Thursday, June 29, 2023

গো মাতা

রাস্তায় যখন কোনো অচেনা বৃদ্ধা মহিলাকে ডেকে কোনো কথা বলতে হয় আমরা তাঁকে কি বলে ডাকি? ট্যাঁশ হলে হয়তো 'ম্যাডাম শুনছেন' বলে ডাকেন, আমরা অধিকাংশই সাধারণত তাঁকে 'মা শুনছেন' বা 'জেঠিমা শুনছেন' বা 'মাসিমা শুনছেন' বলে ডেকে থাকি। কেন? তিনি কি সত্যি সত্যি আমাদের মা বা জেঠিমা বা মাসিমা? মোটেও তা নন। কিন্তু তাঁকে দেখলে ওই মাতৃস্থানীয়াদের কথা মনে আসে, তাই ওই শ্রদ্ধার সম্বোধন। মাতৃস্থানীয়া, কারণ মায়েদের যে বিশেষ গুণাবলী, সেটি তাঁর মধ্যেও বিদ্যমান - তিনিও কারো মা, কারো জেঠিমা বা কারো মাসিমা। ঠিক এই কারণেই আমরা যখন গাভীকে মা বলি, তাঁকে গোমাতা বলে গোপাষ্টমীর দিন পুজো করি, আমরা গাভীর মধ্যে গর্ভধারিণী মায়েরই প্রকৃতি খুঁজে পাই এবং তাকেই স্বীকৃতি দিই। এমন কত মানুষ মাই তো আছেন, হরমোনের বিকৃতির কারণে সন্তান ধারণের পরপরই যাঁদের বুকে যথেষ্ট বা একেবারেই দুধ আসেনা, শিশু অভুক্ত থাকে, ক্রমাগত কাঁদে। এখনকার কালে নাহয় বিকট দামি দামি সব ফর্মুলা ওয়ান ইত্যাদি বেরিয়েছে, আগেকার কালে গরুর দুধে পরিমান মতন জল মিশিয়ে পাতলা করে ঝিনুকে করে শিশুকে খাইয়েই তার প্রাণরক্ষা করা হতো, প্রসূতি মাও সেই গরুর দুধ খেয়েই স্বাস্থ্যোদ্ধার করতেন, গ্রামেগঞ্জে আজও হয়। আর আজও কিশোর-কিশোরী থেকে নিয়ে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের ক্ষেত্রেও গরুর দুধই পুষ্টির অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে সমাদৃত, তা ছাড়া ঘি, মাখন, চিজ, দই, ছাঁচ ইত্যাদি তো আছেই। এখন, যাঁর দুধ খাই তাঁকে মাতৃবৎ মনে করব না তো কাকে মনে করব? রাস্তায় কোনো অচেনা বৃদ্ধাকে দেখলে মাতৃবৎ ছাড়া কি প্রিয়বান্ধবী বলে মনে হবে? ফলে আমাদের বৈদিক সংস্কৃতিতে মাতৃহত্যার মতোই গোহত্যাকেও মহাপাতকের কাজ বলে মনে করা হয় এবং তাতে আমাদের প্রাচীন সভ্যতার ধর্মবোধ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিফলিত হয়। এই ভাবনাটি অত্যন্ত progressive, অত্যন্ত liberal এবং অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। দুঃখের ব্যাপার হলো, অতি উন্নত ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী হয়েও, বিজাতীয় ও বিধর্মী কুশিক্ষার প্রভাবে নিজেদের সংস্কৃতির মূল মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধাচরণ করাটা ইংরেজ আমল থেকেই কিছু অনুকরণপ্রিয় অতিবাদীদের কাছে হয়তো fashionable হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু সেটা আদপেই কতটা regressive তা হয়তো তাঁদের জানা নেই। যেদিন এঁরা সূত্রটি বুঝতে পারবেন, সেদিন বীফভুনা বা বীফরোল খেতে গিয়ে এঁদেরও বমি উঠে আসবে। ততদিন নাহয় রোগ জর্জরিত বৃদ্ধা গোমাংস খেয়ে এই ভন্ডরা অন্যের খুশিতে শামিল হোন। আমরা কেবল এটুকুই প্রার্থনা করতে পারি যে অস্তিত্বের চরম সংকটের সম্মুখীন হওয়ার আগেই যেন এঁদের সদবুদ্ধির উদয় হয় কারণ ভারতীয় উপমহাদেশে গো হত্যা মূলতঃ ইচ্ছাকৃত এবং প্ররোচনামূলকভাবে কেবলমাত্র ভারতীয় সংস্কৃতি ও হিন্দু সভ্যতার ভিত্তিকে defy করার জন্যই করা হয়, এর পেছনে কোনো পন্থীয় নির্দেশ বা যৌক্তিকতা নেই। প্রসঙ্গত, আমাদের উপমহাদেশে পাশ্চাত্যের মতন শুধু খাদ্য হিসেবে আলাদা করে গোপালন করা হয়না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এখানে কেবল এঁড়ে বা বৃদ্ধ বা রুগ্ন গরুকেই কসাইকে বেচে দেওয়া হয়। ফলে গোটা প্রক্রিয়াটি কেবল অশাস্ত্রীয় নয়, খুবই অস্বাস্থ্যকরও বটে।

No comments:

Post a Comment