাই হওয়া উচিত - আমাদের পূর্বপুরুষ হাজার হাজার বছর ধরে মাজাঘষা করতে করতে যার একেবারে একটা perfect model তৈরি করে দিয়ে গিয়েছেন, যাকে আমরা হিন্দুধর্মবোধ বা হিন্দুত্ব বলি। ভারতকে আবার অর্থ কাম এবং মোক্ষলাভের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছতে গেলে ফের সেটাই করতে হবে যেটি আমাদের পূর্বপুরুষ অনুসরণ করে হাতে হাতে সুফল পেয়েছিলেন - ধর্মীয় হতে হবে। পন্থীয় নয় কিন্তু, ধর্মীয়। আর তার জন্য প্রথমে আমাদের হিন্দুত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার কারণ অন্য কোনো সভ্যতায় 'ধর্ম' বলে কোনো বস্তু নেই, আছে কেবল পন্থ বা religion। 

আমাদের রাষ্ট্র যদি সত্যি সত্যিই পন্থনিরপেক্ষ হতে চায়, তাহলে তাকে সত্যিকারের ধর্মনিষ্ঠ হতেই হবে। আর সত্যিকারের ধর্মনিষ্ঠ হতে গেলে মনে প্রাণে সাংস্কৃতিকভাবে হিন্দু হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায়ই নেই, কারণ অন্য কোনো সংস্কৃতিতে ধর্মের কোনো প্রতিশব্দই নেই যে। সারা বিশ্বজুড়ে মানুষ আজ রাষ্ট্রীয়ভাবে protestant মতানুসারে পালিত একজন protestant নারীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া দেখছেন, কারণ সেটাই সমীচীন। যদি নিজেদের সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার কারণে বিভিন্ন মতানুসারে রানীর একটা খিচুড়ি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হতো, সেটা বরং ভড়ং হতো। আমরা গত ৭৫ বছর ধরে এই মিথ্যে ভড়ংটাই করে আসছি, আর না। আমাদেরও শিকড়ে ফেরার সময় হয়ে গেছে। আমাদের রাষ্ট্রের জন্য হিন্দুত্ব ছাড়া দ্বিতীয় কোনো মানক নেই। জয় মা ভারতী, জয় হিন্দুরাষ্ট্র।

Tuesday, September 6, 2022

দেবী দুর্গা

দেবীপুরাণ, কালিকাপুরাণ, মৎস্যপুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ, দেবী ভাগবত - এইসব পুরাণ ও উপ-পুরাণে দেবী মাহাত্ম্য আলোচনা করা হয়েছে। তাতে মা দুর্গার নামের বর্ণনা এইভাবে করা হয়েছে:
দৈত্যনাশার্থবচনো দকারঃ পরিকীর্তিতঃ।
উকারো বিঘ্ননাশস্য বাচকো বেদসম্মত।।
রেফো রোগঘ্নবচনো গশ্চ পাপঘ্নবাচকঃ।
ভয়শত্রুঘ্নবচনশ্চাকারঃ পরিকীর্তিত।।

অর্থাৎ, "দ" অক্ষরটি দৈত্য বিনাশ করে, উ-কার বিঘ্ন নাশ করে, রেফ রোগ নাশ করে, "গ" অক্ষরটি পাপ নাশ করে এবং অ-কার শত্রু নাশ করে। এর অর্থ, দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা।
(পূজা-বিজ্ঞান, স্বামী প্রমেয়ানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৪৪)

এই দশপ্রহরণধারিনি দুর্গা রূপে ভগবতী দেবী পার্বতী দুর্গমনাশিনী। তিনি মহাযোগিনী। বন্ধুবর শ্রী সৈকত বসু মহাশয় দেবীসূক্তের এক অসামান্য যৌগিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তাঁর এক লেখায়: 'মহিষ বেশী অসুর মদগর্ব বা অহঙ্কার-এর প্রতীক। দেবীর মূল অস্ত্র ত্রিশুূল ইড়া পিঙ্গলার সুষুম্নার প্রতীক । এই ত্রিশুল মহিষাসুর এর হৃদয় বিদীর্ণ করছেন।  মানে অনাহত চক্র জয়ের প্রতীক।  মনিপুর চক্রের তত্ব জল। তাই দুর্গা জল হতে উদ্ভূতা। 

দুর্গা শরীর নামক দুর্গে স্থিত তাই তিনি দুর্গা।  তিনি ভ্রুযুগলের মধ্যে স্থিত তাই তিনি গুহাবাসীনিম।  তিনি বিন্দুতেও স্থিত তাই তিনি বিন্দুবাসীনিম। প্রথম কুম্ভক পদ্মনাভিতে এবং পূজক পুস্পাঞ্জলি দেবেন  তার নাভিপদ্মে।  দ্বিতীয় কুম্ভক অনাহতে এবং পূজক পুস্পাঞ্জলি দেবেন অনাহত চক্রে এবং শেষ পুস্পাঞ্জলি মস্তকে অথবা ব্রহ্মরন্ধ্রে।  এবার তিনি দেবীকে আবাহন করবেন ঘট পূর্ণ জলে।  দেবীর তত্ব জল। ঘটের ওপর শীর্ষযুক্ত ডাব।  ডাব জরায়ুর প্রতীক। দেবী জগৎ প্রসবিনী।'  

প্রচলিত দুর্গা বানানটি আমাদের বাড়িতে ব্যবহৃত হয়না যদিও দুর্গা = দুর্গ + স্ত্রী, 'দুঃখে প্রাপ্যা'; দেবীবিশেষ। আমরা বিজয়ার দিন গোটা পরিবার একশআটবার 'শ্রী শ্রী দূর্গা সহায়' লিখি কারণ আমাদের পূর্বপুরুষরা ওই বানানই নির্দিষ্ট করে গেছেন। তার কারণ দূর শব্দটি হলো বিশেষণ {দূর্ + √ই + র (রক্)} যার অর্থ মনোবাক্যের অতীত আর 'গা' হলো বিশেষ্য, গাত্র, দেহ, শরীর। অর্থাৎ যিনি অব্যক্ত, তিনি যখন শরীর ধারণ করে মর্তে আগমন করেন, তিনিই দূর্গা।

আবার অন্যদিকে শ্রীবিষ্ণুর যে অবতার অকাল বোধন করে এই আশ্বিনমাসের দুর্গাপূজার প্রচলন করেছিলেন, আদি শঙ্করাচার্য্যের টীকা অনুসারে (রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী তপস্যানন্দের অনুবাদ) "রাম" শব্দের অর্থ হলো যোগীরা যাঁর সঙ্গে রমণ (ধ্যান) করে আনন্দ পান, সেই পরব্রহ্ম বা সেই বিষ্ণু, যিনি দশরথের পুত্ররূপে অবতার গ্রহণ করেছিলেন। আবার সন্ত কবিরদাস তাঁর দোহায় চার রকমের রামের কথা বলেছেন "এক রাম দশরথ কা বেটা, এক রাম ঘট ঘট মে বৈঠা; এক রাম কা সফল পাসারা, এক রাম হ্যায় সবসে ন্যায়ারা।"

মানে একজন রাম যিনি দশরথ পুত্র অর্থাৎ রাজা, যাঁকে আমরা "মর্যাদা পুরুষোত্তম" বলি, অর্থাৎ, "শ্রেষ্ঠ পুরুষ" বা "আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিপতি" বা "গুণাধীশ"। দ্বিতীয় রাম যিনি প্রত্যেক মানুষের মধ্যে আছেন অর্থাৎ সাক্ষাৎ ঈশ্বর। তৃতীয় রাম যিনি সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডময় প্রসারিত অর্থাৎ স্রষ্টা। আর চতুর্থ রাম যিনি সবচেয়ে অপূর্ব এবং আশ্চর্যময় অর্থাৎ যিনি সমস্ত কল্পনার অতীত সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম।

রামবতারে লক্ষ্মীদেবীই সীতাদেবী। মা লক্ষ্মীর অপর নাম শ্রী। শ্রীবিষ্ণু, শ্রীরাম আর সীতারাম বা সিয়ারাম তাই একই। অর্থাৎ যুগলে লক্ষ্মী আর বিষ্ণু। বিভিন্ন শব্দবন্ধে ওঁদের জয়ধ্বনিও ওই একই যুগলের জয়ধ্বনি, কোনো পার্থক্য নেই। যাহা জয় শ্রীরাম তাহাই জয় সিয়ারাম। মূলত মা দুর্গা এবং শ্রীরাম একই আদিশক্তির ভিন্ন প্রকাশ, যিনি যে ভাবে দেখতে চান, দেখতে পারেন। এসব নিয়ে বৈষ্ণব এবং রামায়িতদের সাথে অযথা অনবগত বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই।

পরম বৈষ্ণব শ্রীজীব গোস্বামী ভাগবতের ব্যাখ্যায় বলেছেন - যঃ কৃষ্ণ সৈব দুর্গা স্যাৎ যা দুর্গা কৃষ্ণ এব সঃ (শ্রী জীব গোস্বামী , ব্রহ্ম সংহিতা -টীকা -ধৃত গৌতমীয় কল্পবচন) অর্থাৎ যিনি কৃষ্ণ, তিনিই দুর্গা; যিনি দুর্গা, তিনিই কৃষ্ণ; ওনারা অভিন্ন। শক্তিমান ও শক্তি যেমন অভিন্ন, সেই ভাবেই, কৃষ্ণ ও দুর্গা এক ও অভিন্ন। তিনি আরও বলেছেন, অতঃ স্বয়মেব শ্রীকৃষ্ণস্বরূপ শক্তিরুপেন দুর্গানাম অর্থাৎ শক্তিরূপিণী দুর্গার নামই স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণস্বরূপ। স্বয়ং নিত্যানন্দ প্রভুর বাড়িতে আজও জাঁকজমক করে দুর্গা পুজা হয়। 

স্বয়ং মহাপ্রভু মা দুর্গার রুপ ধরে ভক্তদের দর্শন দিয়েছেন (চৈতন্য ভাগবত, ১৮ অধ্যায়)। তাহলে বৈষ্ণবে আর শাক্তে প্রভেদ কোথায়? বৈষ্ণবদের সবথেকে প্রধান শাস্ত্র ভাগবত পুরাণে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তাঁর যোগমায়া শক্তি দুর্গাকে বলছেন, তুমি পৃথিবীতে নানা নামে পূজিত হবে এবং ভক্তগণ নানা পূজা সামগ্রীর দ্বারা তোমার আরাধনা করবে (ভাগবত, ১০/২/ ১০-১২)। মহাভারতের যুদ্ধের পূর্বে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে দুর্গা স্তব করতে আদেশ করেন (মহাভারত, ভীষ্মপর্ব, ২৩/ ৪-১৬)। স্বয়ং শ্রীহরি শ্রীরামরূপে যাঁর অকালবোধন করেন, তাঁর পূজার বিষয়ে দুই ধারার মধ্যে কিসের বিভেদ?

ইদানিং জায়গায় জায়গায় শান্তি ও সম্প্রীতির নামে দেবীমুর্তির হাতে অস্ত্রের বদলে ফুল গুঁজে দেওয়া হচ্ছে অথবা কার্তিকের বাহন পাল্টে ঘোড়া করে দেওয়া হচ্ছে, এতটাই 'ধর্মনিরপেক্ষ' হয়ে গেছেন কেউ কেউ। অনেকেই আবার এসব দেখে না বুঝে বাহবা দিচ্ছেন, বিশেষতঃ তাঁদের জন্যই আজ দুর্গাপূজার প্রাক্কালে মাদুর্গার মাহাত্ম্য বর্ণনা করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

ঋকবেদে স্বয়ং দেবী নিজের স্বরূপ উদঘাটন করতে গিয়ে বলছেন,
অহং রাষ্ট্রী সংগমনী বসূনাং চিকিতুষী প্রথমা যজ্ঞিযানাম্ ।
তাং মা দেবা ব্যদধুঃ পুরুত্রা ভূরিস্থাত্রাং ভূর্যাবেশযন্তীং ।।.. ৩.. দেবীসুক্তম
(আমি রাষ্ট্রী, রাষ্ট্রের অধিশ্বরী, রাষ্ট্রারক্ষার্থে যে সম্পদের প্রয়োজন আমি তার বিধানকারীনী, সংসারে শান্তিলাভের জন্য যে ব্রহ্মজ্ঞান প্রয়োজন আমিই তা দান করতে পারি, আমি বহুরূপে সর্বভূতে শক্তিরূপে বিরাজ করি, দেবতাদের সব কাজই আমি সমাধা করতে পারি।)

বুদ্ধিজীবী, বৃত্তিজীবী, শৌর্যজীবী ও শ্রমজীবী, রাজ্যচালনায় এই চারটি শ্রেণী অপরিহার্য এবং মা দুর্গাকে ঘিরে তাই যথাক্রমে বুদ্ধিবৃত্তির প্রতীক বিদ্যাদেবী সরস্বতী, ব্যবসাবৃত্তির প্রতীক ধনদেবী লক্ষ্মী, ক্ষত্রিয়শৌর্য্যের প্রতীক দেবসেনাপতি কার্তিক এবং গণ বা জনশক্তির প্রতীক সিদ্ধিদাতা গণেশ। মা স্বয়ং রাষ্ট্রের অধিশ্বরী, তিনি স্বয়ং শক্তিস্বরূপিনী এবং একচালায় গোটা দুর্গা পরিবারটি হলো সম্পূর্ন রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতীক। 

এক হিসেবে আমাদের দুর্গাপূজা আসলে রাষ্ট্রশক্তিস্বরূপা স্বর্গাদপি গরীয়সী জননীর পূজা, বিশ্বাস না হয় উপরোক্ত ঋকবেদের দেবীসুক্তমের তৃতীয় সুক্তটি পড়ুন যেখানে দেবী স্বয়ং নিজেকে 'অহং রাষ্ট্রী' বলে পরিচয় দিচ্ছেন। দেবী ত্রিনয়নী, তাঁর একটি নয়ন চন্দ্রস্বরুপ, একটি সূর্যস্বরুপ এবং তৃতীয়টি অগ্নিস্বরুপ, অর্থাৎ তিনি সৃষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয়ের প্রতীক। তাঁর ত্রিনয়নের ইঙ্গিতেই নিয়ন্ত্রিত হয় রাষ্ট্রের ত্রিকাল। দেবী দশভূজা, কারণ দশদিশার তিনি অধিশ্বরী, যা রাষ্ট্রের ব্যাপ্তির পরিচায়ক। দশদিশা মানে পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ, ঈশান, অগ্নি, বায়ু, নৈঋত, ঊর্ধ্ব এবং অধঃ। 

তাঁর ডানদিকের পাঁচ হাতে পাঁচটি অস্ত্র এবং বামদিকের পাঁচ হাতে চারটি অস্ত্র এবং একটি ঘন্টা। দেবী যা যা ধারণ করে আছেন তার প্রত্যেকটির প্রতীকী তাৎপর্য আছে। ডানদিকের হাতের অস্ত্রগুলি হল: মা ত্রিগুনময়ী এবং ত্রিতাপহরণী তাই ত্রিশূল, অবিদ্যানাশিনী তাই খড়্গ, সংসারচক্র থেকে মুক্তিদায়িনী তাই সুদর্শন চক্র, মায়ের কৃপায় পরমব্রহ্মে লীন হওয়ার লক্ষ্য ভেদ হয় তাই বান, আর মা কামনানাসিনী তাই কুঠার বা ক্ষেত্রবিশেষে গদা। বামদিকের হাতের অস্ত্রগুলি হল: মা আশ্রিতের পরম আশ্রয় এই বোধ থাকা প্রয়োজন তাই খেটক বা বর্ম, ঈশ্বর উপলব্ধিতে গতিশক্তির প্রয়োজন তাই ধনুক, অসংযত মনকে শান্ত রাখা প্রয়োজন তাই নাগপাশ, অহংকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন তাই অঙ্কুশ আর মা শব্দব্রহ্মময়ী, নাদধ্বনির মাধ্যমেই সৃষ্টির সূচনা, তাই মায়ের হাতে ঘন্টা। 

এককথায় বলতে গেলে দেবীর ডানদিকে কার্য্য আর বামদিকে কারণ। দেবী সিংহবাহনা কারণ তামসিক পশুশক্তির অধিপতি পশুরাজ সিংহ তাঁর বশে আর মহিষাসুর কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যরূপী দেহস্থ প্রবল রিপুর প্রতীক, তাই বধ্য। গোটা কাঠামোটি পরিবেষ্টিত চালচিত্রে সবার মাথার ওপর দেবাদীদেব মহাদেব, তিনি সদাশান্তম, তিনি মঙ্গলময়তা, ঔদার্য ও স্থিরত্বের প্রতীক, অর্থাৎ তিনি রাষ্ট্রগুরু। তাই তো স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, "মনে রাখবে তোমরা জন্ম হইতেই মায়ের জন্য বলি প্রদত্ত"। কে এই মা? অবশ্যই জননী জন্মভূমি।

এই সূত্রেই কার্তিকের প্রসঙ্গে বিশেষরূপে আসা প্রয়োজন কারণ কার্তিকপূজাকে কেন্দ্র করে বাঙ্গালীদের মধ্যে কিছু বিভ্রান্তি আছে। দেব সেনাপতি কার্তিক বা মুরুগণ বা সুব্রহ্মণ্য ঠাকুরের অপর নাম হচ্ছে ষড়ানন অর্থাৎ ছয়টি মুখ যাঁর। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো মানব জীবনের ষড়রিপু- কাম (কামনা), ক্রোধ (রাগ), লোভ (লালসা), মদ(অহং), মোহ (আবেগ) এবং মাৎসর্য (ঈর্ষা)কে সংবরণ করে দেব সেনাপতি কার্তিক যুদ্ধক্ষেত্রে সদাজাগ্রত ও সচেতন থাকেন, তার বাহ্যিক প্রতীকিকরণ। আর তাঁর বাহন হলেন ময়ূর কারণ প্রাণীটি অত্যন্ত কর্মঠ ও সদাচঞ্চল এবং সর্পভক্ষী। এই সর্পটি আসলে অহংবোধ, যা তিনি আগেই গ্রাস করে নেন বলে কার্তিকের পক্ষে ষড়রিপুদমন করা সহজ হয়, তিনি জীবনযুদ্ধে সর্বদা জয়ী হন। আদর্শ রাষ্ট্র আসলে একটি পুণ্য ধর্মক্ষেত্র এবং তাকে সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষা করা অবশ্যকর্তব্য। সেইজন্যই দেবতাদেরও একজন বীর সেনাপতির প্রয়োজন হয়।

শক্তি আরাধনা ছেলেখেলার বস্তু নয়, দুর্গাপূজাও নিছক কোনো শারদোৎসবও নয়, একদম একশ শতাংশ খাঁটি হিন্দু ধর্মীয় অনুষ্ঠান। সবশেষে আবার বলি, ঋকবেদের দশম মণ্ডলের ১২৫তম সূক্তটিতে দেবী আদ্যাশক্তি ভগবতীর স্বরূপ ও মহিমা প্রকাশিত। সূক্ত শব্দের মানে সু-উক্ত, বিশেষ ভাবে যেটি বলা হয়, তাই সূক্ত। বৈদিকস্তোত্রকে সূক্ত বলা হয় আর মাতৃস্তোত্রগুলিকে ঋকবেদে দেবীসূক্ত বলে। দেবীসূক্তেই মা চণ্ডীর দৈবী মাহাত্ম্য বীজাকারে প্রচ্ছন্নভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে, চাইলে গোটাটা পড়ে নিতে পারেন। তান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে ছেলেখেলা করলে তন্ত্রধারক ও তাঁর পরিবারের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

দেবী প্রসঙ্গে একসময় পূজ্যপাদ স্বামী সোমেশ্বরানন্দজী মহারাজের একটি লেখা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, সেটি এখানে উদ্ধৃত করার প্রয়োজন বোধ করলাম:
'দুর্গা মানে যাকে জানা কঠিন। দুঃ=কঠিন। গ=যাওয়া। যেমন দুর্গে (fort) ঢোকা কঠিন। দুর্গম, যেখানে যাওয়া কঠিন। দুর্গের সাথে আ-কার যোগ করে দুর্গা। মাকে জানা বা পাওয়া খুবই কঠিন। তাই তাঁর নাম দুর্গা।

মায়ের দশ হাত। অর্থাৎ দশদিকেই তিনি রয়েছেন, সর্বত্রই তাঁর অস্তিত্ব। পাশে শিব, সাথে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। মায়ের কৃপায় সাধক সবকিছু পান। শিব বা ব্রহ্মজ্ঞান যেমন পাওয়া যায়, তেমনি লাভ করা যায় বিদ্যা, সম্পদ, শৌর্য, সিদ্ধি। চণ্ডীতে আছে, সুরথ ও সমাধি একই সাথে তপস্যা করেছিলেন। কিন্তু মায়ের বরে সুরথ ফিরে পেলেন তার রাজ্য, সমাধি লাভ করলেন ব্রহ্মজ্ঞান।

মাতৃমন্ডপে কলাগাছ? অনেকে বলেন গণেশের বউ! না। একে নবপত্রিকা বলা হয়। সাত রকম গাছ। পত্রিকা=যার পত্র (পাতা) আছে তাকে বলে পত্রিকা। কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, দাড়িম, অশোক, মান ও ধান। নবদুর্গার অন্য রূপ। এরও পুজো হয়। কেন? বলছি তা একটু পরে।

মন্ডপে মায়ের প্রতিমা মাটির। আর অষ্টমীর দিনে কুমারী পুজো। মাকে পুজো করা হচ্ছে গাছ, মাটি, মানুষ রূপে। মাটি জড়, গাছ যেন জড় ও জীবের মধ্যে (প্রাণ আছে কিন্তু সচল নয়), আর কুমারী হলো মানুষ। অর্থাৎ মাকে তিন রূপে আবাহন করা হয়। বিভিন্ন রূপে তিনিই রয়েছেন সর্বত্র।

মাতৃপ্রতিমার সামনে ঘট রাখা হয় কেন? ঐ ঘট হলো ভক্তের প্রতীক। ঘট=শরীর। ঘটের মধ্যে জল=মন (mind)। ঘটের মুখে আম পাতা= ইন্দ্রিয়। আর জলের নীচে রাখা সোনা (gold) = জীবাত্মা। অর্থাৎ সমবেত ভক্তদের প্রতীক এই ঘট। 

দেবতাদের সমবেত শক্তির ফলে মায়ের আবির্ভাব। অর্থাৎ ঐক্যই শক্তি। আজ সমাজে ভাল লোকেরা, সৎ মানুষেরা কেন নিজেদের অসহায় মনে করে? কারণ তারা ঐক্যবদ্ধ নয় যেখানে অসৎ লোকেরা দলবদ্ধ। চণ্ডীর তাৎপর্য এটাই। সংঘে শক্তি কলৌ যুগে = কলিযুগে সংঘবদ্ধ হলেই শক্তি।

মায়ের হাতে অস্ত্র কেন? কারণ ভাল লোকদের হাতেই অস্ত্র থাকা দরকার। তারাই সঠিক প্রয়োগ করতে সক্ষম। অসৎ লোকের হাতে অস্ত্র সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর।

শিবের তেজে সৃষ্টি হলো মায়ের মুখ। শিব সারাক্ষণ ধ্যানস্থ। অর্থাৎ কঠিন পরিস্থিতি এলে শান্ত মনে তার মোকাবিলা করতে হয়, এই শিক্ষাই দেওয়া হচ্ছে এখানে।

বিষ্ণুর তেজে মায়ের হাত। বিষ্ণু স্থিতি বা পালনের দেবতা। এর তাৎপর্য, আমাদের কর্মের দ্বারা জগতের বা সমাজের কি কোনো উপকার হচ্ছে অথবা শুধু নিজের জন্যই কাজ করি? যদি অন্যদের উপকারের জন্য হয় তবে তা দিব্য কর্ম।

ব্রহ্মার তেজে মায়ের পা। চলতে হয় পদক্ষেপ নিতে নিতে। ব্রহ্মা সৃষ্টির দেবতা। কিন্তু আমাদের পদক্ষেপ বা কাজ কি সৃজনশীল (creative) ? চণ্ডীর উপদেশ, গতানুগতিক কাজের উপরে উঠে সৃষ্টিশীল হও।

শিব নিজের শূল দিলেন মাকে। ত্রিশূল অর্থাৎ সত্ত্ব, রজ, তম। এই তিনের উপরে উঠতে পারলেই প্রকৃত জ্ঞান লাভ হবে। দন্ডের একমুখে ত্রিশূল, অন্যমুখে এক শূল। জগতের দুই রূপ। একদিকে ত্রিগুণের খেলা, অন্যদিকে অদ্বৈত অনুভব। মহিষাসুর ত্রিগুণে মত্ত ছিল বলে মা তাকে এক শূল দিয়ে মুক্তি দিলেন।

বিষ্ণু নিজের চক্র দিলেন মাকে। চক্র অর্থাৎ সংসারের আবর্তন। চক্র সবসময়েই ঘুরছে, পরিস্থিতি বদলাচ্ছে সর্বদা। কিন্তু চক্রের মাঝে যে ছিদ্র, ঐ কেন্দ্রে আঙ্গুল রাখলে স্থির থাকা যায়। চণ্ডীর উপদেশ, শ্রীরামকৃষ্ণের মতই, বুড়ি  ছুঁয়ে খেলা করো, বাসা পাকড়ে রঙ দেখো। অর্থাৎ ঈশ্বরকে ধরে কাজ করো।

ব্রহ্মা মালা দিলেন। এই মালা ফুলের নয়, রুদ্রাক্ষের মালা। সাধনার মালা। তাৎপর্য? মানুষের জীবন এক সাধনা। পশু জন্ম থেকেই পশু, পাখী ডিম ফুটে বাইরে বেরিয়েই পাখী। কিন্তু মানুষ জন্মের পর এক জীব মাত্র। তাকে সাধনা করতে হয় মনুষ্যত্ব লাভের জন্য। এই কথারই ইঙ্গিত চণ্ডীতে।'

Saturday, August 20, 2022

এক থেকে বহু, বহু থেকে এক


আমি যখন 'আমি' বলছি তখন একজনকেই বোঝাচ্ছি, singular number, একবচন - নিজেকে, অর্থাৎ নিজেকে আমি যা বলে মনে করি, তাকে। সেটা যদি আয়নায় দেখা আকারটি হয় তাহলে তাইই। কিন্তু সেই আমিই যখন 'তুমি' বলছি তখন কিন্তু সেটি অনেকজনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য - তুমি, তুমি এবং তুমি - plural number, বহুবচন, যদিও ব্যাকরণের হিসেবে ওটিও একবচনই বটে। 

এখন, 'আমি' যেমন specific, যতক্ষণ না পরমজ্ঞান হচ্ছে ততক্ষণ স্থান ও কাল নির্বিশেষে অপরিবর্তিত, 'তুমি' কিন্তু স্থান কাল পাত্র অনুযায়ী বদলে বদলে যেতে পারে। এক্ষুনি ঘরের ভেতরে গিন্নিকে তুমি বললাম, পরক্ষণেই রাস্তায় বেরিয়ে প্রতিবেশীকে তুমি বললাম আবার তারপর অফিসে পৌঁছে সহকর্মীকে তুমি বললাম - সবাই 'তুমি', সবাই বুঝলেন সেই বিশেষ সময় এবং সেই বিশেষ স্থানে specifically তাঁকেই সম্বোধন করছি, অর্থাৎ ডাকটা 'তোমরা'র মতন generalised নয় অথচ 'আমি'র মতন specificও নয়। 

'আমি' ধ্রুবক কিন্তু 'তুমি' পরিবর্তনশীল, যদিও ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দুটিই কিন্তু attached to a particular individual and indicative of only that person at any given time and space - বিশেষক্ষেত্রে ব্যক্তিবিশেষের নির্দিষ্ট পরিচায়ক। এর বিশেষত্ব হলো কে যিনি 'তুমি' বলে ডাকছেন তাঁর মনে যেমন সেই সময় যাঁকে ডাকছেন তাঁর identity নিয়ে কোনো ambiguity নেই, তেমনি যিনি সারা দিচ্ছেন তাঁর মনেও কিন্তু তাঁকেই যে ডাকা হচ্ছে - সে বিষয়ে কোনো ambiguity নেই। এই যে দুতরফেই given time and space এ understanding of identity থাকে, সেটাই দুটি ভিন্নস্বত্তার মধ্যে singular যোগসূত্র তৈরি করে দেয়। খুব জটিল ব্যাপার, তাইনা? 

বস্তুর ব্যাপারে সমস্যা কিন্তু আরো জটিল। 'গেলাস', 'জলের গেলাস', 'আমার জলের গেলাস' আর 'আমার নীলরঙের কাঁচের জলের গেলাস' এক হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। অন্যদিকে 'আমি' এবং 'তুমি' দুজনেই যে মানুষ সে বিষয়ে যেমন চরিত্রগত কোনো confusion নেই, বস্তুর ক্ষেত্রে কিন্তু বস্তুর বস্তুর ওপর তার চরিত্র নির্ভর করে, আবার করেও না। কাঁচের গেলাস, কাঁসার গেলাস আর রূপোর গেলাস যদিও উপাদানের নিরিখে চরিত্রগতভাবে একেবারেই এক নয়, কিন্তু উপযোগিতার দিক দিয়ে একই। কাঁচ একটি বস্তু আর গেলাস একটি আকৃতি বিশেষ - দুটির চরিত্র মিলে সহজেই যখন একটি বস্তুবিশেষ হয়ে যায় তখন তাদের পৃথক করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। 

এর মধ্যে অবশ্য নিত্য আর অনিত্যের মানকের বিষয়টিও এসে পড়ে। যদিও শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলতেন যা কিছু নিত্য তাই সত্য আর যা কিছু অনিত্য তাই অসত্য, কেবলমাত্র বিষয়টি সহজতর করার জন্য আমরা এখানে ক্ষণস্থায়ী আর দীর্ঘস্থায়ী দুটি বস্তুর মধ্যে তুলনা টানবো। উদাহরণস্বরূপ, একটা পাহাড় যেহেতু একজন মানুষের চেয়ে ঢের বেশি বছর অক্ষত থাকে, তাই বর্তমানে সেই পাহাড়ের মালিক যেটিকে 'আমার পাহাড়' বলে স্বত্ব আরোপ করেন, ভবিষ্যতে তাঁর মৃত্যুর পর নতুন মালিক একইভাবে ওই পাহাড়টিকেই আবার 'আমার পাহাড়' বলে স্বত্ব আরোপ করেন - তাতে কিন্তু পাহাড়ের চরিত্র একবিন্দু পাল্টে যায় না। অর্থাৎ 'আমি' পাল্টে গেলেও বস্তু পাল্টায় না, যদিও তার আরোপিত ও কৃত্তিম 'মালিকানা'র বর্ণনা পাল্টে যায়।

আবার এর উল্টোটাও হয়। ছাতুবাবু-লাটুবাবু কবে শরীর ছেড়ে চলে গেছেন কিন্তু উত্তর কলকাতায় ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়ি এখনো ওই নামেই খ্যাত, যদিও তার এখনকার প্রজন্মের মালিকরা আলাদা। তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়ালো? বস্তু 'আমি'র নামে পরিচিত হতে পারে কিন্তু তাতে বস্তুর কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়না - পাহাড় পাহাড়ই থাকে এবং বাড়ি বাড়িই। যত গোলযোগ কেবল 'আমি' আর 'তুমি'র মধ্যে বস্তু ঢুকে পড়লে। মজার ব্যাপার হলো বস্তুর ক্ষেত্রে সোনার আংটি থেকে সোনা নিয়ে নিলে আর আংটি অবশিষ্ঠ থাকে না, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে আমি থেকে 'আমি' নিয়ে নিলে বা তুমি থেকে 'তুমি' নিয়ে নিলে কি হয়? ওইখানেই অদ্বৈত বেদান্তের শুরু। 

এত কথার প্রয়োজন কি? প্রয়োজন এই যে সাধারণত আমি, তুমি আর বস্তু নিয়েই জগৎ সংসার আর এদের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রকৃত অর্থ বোঝবার জন্যই কখনো গৌতম বুদ্ধ বোধিবৃক্ষের তলায় তপস্যায় বসেন বা মানুষকে এর অর্থ বোঝাবার জন্য কখনো আচার্য্য শঙ্কর ঘুরে ঘুরে সারা দেশের চারটি কোনায় চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। আবার অন্যদিকে এই একই বিষয়ে অবুঝ হলে কখনো কার্ল মার্ক্সের তল্পীবাহকেরা বস্তুর অধিকার আমার না তোমার - এই প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করে কয়েক কোটি মানুষকে খুন করে বসে আর চীন অবলীলায় নানান অন্যদেশকে জোর করে নিজের দেশ বলে অধিগ্রহণ করে নেয়।

শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলতেন, 'তুমি আর তোমার' - এইটি জ্ঞান। 'আমি আর আমার' - এইটি অজ্ঞান। হে ঈশ্বর, তুমি কর্তা আর আমি অকর্তা - এইটি জ্ঞান। হে ঈশ্বর দেহ মন গৃহ পরিবার জীব জগৎ - এ সব তোমার, আমার কিছুই নয় - এইটির নাম জ্ঞান। যে অজ্ঞান সেই বলে ঈশ্বর 'সেথায় সেথায়' - অনেক দূরে। যে জ্ঞানী সে জানে ঈশ্বর 'হেথায় হেথায়' - অতি নিকটে হৃদয়মধ্যে অন্তর্যামীরূপে, আবার নিজে এক একটি রূপ ধরে রয়েছেন।

তুমি, তুমি আর তুমি - বহুরূপে সম্মুখে তুমি, তবু 'সেথায় সেথায়' করে আমরা ঈশ্বরকে অন্যত্র খুঁজে মরি। বস্তুতঃ 'আমি' আর 'তুমি' যে একই, সেই একই অদ্বৈত স্বত্তা, তোমার আর আমার মধ্যে যে পৃথক কোনো কিছু নেই, সে কথা বুঝতে বুঝতেই তো কত কত জন্ম জন্মান্তর কেটে যায়, তারপর হয়তো তাঁর কৃপা হয়। বস্তুত, গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কোনো বহুবচন নেই, সবটা মিলিয়ে একটাই একবচন। আত্মা চেতন, সদামুক্ত তবু সে জড়ে আসক্তিবশতঃ জীবরূপে দেহবোধে আবদ্ধ থাকে, ফলে তার এক কৃত্তিম অবস্থা এবং অন্য এক কৃত্তিম অবস্থার মধ্যে পার্থক্য খুঁজতে যাওয়াটা কেবল অর্থহীন বস্তুবিচারের বিষয়মাত্র। তবে বৈচারিকস্তরে সমস্ত প্রানীতে এক অবিভক্ত চিন্ময়ভাব দর্শন কল্পনা করা গেলেও মনেপ্রাণে তা বিশ্বাস করা এবং সেইভাবে নিজের 'আমি'কে 'তুমি'তে মিশিয়ে দেওয়াটি কিন্তু খুব খুব শক্ত কাজ এবং গুরুকৃপা ছাড়া সম্ভবই নয়।

১৮৬৮ সালে শ্রীরামকৃষ্ণদেব কাশীতে ত্রৈলঙ্গস্বামীকে দর্শন করতে গিয়েছিলেন। ঠাকুর তাঁকে বলতেন 'হাঁটা-চলা করা, কথা বলা কাশীর জ্যান্ত বিশ্বেশ্বর'। মণিকর্ণিকা ঘাটে গিয়ে ঠাকুর দেখলেন ত্রৈলঙ্গস্বামী সেখানে শুয়ে আছেন। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পদধ্বনি শুনে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন তিনি। কেউই কোনো কথা বললেন না। শুধু দৃষ্টি বিনিময়ের মাধ্যমেই সেরে নিলেন ভাবের আদানপ্রদান। তখনই ইশারায় ঠাকুর প্রশ্ন করলেন, "ঈশ্বর এক না অনেক?" স্বামীজী ইশারাতেই তাঁকে উত্তর দিলেন, "সমাধিস্থ হয়ে দেখলে এক, না হলে যতক্ষণ আমি, তুমি, জীব, জগৎ ইত্যাদির ভেদ রয়েছে ততক্ষণ অনেক।"

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের একেবারে শেষে সঞ্জয়ের কথা দিয়ে গীতা শেষ হচ্ছে। সেখানে সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে বলছেন,
রাজন্ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য সংবাদমিমমদ্ভুতম্। 
কেশবার্জুনয়োঃ পুণ্যং হৃষ্যামি চ মুহুর্মুহুঃ।।৭৬।।
তচ্চ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য রূপমত্যদ্ভুতং হরেঃ। 
বিষ্ময়ো মে মহান্ রাজন্ হৃষ্যামি চ পুনঃ পুনঃ।।৭৭।।
যত্র যোগেশ্বরঃ কৃষ্ণো যত্র পার্থো ধনুর্ধরঃ।
তত্র শ্রীর্বিজয়ো ভূতির্ধ্রুবা নীতির্মতির্মম।।৭৮।।
অর্থাৎ
হে রাজন্! শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের এই পুণ্যজনক অদ্ভুত সংবাদ স্মরণ করতে করতে আমি বারংবার রোমাঞ্চিত হচ্ছি। ৭৬
হে রাজন্! শ্রীকৃষ্ণের সেই অত্যন্ত অদ্ভুত রূপ স্মরণ করতে করতে আমি অতিশয় বিস্ময়াভিভূত হচ্ছি এবং বারংবার হর্ষান্বিত হচ্ছি। ৭৭
যেখানে যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ এবং যেখানে ধনুর্ধর পার্থ, সেখানেই নিশ্চিতভাবে শ্রী, বিজয়, অসাধারণ শক্তি ও নীতি বর্তমান থাকে। সেটিই আমার অভিমত। ৭৮

সঞ্জয় কাদের মধ্যে পুণ্যজনক অদ্ভুত সংবাদ শুনে রোমাঞ্চিত? তুমি ও আমি, ঈশ্বর ও জীব, স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে সংবাদ - যেখানে স্রষ্টা কৃপা করে divergence ও delusionকে convergence ও truthএ পরিণত করছেন, দ্বৈতবোধ থেকে অদ্বৈতবোধে উত্তরণ ঘটাচ্ছেন, আত্মার আসক্তি সরে গিয়ে পরমাত্মার সাথে তার সাক্ষাৎকার ঘটছে। কোন অত্যন্ত অদ্ভুত রূপ স্মরণ করতে করতে সঞ্জয় অতিশয় বিস্ময়াভিভূত এবং বারংবার হর্ষান্বিত হচ্ছেন? তিনি বিশ্বরূপ দর্শন করেছেন। তিনি দেখেছেন যে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কিছুই আলাদা নয়, জড় ও চেতন অর্থাৎ বস্তু এবং জীব সব একই নির্গুণ ব্রহ্মের স্বগুণ রূপ এবং এই পরমজ্ঞানের চেয়ে বড় পাওয়া আর কিছু নেই। আর একদম শেষে সঞ্জয় যে 'শ্রী, বিজয়, অসাধারণ শক্তি ও নীতি'র কথা বলছেন সেটা হলো নিষ্কাম কর্মের outcome - কর্মফলের কামনা ত্যাগ করতে পারলে যোগেশ্বরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ হয়। এর ফলে যে আত্মবোধের শক্তি উৎপন্ন হয়, তার দ্বারা মায়াকে জয় করে জীবনের আসল উদ্দেশ্য অর্থাৎ ব্রহ্মত্ব অর্জন করা যায়। এটাই সমাধি। এটি পুরোটাই কিন্তু একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, শোনা কথা নয়।

আর যাঁর সত্যি সত্যিই সমাধির অনুভব হয়েছে, যিনি নিজে এই পরম অবস্থাকে experience করেছেন, সেই স্বামী বিবেকানন্দ এইভাবে তাঁর অনুভূতিকে বর্ণনা করেছেন:
নাহি সূর্য নাহি জ্যোতিঃ নাহি শশাঙ্ক সুন্দর।
ভাসে ব্যোমে ছায়া-সম ছবি বিশ্ব-চরাচর॥
অস্ফুট মন আকাশে, জগত সংসার ভাসে,
ওঠে ভাসে ডুবে পুনঃ অহং-স্রোতে নিরন্তর॥
ধীরে ধীরে ছায়া-দল, মহালয়ে প্রবেশিল,
বহে মাত্র ‘আমি আমি’ - এই ধারা অনুক্ষণ॥
সে ধারাও বদ্ধ হল, শূন্যে শূন্য মিলাইল,
‘অবাঙমনসোগোচরম্’, বোঝে প্রাণ বোঝে যার॥

মানসিকভাবে এখন যে যেখানে আছি সেইখান থেকে এইখানে পৌঁছতে হবে। হয়তো আরো অনেকগুলো জন্ম লেগে যাবে, হয়তো রাস্তাটা সহজ হবে না, কিন্তু এই গোটা journeyটাতে যাতে লক্ষ্যে অবিচল থাকতে পারি, সেটাই আমাদের আসল প্রার্থনার বিষয়। 'আমি' নয় - 'তুমি', আবার 'তুমি' নয় - 'আমি', কোনো এক শুভক্ষণে সব মিলে মিশে একাকার হয়ে যাক।

Thursday, August 18, 2022

অবতার

শ্রীকৃষ্ণ বন্দে জগৎগুরুম্!

শ্রীকৃষ্ণের জন্মের রাত ছিল সৌর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে, যখন রোহিণী নক্ষত্রের প্রাধান্য হয়। সেই রাত ছিল গভীর অন্ধকার এবং ঘোর বৃষ্টিময়। কংসের কারাগার আলো করে তাঁর আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে পিতা বসুদেব দেখলেন শিশুটির চারটি হাত এবং তাতে তিনি শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম ধারণ করে আছেন। বাসুদেব বুঝতে পারলেন জগতের মঙ্গলার্থে স্বয়ং নারায়ণ তাঁদের ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন। বসুদেব করজোড়ে প্রণাম ও বন্দনার পর দেবকীও নবজাতকের কাছে প্রার্থনা করলেন এবং তখন শ্রীকৃষ্ণ একজন সাধারণ শিশুর রূপ ধারণ করলেন। শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন মাতা দেবকীর অষ্টম সন্তান।

এর প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর পর তীর্থ ভ্রমণে গয়ায় এসে ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছিলেন। গদাধর বিষ্ণু তাঁকে দেখা দিয়ে তাঁর ঘরে পুত্ররূপে আসতে চাইলেন। ক্ষুদিরাম ছিলেন ঈশ্বরগতপ্রাণ। দরিদ্র তিনি, তাঁর ঘরে এলে প্রভুর কত কষ্ট হবে, তা অকপটে নিবেদন করলেন। নারায়ণ কিন্তু হেসে আবার তার ঘরেই আসতে চাইলেন। এদিকে কামারপুকুরে চন্দ্রমণি দেবীরও এক অদ্ভুত দর্শন হয়েছিল। বাড়ির কাছে যুগীদের শিব মন্দিরে গিয়েছিলেন তিনি। অকস্মা‌ৎ এক জ্যোতি শিববিগ্রহ থেকে নির্গত হয়ে প্রবেশ করেছিল তাঁর দেহে। ক্ষুদিরাম ও চন্দ্রমণি, উভয়েরই বিশ্বাস হয়েছিল ভগবান পুত্ররূপে তাঁদের কাছে আসছেন। ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে ১৮ই ফেব্রুয়ারী (৬ই ফাল্গুন, শুক্লা দ্বিতীয়া তিথি) কামারপুকুরে ক্ষুদিরামের বাড়ীর ঢেঁকিশালে তাঁর তৃতীয় পুত্র গদাধরের জন্ম হয়েছিল।

শ্রীবিষ্ণু কি সত্যি সত্যিই বারেবারে সশরীরে এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন? স্বমুখে শ্রীকৃষ্ণ যেমন তাঁর আত্মপরিচয় দিয়ে গিয়েছেন তেমনি একদিন দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বাবুরাম প্রভৃতি ভক্তদের সঙ্গে বসে ছিলেন, দিনটি ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দ, ৭ই মার্চ, বেলা ৩টা-৪টা হবে, ভক্তেরা পদসেবা করছেন, এমন সময় শ্রীরামকৃষ্ণ একটু হেসে ভক্তদের বললেন, "এর (অর্থাৎ পদসেবার) অনেক মানে আছে।" তারপর নিজের হৃদয়ে হাত রেখে বললেন, "এর ভিতর যদি কিছু থাকে (পদসেবা করলে) অজ্ঞান অবিদ্যা একেবারে চলে যাবে।"

তারপর হঠাৎ শ্রীরামকৃষ্ণ গম্ভীর হয়ে গেলেন, যেন কি গুহ্যকথা বলবেন। তারপর ভক্তদের ঠাকুর বললেন, "এখানে বাহিরের লোক কেউ নাই, তোমাদের একটা গুহ্যকথা বলছি। সেদিন দেখলাম, আমার ভিতর থেকে সচ্চিদানন্দ বাইরে এসে রূপ ধারণ করে বললে, আমিই যুগে যুগে অবতার। দেখলাম পূর্ণ আর্বিভাব, তবে সত্ত্বগুণের ঐশ্বর্য।" কথামৃতকার লিখছেন, 'ভক্তেরা এই সকল কথা অবাক্‌ হইয়া শুনিতেছেন। কেহ কেহ গীতোক্ত ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মহাবাক্য স্মরণ করিতেছেন —
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্‌ ৷৷
পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্‌
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ৷৷'

ঠাকুরের যখন প্রেমোন্মাদ অবস্থা, লোকে যখন ওঁকে পাগল ভাবছে, তখন ভৈরবী ব্রাহ্মণী কিন্তু ঠাকুরের পরিবর্তনগুলিকে ঠিক ঠিক চিনতে পেরেছিলেন। এগুলি যে কোন রোগ নয়, কেবল সাধকের বিশেষ অবস্থার বাহ্যিক লক্ষণ মাত্র, তা তিনি শাস্ত্রের গভীর অধ্যয়ন ও প্রতীতি থেকেই বুঝেছিলেন। ফুলের মালা পরলে বা গায়ে চন্দনের প্রলেপ দিলে যে এই যন্ত্রণার উপশম হয়, তাও তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন। শ্রীমতি রাধারানী থেকে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য পর্যন্ত যোগী আচার্যদের জীবনে আধ্যাত্মিক অনুভবের সঙ্গে সঙ্গে যে অনুরূপ শারীরিক পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল - ভক্তিগ্রন্থসমূহ ও শাস্ত্রসমূহ উদ্ধৃত করে ভৈরবী তা সোচ্চারে ঘোষণা করতে একবিন্দু দ্বিধা করেননি। 

তারপর মথুরবাবু সে কালের বিখ্যাত পন্ডিত বৈষ্ণবচরণকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন দক্ষিণেশ্বরে। যে প্রধান উনিশটি ভাব বা অবস্থার সম্মিলনকে ভক্তিশাস্ত্রে মহাভাব বলা হয়, যা আগে শ্রীরাধিকা ও শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনে দেখা গিয়েছিল, বৈষ্ণবচরণ সেই সবকটি লক্ষণই দেখতে পেয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে। পরবর্তিকালে শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে এসে তান্ত্রিক সাধক গৌরী পন্ডিতের অহংকারও খর্ব হয়েছিল। তিনি ঠাকুরকে চিনেছিলেন স্বয়ং ঈশ্বররূপে ও ঈশ্বরলাভের জন্য সংসার ত্যাগ করেছিলেন।

মহাসমাধির কয়েকদিন আগে নরেন্দ্রনাথকে সামনে বসিয়ে তাঁর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ঠাকুর সমাধিস্থ হন। নরেন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল ঠাকুরের দেহ থেকে সূক্ষ্ম তেজরশ্মি, তড়ি‌ৎকম্পনের মত তাঁর শরীরে সেঁধিয়ে যাচ্ছে। সমাধিভঙ্গ হলে অশ্রু বিসর্জন করে ঠাকুর নরেন্দ্রনাথকে বলেছিলেন,"আজ যথাসর্বস্ব তোকে দিয়ে ফকির হলুম, তুই এই শক্তিতে জগতের কাজ করবি। কাজ শেষ হলে ফিরে যাবি।" ঠাকুর কি সত্যিই অবতার, এই সংশয় তখনও সম্পূর্ণ নিরসন হয়নি যুক্তিবাদী নরেন্দ্রনাথের হৃদয় থেকে। অন্তর্যামী ঠাকুর তা উপলব্ধি করে বলেছিলেন, "সত্যি সত্যি বলছি, যে রাম যে কৃষ্ণ সেই ইদানিং এই শরীরে রামকৃষ্ণ – তবে তোর বেদান্তের দিক দিয়ে নয়।"

এসবের অনেকবছর পরে স্বামীজী যখন আমেরিকায় গীতা ও নারদসূত্রাদি গ্রন্থ অবলম্বন করে ভক্তিযোগ নামক গ্রন্থ লিখছেন, তখন শ্রীরামকৃষ্ণকে স্মরণ করে তাতে তিনি বলছেন, "Higher and nobler than all ordinary ones, is another set of teachers, the Avataras of Ishvara, in the world. They can transmit spirituality with a touch, even with a mere wish. The lowest and the most degraded characters become in one second saints at their command. They are the Teachers of all teachers, the highest manifestations of God through man. We cannot see God except through them. We cannot help worshipping them; and indeed they are the only ones whom we are bound to worship."

আমেরিকাতেই 'Christ the Messenger' নামক বক্তৃতায় স্বামীজী আরো বিস্তারিতভাবে অবতারত্বের প্রসঙ্গ বুঝিয়ে বলছেন, "Thou hast seen me and not seen the Father? I and my Father are one! The kingdom of Heaven is within you! If I am pure enough I will also find in the heart of my heart, I and my Father are one. That was what Jesus of Nazareth said.

"It has been said by the same Messenger (Christ) 'None hath seen God, but they have seen the Son.' And that is true. And where to see God but in the Son? It is true that you and I, the poorest of us, the meanest even, embody that God — even reflect that God. The vibration of light is everywhere, omnipresent; but we have to strike the light of the lamp there and then we human beings see that He is Omnipresent. The Omnipresent God of the Universe cannot be seen until He is reflected by these giant lamps of the earth; the Prophets, the Man-Gods, the Incarnations, the embodiments of God .... They are all manifestations of the same Infinite God. They were all pure and unselfish; they struggled, and gave up their lives for us, poor human beings. They all and each of them bore Vicarious atonement for every one of us and also for all that are to come hereafter."

কথামৃতে একটা বেশ মজার কথোপকথন আছে, দিনটি ছিল ১৮ই অক্টোবর, ১৮৮৫। নাট্যাচার্য্য গিরিশ চন্দ্র ঘোষের সাথে ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের আলোচনা হচ্ছে।
ডাক্তার - 'অবতার আবার কি! যে মানুষ হাগে মোতে তার পদানত হব! হাঁ, তবে Reflection of God's light (ঈশ্বরের জ্যোতি) মানুষে প্রকাশ হয়ে থাকে তা মানি।' উত্তরে গিরিশবাবু তাঁর বিশ্বাসের কথা বলছেন এমন সময় ঠাকুর হস্তক্ষেপ করলেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ - এ-সব যা কথা হচ্ছে, এ কিছুই নয়। .... যতক্ষণ কাঁচা ঘি, ততক্ষণই কলকলানি শোনা যায়। পাকা হলে আর শব্দ থাকে না। যার যেমন মন, ঈশ্বরকে সেইরূপ দেখে। আমি দেখেছি, বড় মানুষের বাড়ির ছবি - কুইন-এর ছবি আছে। আবার ভক্তের বাড়ি - ঠাকুরদের ছবি! .... পূর্ণজ্ঞানের লক্ষণ আছে। বিচার বন্ধ হয়ে যায়। যা বললুম, কাঁচা থাকলেই ঘিয়ের কলকলানি।
ডাক্তার - পূর্ণজ্ঞান থাকে কি? সব ঈশ্বর! তবে তুমি পরমহংসগিরি করছো কেন? আর এরাই বা এসে তোমার সেবা করছে কেন? চুপ করে থাক না কেন?
শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) - জল স্থির থাকলেও জল, হেললে দুললেও জল, তরঙ্গ হলেও জল।

Saturday, August 13, 2022

অখন্ড ভারত

আজ ১৪ই অগাস্ট, পাকিস্তানের জন্মদিন। আজকের দিনেই আমাদের দেশমায়ের দুটি বাহু কেটে নিয়ে পাকিস্তানের দুটি প্রান্ত তৈরি হয়েছিল। আসলে আক্রান্তার বেশে ভিনদেশি দানবরা এসে আমাদেরই কয়েকজনকে ধরে বেঁধে, মাথা মুড়িয়ে, এমন দানবিক বিষ তাদের মননে ঢেলে দিয়ে গিয়েছিল যে কয়েক প্রজন্ম পরে তারা ভুলেই গেল যে তারা আসলে কারা। 

সামান্য পূজাপদ্ধতি পাল্টে গিয়ে তারা যেন হটাৎ এক ভিন্ন জাতি, ভিন্ন মানুষ হয়ে গেল। আর যত তারা রাষ্ট্রের বৃহত্তর সমাজের মূলধারা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিতে লাগলো বা সমাজও তাদের নিত্যনতুন বিজাতীয় চাহিদা মেটাতে অক্ষমতা জাহির করতে শুরু করলো, তত তাদের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত আমাদের প্রাচীন উন্নত মানবিক উদার সভ্যতা ও ধর্মসংস্কৃতির প্রভাব কমতে কমতে একসময় এমন হলো যে তারা হিতাহিত জ্ঞান খুইয়ে নিজেদের ছেড়ে আসা রক্তের সম্পর্কের সনাতনী আত্মীয়-বন্ধুদেরই পরমশত্রু বলে ভাবতে শুরু করলো। দুর্ভাগ্যবশত, সেই ভাবনা আজো বেঁচে আছে কারণ দেশভাগের ৭৫ বছর পরেও দেশের ভেতরে ও বাইরে সেই একই বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতাকে উস্কে দেওয়ার ষড়যন্ত্রকারী লোকের অভাব নেই। 

পাকিস্তান কোনো ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক স্বত্তা নয়, ওটি আসলে নিজেদের সংস্কৃতি, নিজেদের ইতিহাস, বস্তুত নিজেদের অস্তিত্বের বিরুদ্ধেই কিছু অবুঝ অর্বাচীনের বিদ্রোহ, যার কোনো সারবত্তা নেই। পাকিস্তান থেকে ভাষার ভিত্তিতে বিভাজিত হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের অবস্থানও তাই। যে জাতি অন্যের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতির পদতলে নিজের পূর্বপুরুষের সংস্কৃতিকে জলাঞ্জলি দেয়, তাদের আসলে একূল ওকূল দুকূলই যায়। বেচারাদের পায়ের তলায় মাটি থাকলেও আসলে এরা সবাই ছিন্নমূল।

পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো মেকি দেশ ১০০ বছরের বেশি টেকেনি, হয়তো আগামী ২৫ বছরে আমাদের উপমহাদেশের মানচিত্রটিও অনেকটাই বদলে যাবে। কিন্তু আজকের দিনে, যেদিন প্রেমজীভাই মেঘজী ঠক্করের নাতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নিজের ভারতীয়ত্ব বিসর্জন দিয়ে একটি কৃত্তিম দেশের প্রথম গভর্নর জেনারেল হয়েছিলেন, সেদিন কি সত্যি সত্যিই তার কোনো আদর্শের ভিত্তি ছিল নাকি কেবল ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও স্বজনবৈরিতা, সেটা আজ পাকিস্তানের ঘোর বেহাল দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। 

সোভিয়েত ইউনিয়ন দেখিয়ে দিয়েছে রাজনৈতিক মতবাদ কোনো কৃত্তিমভাবে তৈরি করা দেশকে ধরে রাখতে পারেনা, মধ্যপ্রাচ্য দেখিয়ে দিয়েছে ভাষা এক হলেও স্থানীয় সংস্কারের ভিত্তিতে নানা দেশ তৈরি হতে পারে আর বাংলাদেশ দেখিয়ে দিয়েছে পন্থীয় একতাও কোনো কৃত্তিমভাবে তৈরি করা দেশকে ধরে রাখতে পারেনা। অন্যদিকে জার্মানি দেখিয়ে দিয়েছে যে জাতির মধ্যে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন থাকলে কৃত্তিমভাবে বিভাজিত দেশও একদিন আপনাআপনিই জুড়ে গিয়ে আবার এক হয়ে যায়। 

এই সংস্কৃতিই হলো মূল কথা, যে কোনো সভ্যতার ওটাই আসল অবদান। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কথা ছেড়ে দিয়ে আপাতত আমরা যদি আমাদের নিজেদের দেশে বসবাসকারী সমস্ত নাগরিককে সনাতন ধর্ম-সংস্কৃতির রঙ্গে না রাঙিয়ে তুলতে পারি, তাহলে এই স্বাধীনতা অর্থহীন। আমরা স্বাধীন বলে তখনই গণ্য হবো যখন আমাদের নিজেদের সভ্যতার কথা আমরা সোচ্চারে বলতে পারবো। এই রাষ্ট্র হিন্দুরাষ্ট্র কারণ আমরা সবাই হিন্দু সভ্যতার ধারক ও বাহক - ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে এ কথা বলার মধ্যে যতদিন দ্বিধাবোধ থাকবে ততদিন আমরা পুরোপুরি স্বাধীন নৈ। 

হয়তো আজ যে কথা কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে, আর কয়েকবছর পর তা সোচ্চারে শোনা যাবে কারণ এক বৃহৎসংখ্যক জনগণের মধ্যে সার্বিকভাবে সংস্কৃতি-সচেতনতা বাড়ছে। আজকের মতো দিন হলো সংকল্প নেওয়ার দিন, যেদিন শেষবার জোর করে আমাদের দেশমাতৃকার অঙ্গহানি করা হয়েছিল। আমরা যে এক জাতি এক প্রাণ - এই কথাটা আমাদের নিজেদের দেশের মধ্যে আগে প্রতিষ্ঠা করতে হবে আর তার জন্য শিক্ষাব্যবস্থা থেকে নিয়ে রাষ্ট্রের সমস্ত নীতি এবং তন্ত্রকে একটি নির্দিষ্ট অভিমুখ দিতে হবে। যেদিন আমরা সেটা করতে ফেলতে পারবো, তার সুফল এমন আকর্ষক ও কার্যকরী হবে যে আশেপাশের সব মেকি দেওয়াল এমনি এমনিই খসে পড়বে। সেদিন আর কোনো ১৪ই অগাস্টও থাকবে না, শুধুই ১৫ই।